Image description

হংকংয়ের মডেল ও সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার অ্যাবি চোইকে হত্যার পর টুকরো টুকরো করে ফেলা হয়। এবার সেই হত্যা মামলার বিচার চলাকালে আদালতকে জানানো হয়েছে, তার খুলি গাজর ও অন্যান্য সবজি দিয়ে রান্না করা স্যুপের একটি বড় পাত্রে পাওয়া গিয়েছিল।

অ্যাবি চোইকে হত্যার ঘটনায় তার সাবেক স্বামী অ্যালেক্স কোয়ং, সাবেক শ্বশুর কোয়ং কাউ এবং দেবর অ্যান্থনি কোয়ংয়ের বিরুদ্ধে মামলা চলছে। বুধবার হংকংয়ের হাইকোর্টে তারা তিনজনই হত্যার অভিযোগ অস্বীকার করে নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন। শুক্রবার (২ সেপ্টেম্বর) যুক্তরাজ্যভিত্তিক ইনডিপেনডেন্ট এ তথ্য জানান্য।

আদালতে প্রসিকিউশন জানায়, ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি নিয়ে বিরোধের জেরে অ্যাবিকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। ২৮ বছর বয়সী অ্যাবি চোই ২১ ফেব্রুয়ারি নিখোঁজ হন। তিন দিন পর হংকংয়ের তাই পো এলাকার একটি ভাড়া বাসায় তার দেহের খণ্ডিত অংশ পাওয়া যায়। বাসাটিকে কথিতভাবে অস্থায়ী কসাইখানার মতো করে ব্যবহার করা হয়েছিল।

পুলিশ ওই বাসা থেকে মাংস কাটার যন্ত্র, বৈদ্যুতিক করাত ও পোশাক উদ্ধার করে। বাসাটি ভাড়া নিয়েছিলেন অ্যাবির সাবেক শ্বশুর কোয়ং কাউ।

মামলার শুরুতে প্রসিকিউটর শার্লট ড্রেকট স্ক আদালতকে বলেন, কোয়ং কাউ তার দুই ছেলেকে নিয়ে অ্যাবিকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। কারণ, অ্যাবি যে বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে কোয়ং কাউ বসবাস করতেন, সেটি বিক্রি করতে চেয়েছিলেন।

হো ম্যান টিনের কাদোরিয়া আবাসিক এলাকায় ওই ফ্ল্যাটটির মূল্য ছিল ৭ কোটি ২০ লাখ হংকং ডলার। ২০১৯ সালে অ্যাবি ৬ কোটি হংকং ডলারে ফ্ল্যাটটি কিনেছিলেন। তার দুই সন্তানকে বাবার পরিবারের দাদা-দাদির কাছে রাখার সুবিধার জন্যই তিনি ফ্ল্যাটটি কিনেছিলেন বলে আদালতে জানানো হয়।

প্রসিকিউশনের দাবি, একাধিক সম্পত্তির মালিকদের ওপর আরোপিত বেশি স্ট্যাম্প ডিউটি এড়াতে ফ্ল্যাটটি কোয়ং কাউয়ের নামে নিবন্ধন করেছিলেন অ্যাবি।

আদালতে অ্যাবির মায়ের কাছে পাঠানো ব্যক্তিগত অডিও বার্তাও শোনানো হয়। সেখানে তিনি সাবেক শ্বশুরবাড়ির লোকজনকে ‘খুবই অপ্রীতিকর’ বলে উল্লেখ করেন। কোয়ং কাউকে ‘প্রতারক’ এবং তার স্ত্রীকে ‘ভূত’ বলেও উল্লেখ করেন তিনি। পরিবারের জন্য নিজের উদারতার বিষয়ে অনুশোচনাও প্রকাশ করেন অ্যাবি।

পরে অ্যাবি কোয়ং কাউকে ওই ফ্ল্যাট থেকে বের করে দেন। তার অভিযোগ ছিল, তিনি অ্যাবি ও তার দুই সন্তানের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করার চেষ্টা করছিলেন। এরপর কোয়ং কাউকে তার বড় ছেলের সঙ্গে শুং ম্যান কোর্টের একটি এক বেডরুমের ফ্ল্যাটে থাকতে হয়।

প্রসিকিউশনের অভিযোগ, ২০২৩ সালে পারিবারিক বিরোধ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়। তখন কাদোরিয়া ফ্ল্যাটটি নিজের কাছে রাখার জন্য অ্যাবিকে হত্যার পরিকল্পনা করেন কোয়ং কাউ।

মামলার আইনজীবী বলেন, অ্যাবির বাবা-মা সচ্ছল ছিলেন এবং তার নতুন সঙ্গী ক্রিস টামের পরিবারও অত্যন্ত ধনী। অন্যদিকে কোয়ং পরিবার ততটা সচ্ছল ছিল না। প্রসিকিউশনের ভাষ্য অনুযায়ী, অর্থই ছিল এই ঘটনার মূল কারণ।

আদালতে বলা হয়, কথিত হত্যার পরিকল্পনায় তিন আসামিরই আলাদা ভূমিকা ছিল। এর মধ্যে একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নেওয়া এবং অ্যাবিকে গাড়িতে করে নির্জন স্থানে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ও ছিল। প্রসিকিউশনের দাবি, তারা সবাই একসঙ্গে কাজ করে থাকলে কে সরাসরি তাকে হত্যা করেছে, তা গুরুত্বপূর্ণ নয়।

অ্যাবির দেহ উদ্ধারের ঘটনা আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনায় আসে। আদালতে বলা হয়েছে, তার খুলি গাজর ও অন্যান্য সবজি থাকা একটি বড় পাত্রে পাওয়া যায়। আর তার দুই পা পাওয়া যায় ভাড়া করা ওই বাসার একটি ফ্রিজের ভেতরে।

অ্যাবি চোই একটি ধনী পরিবারে বেড়ে ওঠেন। ১৮ বছর বয়সে অ্যালেক্স কোয়ংকে বিয়ে করেন তিনি। তাদের দুই সন্তান ছিল। পরে তাদের বিচ্ছেদ হলেও অ্যালেক্সের পরিবারের সদস্যদের আর্থিকভাবে সহায়তা করে যাচ্ছিলেন অ্যাবি।

পরবর্তীতে দ্বিতীয় সঙ্গীর সঙ্গে তার আরও দুই সন্তান হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত নিজের ফ্যাশন শো, ফটোশুট ও বিলাসবহুল জীবনযাপনের ছবি প্রকাশ করতেন তিনি। মৃত্যুর কয়েক দিন আগেও প্যারিস ফ্যাশন উইকে ক্রিশ্চিয়ান ডিওরের একটি শোতে অংশ নেওয়ার ছবি প্রকাশ করেছিলেন অ্যাবি।

এর আগে পুলিশ জানিয়েছিল, অ্যাবির দেহের কিছু অংশ হয়তো ফেলে দেওয়া হয়েছিল। পুলিশ কর্মকর্তা অ্যালান চুং তখন বলেছিলেন, দেহের খণ্ডিত অংশগুলো সরিয়ে ফেলা হয়েছে বলে তারা বিশ্বাস করেন।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যার পর রক্তের দাগ এড়াতে অভিযুক্তরা বাসাটির দেয়াল একটি ত্রিপল দিয়ে ঢেকে রাখে। দেহ টুকরো করার সময় রক্ত যাতে তাদের পোশাকে না লাগে, সে জন্য মুখের ঢাল ও রেইনকোটও ব্যবহার করা হয়েছিল।

আদালতে মামলার শুনানি আরও আট সপ্তাহ চলতে পারে। শুক্রবার প্রসিকিউশন তাদের বক্তব্য উপস্থাপন অব্যাহত রাখবে।