Image description
দুই দিনে ৫ মৃত্যু

ডেঙ্গু সংক্রমণ আর শহুরে রোগ নয়। এডিস মশাবাহিত রোগের বিস্তার দেশজুড়ে। ঢাকার বাইরে দেশের বিভিন্ন জেলায় রোগীর চাপ ও মৃত্যুহার অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ৮২ হাজার ৭৬১ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এ সময়ে মারা গেছে আড়াইশ। তারমধ্যে অর্ধেকের বেশি ঢাকার বাইরের। শুধু ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী ও বরিশাল জেলায় মৃতের সংখ্যা ১০৮ জনের বেশি। সারা দেশের ডেঙ্গুবিষয়ক তথ্য বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, চলতি বছরের মাঝামাঝি থেকে সংক্রমণ দ্রুত বাড়ার পাশাপাশি ঢাকার বাইরেও মৃত্যু উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এতে একদিকে যেমন হাসপাতালে রোগীর চাপ বাড়ছে, সেই সঙ্গে মৃত্যুও বাড়ছে। তবে ডেঙ্গুর প্রকোপ মোকাবিলায় রোগী ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা ও অভিজ্ঞ জনবল এখনো অনেকটাই রাজধানীকেন্দ্রিক। স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত শনাক্তকরণ, পর্যবেক্ষণ ও জটিল রোগীর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। ডেঙ্গুর উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিয়মিত এডিস জরিপ, লার্ভা শনাক্তকরণ ও ধ্বংস, স্থানীয় পর্যায়ে রোগীর দ্রুত শনাক্তকরণ এবং জেলা হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গুর জটিল রোগী ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, ঢাকার বাইরে ডেঙ্গুর বিস্তার এখন বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। প্রচলিত পদ্ধতিতে ডেঙ্গু মোকাবিলার কারণে সংক্রমণ ও মৃত্যু কমছে না। বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা ও জমে থাকা পানির ওপর এডিস মশার প্রজনন অনেকটাই নির্ভর করে। বিরতিতে বৃষ্টি হওয়ার পর আবহাওয়া শুকিয়ে এলে ডেঙ্গু সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে। তাই মশা নিয়ন্ত্রণ জোরদার না হলে পরবর্তী সময়েও পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তিনি বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু হাসপাতালের শয্যা বা কীটনাশক ব্যবহারের ওপর নির্ভর করলে হবে না। বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা এবং জমে থাকা পানিতে এডিস মশার প্রজনন—এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে প্রজননস্থল ধ্বংস করতে হবে এবং মানুষের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। ঢাকার বাইরে পাঁচগুণ মানুষ বসবাস করেন এবং সেখানে মশা নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রম অপর্যাপ্ত।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ডেঙ্গু মোকাবিলায় প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি আরও কার্যকর মশা নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। বৃষ্টির পর আবহাওয়া শুকিয়ে গেলে সংক্রমণ বাড়তে পারে। তাই এখনই মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি; তা না হলে আগামী দুই মাসে পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে।

ঢাকার বাইরে ৫ জেলায় সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি রোগী ও মৃত্যুর ঘটনা রাজধানীতে। তবে এর বাইরেও পাঁচ জেলায় ঘটছে উচ্চ সংক্রমণ। ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী ও বরিশালে মারা গেছে প্রায় ১০৮ জন। গতকাল পর্যন্ত ময়মনসিংহে মারা গেছে ২০ জন ডেঙ্গু রোগী। চট্টগ্রামে ২০, খুলনায় ৩৯, রাজশাহীতে ১৩ এবং বরিশালে ডেঙ্গুতে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।

সেপ্টেম্বরেই সবচেয়ে বেশি রোগী-মৃত্যু বছরের প্রথম পাঁচ মাসে ডেঙ্গুর সংক্রমণ তুলনামূলকভাবে কম ছিল। বছরের শুরু থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কিছুটা স্থিতিশীলতা থাকলেও জুনের পর সংক্রমণের গতি কয়েকগুণ বেড়েছে। সেপ্টেম্বর একাই বছরের মোট হাসপাতালে ভর্তি রোগীর প্রায় অর্ধেক তৈরি করেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, জানুয়ারিতে হাসপাতালে ভর্তি হন ১ হাজার ৮১ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৪০৯, মার্চে ৩৫৩, এপ্রিলে ৬৪০ এবং মে মাসে ৭১৪ জন। জুন থেকে পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে শুরু করে। ওই মাসে রোগী বেড়ে হয় ২ হাজার ৯০৭ জন। জুলাইয়ে ৯ হাজার ২০৬ এবং আগস্টে ২০ হাজার ৫৩৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হন। এরপর সেপ্টেম্বরেই সংক্রমণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে এক মাসে ৪৩ হাজার ৭৭৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হন। এদিকে চলতি মাসের গত দুদিনে ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩ হাজার ১৪১ জন। মৃত্যুর হিসাবেও জুন থেকে বাড়তে শুরু করে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ডেঙ্গুতে মারা যান দুজন। ফেব্রুয়ারিতে দুজন, মার্চ এবং এপ্রিলে কেউ মারা যায়নি। মে মাসে একজন মারা গেলেও জুনে এসে ডেঙ্গুতে সরকারি হিসাবে মারা যান ১৩ জন। জুলাইয়ে ডেঙ্গুতে প্রাণ হারান ৩৬ জন। আগস্টে ৪৩ জন এবং সেপ্টেম্বরে মৃত্যুর সংখ্যা গিয়ে পৌঁছায় ১৪৮ জনে। এদিকে চলতি মাসের প্রথম দুদিনে মারা গেছেন পাঁচজন।

ঢাকার বাইরে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর চাপ সংক্রমণের ভৌগোলিক বিস্তারের আরেকটি দিকও গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি বছরের শুরু থেকে ২ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে মোট ৮২ হাজার ৭৬১ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে সিটি করপোরেশন এলাকার বাইরে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৬৩ হাজার ৭৪০ জন, যা মোট রোগীর প্রায় ৭৭ শতাংশ। অর্থাৎ, রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন বাদ দিলে দেশের বিভিন্ন জেলা ও অঞ্চলে ডেঙ্গুর সংক্রমণ এখন বড় চাপ তৈরি করেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, সিটি করপোরেশন এলাকায় এ সময়ে রোগী ভর্তি হয়েছেন ১৮ হাজার ৬৫৫ জন। অন্যদিকে, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১ হাজার ১৬৩ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে ঢাকা বিভাগের সিটি করপোরেশনের বাইরে ২৯৫ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ৩৩৩, বরিশালে ১৫১, খুলনায় ১১১, ময়মনসিংহে ৭৭ এবং রংপুরে ৭১ জন রয়েছেন। এ ছাড়া ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ৮০ ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ৪৫ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। তথ্য বলছে, শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক নয়, ঢাকার বাইরেও ডেঙ্গুর বিস্তার ক্রমেই বাড়ছে। এ সময়ে সিটি করপোরেশনের বাইরে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে ১৪৯ জনের। সারা দেশে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মোট ২৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসেই মারা গেছেন ১৪৮ জন। একই সময়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৭৬ হাজার ৮৬২ জন। বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন প্রায় ৫ হাজার ৬০০ রোগী।