রাজধানীর মোহাম্মদপুরের আসাদ অ্যাভিনিউ সেইন্ট পল স্কুল অ্যান্ড চার্চ স্থানীয় খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম উপাসনালয়। এটির দ্বিতীয় তলার উত্তর-পশ্চিম পাশে ১০ ফুট উচ্চতায় ঝুলিয়ে রাখা ছিল ৭০ কেজি ওজনের বিশাল একটি ঘণ্টা। ঘণ্টাটি ছিল বেশ আকর্ষণীয়। রাস্তা থেকেই পথচারীদের নজর কাড়ত এটি। দিনে তিনবার প্রার্থনার আগে বাজানো হতো ঘণ্টা।
তবে হঠাৎ গত বৃহস্পতিবার ভোরের আলো ফুটতেই নিয়ম অনুযায়ী ঘণ্টা বাজাতে গিয়ে চার্চের কর্মীরা দেখেন সেটি আর নেই। এরপরই হুলুস্থুল লেগে যায়। গির্জার ঘণ্টা চুরির খবর যায় পুলিশের কাছে। তদন্তে নেমে পুলিশ কর্মকর্তারা শনাক্ত করেন চুরির সঙ্গে জড়িত কয়েকজনকে। তবে তাদের গ্রেপ্তারের আগেই গির্জার মাত্র এক কিলোমিটার দূরে জাকির হোসেন রোডের ভাগাড়ে ফেলে যাওয়া হয় ঘণ্টাটি। পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে আইনগত প্রক্রিয়া শেষে ঘণ্টাটি আবারও বুঝিয়ে দেওয়া হয় চার্চকে।
গতকাল শুক্রবার দুপুরে গির্জার ঘণ্টা উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল হালিম। তিনি জানান, ঘণ্টা চুরির ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে বৃহস্পতিবার রাত ২টা ৫০ মিনিটের দিকে ঘণ্টাটি উদ্ধার করা হয়। তবে এই ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি।
এর আগে ঘণ্টা চুরির ঘটনায় সেইন্ট পল চার্চের প্রধান ফাদার কাজল পিউরিফিকেশন বাদী হয়ে অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে চুরির মামলা করেন।
মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আসাদগেটের সেইন্ট পল চার্চের দ্বিতীয় তলা থেকে ঘণ্টাটি চুরিতে অন্তত পাঁচজন জড়িত। তারা প্রথমে গ্রিল দিয়ে ওপরে উঠে কৌশলে নাট খুলে ঘণ্টাটি নিচে নামায়। পরে চার্চের গেটের তালা ভেঙে ঘণ্টাটি চুরি করে। তবে রহস্যজনক কারণে ঘণ্টার নিরাপত্তার জন্য লাগানো সিসিটিভি ক্যামেরা নষ্ট ছিল।
পরে তদন্তে নেমে পুলিশ আশপাশের ভবনের সিসিটিভি ফুটেজ দেখে চক্রের মূলহোতাকে শনাক্ত করে। মোহাম্মদপুরে ৩১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক পদের এক নেতা এই ঘটনায় জড়িত। তাকে থানা পুলিশের পক্ষ থেকে চাপ দেওয়ার পর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ঘণ্টাটি জাকির হোসেন রোডে ফেলে যাওয়া হয়।
থানা পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘণ্টাটি চুরির পরপরই ঢাকার বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে মূলহোতাকে চাপের কারণে এটি আবার ঢাকায় ফেরত আসে এবং ভাগাড়ের পাশে ফেলে যাওয়া হয়। জড়িতদের নাম-পরিচয় প্রকাশ না করলেও তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ।
শুক্রবার বিকেল ৩টার দিকে সেইন্ট পল স্কুল অ্যান্ড চার্চে গিয়ে দেখা যায়, উদ্ধার হওয়ার পর ঘণ্টাটি গির্জায় আনা হয়। সঙ্গে মোহাম্মদপুর থানার ওসি আব্দুল হালিম, পরিদর্শক (তদন্ত) রকিবুজ্জামানসহ পুলিশের একটি দলও আসে। তামা, কাসা ও পিতল- তিন ধাতুতে প্রায় ৭০ কেজি ওজনের ঘণ্টাটি চারজন শ্রমিক ও চার্চের লোকজনের সহায়তায় আগের স্থানে ঝোলানো হয়। চার্চের দ্বিতীয় তলার উত্তর-পশ্চিম কোণে দুটি লোহার তৈরি এঙ্গেলের ওপর ঝুলিয়ে রাখা হয় ঘণ্টাটি।
চার্চ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দিনে তিনবার প্রার্থনার আগে এই ঘণ্টা বাজানো হয়। প্রতিদিন সকাল ৬টা, দুপুর ১২টা ও সন্ধ্যা ৬টায় এই ঘণ্টা বাজান গির্জার ফাদার। তবে বৃহস্পতিবার সকালে ঘণ্টা বাজাতে গিয়ে না পাওয়ার পরপরই বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয়।
মোহাম্মদপুর থানার ওসি আব্দুল হালিম বলেন, ১ অক্টোবর রাত ১২টার পর যে কোনো সময় সেইন্ট পল স্কুল অ্যান্ড চার্চের দ্বিতীয় তলার উন্মুক্ত স্থান থেকে প্রায় ৭০ কেজি ওজনের ঘণ্টাটি চুরি হয়। যার আনুমানিক বাজারদর সাড়ে তিন লাখ টাকা। চুরির আগে রাত ১২টা ৩ মিনিট থেকে চার্চের সিসিটিভি ক্যামেরার রেকর্ডিং রহস্যজনক কারণে বন্ধ হয়ে যায়। এ ঘটনায় মামলা করার পর চুরি যাওয়া ঘণ্টা উদ্ধার হয়েছে। আর জড়িতদের গ্রেপ্তারে থানা পুলিশের একাধিক টিম অভিযান চালাচ্ছে।