পরিকল্পিত একটি হত্যাকাণ্ড। অথচ ঘটনাটিকে ছিনতাইকারীর হাতে হত্যার ঘটনা হিসেবে প্রচার করা হয়। এরপর বছরের পর বছর উচ্চ আদালতে আটকে থাকে বিচার ও তদন্ত। আদালতের নির্দেশে একসময় খুলে যায় তদন্তের দরজা। পুরোনো সূত্র ধরে নতুন করে শুরু হয় তদন্ত। বেরিয়ে আসে হত্যার রহস্য। আবারও শুরু হয় বিচার। অবশেষে হত্যাকাণ্ডের ৩৫ বছর পর আসে রায়।
রাজধানীর বেইলি রোডের বহুল আলোচিত সগিরা মোর্শেদ সালাম হত্যা মামলার ঘটনা এটি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ছিলেন সগিরা মোর্শেদ। আজ থেকে ৩৭ বছর আগে হত্যা করা হয়েছিল। ১৯৮৯ সালের সেই হত্যাকাণ্ডের বিচার শেষ হতে সময় লেগেছে ৩৫ বছর। দীর্ঘ সময় পর পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) তদন্তে হত্যার রহস্য উন্মোচিত হয়। এরপর সেই তদন্তের ভিত্তিতেই মামলাটি গড়ায় রায় পর্যন্ত।
যেভাবে হত্যা করা হয়
মামলার নথিপত্রের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৯ সালের ২৫ জুলাই সগিরা মোর্শেদ সালাম ভিকারুননিসা নূন স্কুল থেকে মেয়েকে আনতে যাওয়ার পথে ছিনতাইকারীর কবলে পড়েন। একপর্যায়ে দৌড় দিলে তাকে গুলি করা হয়। পরে সগিরা মোর্শেদ মারা যান। সেদিনই রমনা থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করেন নিহত সগিরার স্বামী আবদুস সালাম চৌধুরী।
পিবিআইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৮৯ সালের ২৫ জুলাই বিকাল ৫টার দিকে সগিরা মোর্শেদ তার বড় মেয়ে সারাহাত সালমাকে আনতে ভিকারুননিসা নূন স্কুলের দিকে রিকশায় যাচ্ছিলেন। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী সিদ্ধেশ্বরী রোডে ঢোকার পর মোটরসাইকেলে আসা দুই ব্যক্তি তার রিকশার পথ আটকায়। তারা ছিল মারুফ রেজা ও আনাছ মাহমুদ রেজওয়ান। প্রথমে সগিরার হাতব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এরপর হাতের বালা নিতে গেলে রেজওয়ানকে চিনে ফেলেন সগিরা। তিনি বলে ওঠেন, ‘তুমি এখানে কেন? আমি তোমাকে চিনি।’
পরিচয় ফাঁস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তখনই মারুফ রেজা তার বুকে গুলি চালান বলে পিবিআইয়ের তদন্তে উঠে আসে। রিকশা থেকে পড়ে যাওয়ার পরও তাকে আরও কয়েক রাউন্ড গুলি করে তারা পালিয়ে যায়। হাসপাতালে নেওয়ার পথেই মারা যান ৩৪ বছর বয়সী সগিরা।
৩০ বছর আটকে ছিল বিচার
হত্যাকাণ্ডের পর গোয়েন্দা পুলিশ মিন্টু ওরফে মন্টু নামে এক ছিনতাইকারীকে গ্রেফতার করে। ১৯৯০ সালের ৩ সেপ্টেম্বর তার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। ১৯৯১ সালের ১৭ জানুয়ারি তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। তবে সাক্ষ্যগ্রহণের সময় বাদীপক্ষ জানায়, ঘটনার সময় মারুফ রেজাকেও গ্রেফতার করা হয়েছিল। কিন্তু তার নাম বাদ দিয়েই অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। মারুফ রেজা ছিলেন এরশাদ সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মাহমুদুল হাসানের ভাগনে এবং বেইলি রোডের তৎকালীন ত্রাস হিসেবে পরিচিত ছিলেন বলে মামলার নথি ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে আসে।
সাক্ষ্যে মারুফ রেজার নাম আসার পর ১৯৯১ সালের ২৩ মে বিচারিক আদালত অধিকতর তদন্তের আদেশ দেন। ওই আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিভিশন করেন মারুফ রেজা। ১৯৯১ সালের ২ জুলাই হাইকোর্ট বিচার ও তদন্তের ওপর স্থগিতাদেশ দেন। সেই স্থগিতাদেশ প্রায় ২৮ বছর বহাল থাকে। অবশেষে ২০১৯ সালের ২৬ জুন হাইকোর্ট স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে পিবিআইকে মামলাটি অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট পিবিআইয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, সিদ্ধেশ্বরীতে সগিরা মোর্শেদকে গুলি করে হত্যার সময় মারুফ রেজার বয়স ছিল ১৯ বছর। সে সময় মারুফ কোনও কাজ করতেন না। নবম শ্রেণির পর আর স্কুলে যাননি। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদুল হাসানের ফুফাতো বোন সুফিয়া বেগমের তিন ছেলে ও তিন মেয়ের মধ্যে মারুফ সবার ছোট। এরশাদের শাসনামলে মূলত তার দাপটেই মারুফ অপরাধজগতের সন্ত্রাসীদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলে। রাজধানীর রমনা, শান্তিবাগ, মালিবাগ, নিউ মার্কেট, মতিঝিল ও সায়েদাবাদ পর্যন্ত গড়ে তোলে অপরাধীদের সিন্ডিকেট। জড়িয়ে পড়েন চাঁদাবাজি, দখল ও ছিনতাই কর্মকাণ্ডে। সায়েদাবাদের ‘হরর মুন্না’ হিসেবে পরিচিত সন্ত্রাসীর মাধ্যমে অস্ত্র সংগ্রহ করে বিভিন্ন অপরাধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যান। তার কাছ থেকে আনা ওই অস্ত্র দিয়েই সগিরা মোর্শেদকে গুলি করে হত্যা করেন মারুফ। সেই থেকে তিনি ‘শুটার’ মারুফ হিসেবে পরিচিত। সগিরাকে গুলি করে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন তিনি।
যেভাবে রহস্য উদঘাটন করলো পিবিআই
হাইকোর্টের নির্দেশ পাওয়ার পর মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যে মামলার অধিকতর তদন্ত শেষ করে পিবিআই। কোনও ফরেনসিক বা আধুনিক প্রযুক্তির ওপর নির্ভর না করে পুরোনো সূত্র ধরে তদন্ত শুরু করেন সংস্থাটির কর্মকর্তারা।
রিকশাচালকের খোঁজ
পিবিআই প্রথমে বাদীর কাছ থেকে ওই দিনের রিকশাচালক সালাম মোল্লার তথ্য জানতে পারে। দীর্ঘদিন খোঁজার পর ৫৫ বছর বয়সী ওই চালকের সন্ধান পাওয়া যায়। পিবিআইয়ের তদন্তে সালাম মোল্লা জানান, হামলাকারীদের একজনকে সগিরা চিনতে পেরেছিলেন।
পারিবারিক কলহের সূত্র
তদন্তে উঠে আসে পরিবারের অভ্যন্তরীণ বিরোধের বিষয়টি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর করা সগিরা উচ্চশিক্ষিত ছিলেন। অন্যদিকে তার বড় দুই জা তুলনামূলক কম শিক্ষিত ছিলেন।
একই বাড়িতে—৯৫৫ আউটার সার্কুলার রোড, রাজারবাগ—থাকার সময় গৃহস্থালি, ময়লা ফেলা ও বাড়ি নির্মাণসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলতো বলে তদন্তে উঠে আসে।
ভাড়াটে খুনি দিয়ে হত্যা
পিবিআই জানায়, ডা. হাসান আলী চৌধুরীর স্ত্রী সায়েদাতুল মাহমুদা শাহিনের প্ররোচনায় ছোট ভাইয়ের স্ত্রীকে ‘শায়েস্তা’ করার জন্য ২৫ হাজার টাকায় মারুফ রেজাকে ভাড়া করা হয়। মারুফ ছিলেন শাহিনের রোগী ও পূর্বপরিচিত। হত্যাকাণ্ডে সহযোগিতার জন্য তার শ্যালক আনাছ মাহমুদ রেজওয়ানকে দায়িত্ব দেওয়া হয় বলে পিবিআইয়ের তদন্তে উঠে আসে। গ্রেফতারের পর চার জনই আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন বলে পিবিআই জানায়।
মারুফ তার জবানবন্দিতে জানায়, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্রটি সে যাত্রাবাড়ীর সন্ত্রাসী মুন্নার কাছ থেকে নিয়েছিল। পরে মুন্না বন্দুকযুদ্ধে মারা যায় বলে পিবিআইয়ের তদন্তে উল্লেখ করা হয়।
এই মামলায় ২০২০ সালের ১৬ জানুয়ারি আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছিল, ছিনতাই নয়, মূলত পারিবারিক দ্বন্দ্ব থেকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন একজন রিকশাচালক। তিনি দুজনের জড়িত থাকার কথা বললেও মিন্টু ওরফে মন্টু নামের একজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। ১৯৯১ সালের ১৭ জানুয়ারি মন্টুর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। নেওয়া হয় সাতজনের সাক্ষ্য। বাদীপক্ষের সাক্ষ্যে আসামি মন্টু ও তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদুল হাসানের নিকটাত্মীয় মারুফ রেজার নাম আসে। তখন রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯১ সালের ২৩ মে বিচারিক আদালত অধিকতর তদন্তের আদেশ দেন।
৩৫ বছর পর আদালতের রায়
দীর্ঘ ৩৫ বছর পর ২০২৪ সালের ১৩ মার্চ ঢাকার তৃতীয় বিশেষ দায়রা জজ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ আলী হোসাইন সগিরা মোর্শেদ হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন।
আদালত মাহমুদ ওরফে রেজওয়ান (৫৯) এবং মো. মারুফ রেজাকে (৫৯) যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। একই সঙ্গে প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে আরও ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
খালাস তিন জন
অপরাধে সম্পৃক্ততা প্রমাণিত না হওয়ায় ডা. হাসান আলী চৌধুরী (৭০), তার স্ত্রী সায়েদাতুল মাহমুদা ওরফে শাহিন (৬৪) এবং মন্টু মণ্ডলকে বেকসুর খালাস দেন আদালত।
এই রায়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার অন্যতম আলোচিত একটি মামলার অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। দীর্ঘ প্রায় তিন দশক পর পিবিআইয়ের অধিকতর তদন্তে সগিরা মোর্শেদ হত্যাকাণ্ডকে ছিনতাই নয়, পরিকল্পিত পারিবারিক হত্যাকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এরপর সেই তদন্তের ভিত্তিতেই মামলার বিচার শেষ হয়ে আসে রায়।