বাংলায় মুঘল শাসন সুসংহত করেছিলেন প্রথম মুঘল সুবেদার ইসলাম খান চিশতি। বুড়িগঙ্গার চাঁদনী ঘাটে তার নৌবহর নোঙর করে ১৬১০ সালে। ধরুন, সেই সময় যদি প্লাস্টিকের বোতল থাকত এবং ইসলাম খানের লোকজন সেগুলো নদীতে ফেলতো, তাহলে ৪১৬ বছর পর আজও সেগুলো অক্ষত অবস্থায় বুড়িগঙ্গাতেই পাওয়া যেত।
এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (এসডো) ২০২২ সালের এক গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হয়।
প্লাস্টিক বর্জ্য নিয়ে সর্বশেষ যেসব গবেষণা প্রতিবেদন পাওয়া গেছে, তার মধ্যে এটি অন্যতম।
বাংলাদেশে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার শুরু হয় ১৯৮০-এর দশকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এরপর থেকে প্লাস্টিকের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এসব প্লাস্টিকের বড় একটি অংশ দেশের নদীব্যবস্থায় গিয়ে জমা হচ্ছে, নৌপথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে, জলজ প্রাণীর জীবন বিপন্ন করছে এবং খাদ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির মাধ্যমে জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।
দেশে ব্যবহার শুরুর পর ৫০ বছরেরও কম সময়ের মধ্যেই ঢাকার প্রাণপ্রবাহ বুড়িগঙ্গা নদী ইতোমধ্যে প্লাস্টিক বর্জ্যে বিপন্ন প্রায়।
স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ড. আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘বুড়িগঙ্গায় মাটির ১৫ ফুট গভীরেও আমরা প্লাস্টিক বর্জ্য পেয়েছি। কয়েকটির গায়ের লেবেল পরীক্ষা করে দেখেছি, সেগুলো ১৫ থেকে ১৭ বছর আগে ফেলা হয়েছিল। কিন্তু এখনো সেগুলো দেখতে নতুনের মতো।’
২০২৩ সালে তারা এই গবেষণা শুরু করেছেন এবং এখনো চলছে।

বোতল ও খাদ্যের প্যাকেজিংয়ে ব্যবহৃত পলিমার পলিইথিলিন টেরেফথ্যালেট (পিইটি) ক্ষয় হতে আনুমানিক ৪৫০ বছর লাগে। এই সময়ের মধ্যে এটি নীরবে পরিবেশে মাইক্রোপ্লাস্টিক ও রাসায়নিক পদার্থ ছড়িয়ে দেয় এবং খাদ্যদূষণ ঘটায়।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণের স্বাস্থ্যঝুঁকি মূল্যায়ন শীর্ষক ২০২৫ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বঙ্গোপসাগরের মাছের চেয়ে বুড়িগঙ্গা নদী থেকে ধরা মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বেশি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের অনিয়ন্ত্রিত উৎপাদন, পুনর্ব্যবহারের ব্যবস্থা ও জনসচেতনতার অভাব এবং বিদ্যমান আইন প্রয়োগে ব্যর্থতার কারণে দেশের নদ-নদী ও জনস্বাস্থ্যের জন্য এই হুমকি তৈরি হয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের ড. শফি মোহাম্মদ তারেক দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘প্লাস্টিক বর্জ্যের অব্যবস্থাপনার পরিণতিতে শেষ পর্যন্ত আমাদের খাদ্যপণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক ঢুকে পড়েছে। এখন মাছ, লবণ, তেল, চিনিতেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যাচ্ছে। কোনো না কোনোভাবে প্রতিদিনই আমরা মাইক্রোপ্লাস্টিক খাচ্ছি।’
নিয়ন্ত্রণ নেই উৎপাদনে
সরকারের ইনভেস্ট বাংলাদেশ ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্লাস্টিকশিল্প দ্রুত বিকাশমান একটি খাত। দেশে ৬ হাজারের বেশি প্লাস্টিক উৎপাদনকারী কারখানা রয়েছে এবং এ খাতে প্রায় ১৫ লাখ মানুষ কর্মরত।
তথ্য অনুযায়ী, এ শিল্পের প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ২০ শতাংশ। এই হার থেকেই প্লাস্টিকের ব্যবহার প্রতিনিয়ত কী পরিমাণ বাড়ছে, তার ব্যাপকতা বোঝা সম্ভব।
বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ সালে বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৯ লাখ ৭৭ হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হতো। শুধু ঢাকাতেই প্রতিদিন প্রায় ৬৪৬ টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হতো, যা ২০০৫ সালের তুলনায় সাড়ে তিন গুণ বেশি।
এসডোর ২০২২ সালের গবেষণা অনুযায়ী, ঢাকা শহরে প্রতিদিন প্রায় ১৪ লাখ পলিথিন ব্যাগ একবার ব্যবহারের পর ফেলে দেওয়া হয়। ঢাকার একটি পরিবার গড়ে প্রতিদিন পাঁচটি পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘বিএনপি সরকার ২০০২ সালে পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধ করেছিল। কিন্তু পরবর্তী সরকারগুলো পলিথিন ব্যাগের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নেয়নি। এখন আমরা আবার অবৈধ কারখানার বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার প্রস্তুতি নিচ্ছি। এর জন্য তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।’
বিশ্বব্যাংকের ২০২০ সালের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ঢাকার মাত্র ৩৭ শতাংশ প্লাস্টিক বর্জ্য পুনর্ব্যবহার করা হয়। এ কাজের প্রায় পুরোটাই করে পুরান ঢাকার ইসলামবাগের মতো এলাকায় গড়ে ওঠা অনানুষ্ঠানিক খাত।
সম্প্রতি ওই এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে দ্য ডেইলি স্টার কথা বলেছে শামসুল আলমের সঙ্গে। তিনি পুনর্ব্যবহারকারী কারখানার জন্য প্লাস্টিকের ভাঙারি পণ্যের দোকান চালান।
শামসুল আলম জানান, শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্লাস্টিক বর্জ্য ইসলামবাগে আসে। সেগুলো বাছাই করে প্লাস্টিকের টুকরা বা চিপস তৈরি করা হয়। এরপর সেগুলো বিভিন্ন কারখানায় বিক্রি করা হয়, যেখানে এসব চিপস দিয়ে প্লাস্টিক পণ্য তৈরি হয়।
নদী ও খাদ্যদূষণ
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বাপাউবো) ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ১ হাজার ৪১৫টি নদ-নদী প্রবাহিত হয়েছে, যেগুলোর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ২৪ হাজার ১৪০ কিলোমিটার।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বিচারে প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলার কারণে এসব নদীর অনেকগুলো, বিশেষ করে ঢাকার আশপাশের নদ-নদী ক্রমেই বেশি দূষিত হয়ে পড়ছে।
এর পরিণতি প্রতি বর্ষাতেই দেখা যায়। মাত্র আধা ঘণ্টা মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টি হলেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার সড়ক পানিতে তলিয়ে যায়।

২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এই নর্দমা নেটওয়ার্কের প্রতিবন্ধকতা দূর করার জন্য ১ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় করেছে। কর্মকর্তারা বলছেন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানোর কয়েক দিনের মধ্যেই নর্দমাগুলো আবার বন্ধ হয়ে যায়। মূলত পলিথিন, খাবারের প্যাকেট ও প্যাকেজিংয়ের বর্জ্যে আটকেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়।
একইভাবে, গবেষকরা দেখেছেন, বছরে প্রায় আড়াই লাখ পর্যটকের আনাগোনার কারণে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনেও প্লাস্টিক দূষণ বেড়েছে।
২০২৫ সালের এক গবেষণায় সুন্দরবনের পানিতে প্রতি লিটারে ২৩.২৫টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। বাংলাদেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন জলাভূমি কাপ্তাই হ্রদ ও টাঙ্গুয়ার হাওরের তুলনায় এটা অনেক বেশি। গবেষণায় পিইটি প্লাস্টিককে প্রধান দূষক হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।
বুড়িগঙ্গা নদী নিয়ে ২০২৩ সালের এক গবেষণায়ও আমাদের খাদ্যে উদ্বেগজনক মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের (৫ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট কণা) উপস্থিতি পাওয়া গেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) চারজন গবেষক এ গবেষণা করেন।
গবেষণায় মাছের প্রতি গ্রামে ০.৬৫ থেকে ৩.৮২টি, কাঁকড়ার প্রতি গ্রামে ৩.৭৫ থেকে ৪.২৮টি এবং নদীর তলানির প্রতি গ্রামে সর্বোচ্চ ৮.১৭টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। এ ছাড়া, ক্রোমিয়াম, সিসা, আর্সেনিক ও ক্যাডমিয়ামসহ বিষাক্ত ভারী ধাতুর উচ্চমাত্রার উপস্থিতিও পাওয়া গেছে।
ড. শফি মোহাম্মদ তারেক বলেন, ‘প্লাস্টিক একটি উদীয়মান দূষক। এখনো প্লাস্টিকের নিরাপদ মাত্রা নির্ধারণ করা হয়নি।’
মাইক্রোপ্লাস্টিক খেলে এবং এর সংস্পর্শে এলে স্বাস্থ্যের ওপর কী প্রভাব পড়ে, তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখনো গবেষণা করছেন। তবে ২০২৫ সালে স্ট্যানফোর্ড মেডিসিনে প্রকাশিত এক নিবন্ধ অনুযায়ী, নতুন গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের সংস্পর্শ ক্ষতিকর এবং এর সঙ্গে প্রজনন, পরিপাক ও শ্বাসতন্ত্রের স্বাস্থ্যগত সমস্যার সম্পর্ক থাকতে পারে। ওই নিবন্ধে বলা হয়েছে, সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে শিশুরা।
নিষেধাজ্ঞা আছে, প্রয়োগ নেই
২০০২ সালে বাংলাদেশ বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে পলিথিনের শপিংব্যাগ নিষিদ্ধ করে। এরপর বিভিন্ন সময়ে আদালতের আদেশে নদীর তীর ও নদীতে প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলা নিষিদ্ধ করা হয়েছে, নির্বাচনী প্রচারে প্লাস্টিকের পোস্টার ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে এবং বড় নদীগুলো থেকে প্লাস্টিক অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে ১৫ দিনের মধ্যে বুড়িগঙ্গার তীরে ইসলামবাগ, লালবাগ ও কামরাঙ্গীরচর এলাকায় ফেলে রাখা সব প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্য অপসারণে কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। তবে এসব আদেশের কোনোটিই বাস্তবে কার্যকর হতে দেখা যায়নি।

ইন্টারন্যাশনাল রিভারকিপার বাংলাদেশের প্রতিনিধি শরীফ জামিল বলেন, ‘সমন্বিত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মপরিকল্পনার অভাব দুর্নীতিকে উৎসাহিত করেছে। আর এখন সব জায়গায় মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যাচ্ছে।’
অন্যান্য পরিবেশকর্মীরাও বলছেন, ভালো আইন থাকা সত্ত্বেও সরকারগুলো সেগুলো কার্যকর করতে ব্যর্থ হয়েছে।
অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রণীত বাংলাদেশের টেকসই প্লাস্টিক ব্যবস্থাপনা বিষয়ক জাতীয় কর্মপরিকল্পনায় ২০২৫ সালের মধ্যে ৫০ শতাংশ প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার, ২০২৬ সালের মধ্যে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ৯০ শতাংশ পর্যায়ক্রমে বন্ধ করা এবং ২০২০-২১ সালের ভিত্তিমাত্রার তুলনায় ২০৩০ সালের মধ্যে সামগ্রিক প্লাস্টিক উৎপাদন ৩০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
কিন্তু এসব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্লাস্টিকের উৎপাদন ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই।
পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘সরকার শিগগির বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও পর্যটনকেন্দ্রে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার নিষিদ্ধ করবে।’
এই সংকট কীভাবে মোকাবিলার উপায় জানতে চাইলে এসডোর মহাসচিব শাহরিয়ার হোসেন বলেন, ‘সরকারকে “দূষণকারীই ব্যয় বহন করবে” নীতি নিতে হবে। অর্থাৎ, যে কোম্পানির পণ্য নদী দূষিত করছে, পরিষ্কারের দায়ভারও সেই কোম্পানিকেই নিতে হবে।’
প্লাস্টিকের ব্যাপক ব্যবহার বিবেচনায় সব ধরনের প্লাস্টিক পুরোপুরি নির্মূল করা বাস্তবসম্মত হবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তবে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক নির্মূল করা সম্ভব। সরকার এ ধরনের পণ্যের একটি তালিকা করেছে। সেখানে ১৭টি পণ্যের মধ্যে নয়টি ইতোমধ্যে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এখন প্রয়োজন যথাযথভাবে এসব সিদ্ধান্ত কার্যকর করা।’
তিনি আরও বলেন, ‘একবার ব্যবহারযোগ্য পিইটি বোতল উৎপাদনের সময় থেকেই মাইক্রোপ্লাস্টিক ছড়াতে শুরু করে এবং শত শত বছর ধরে তা ছড়াতে থাকে। আমাদের শিশুরা এই দূষণের মধ্যেই বেড়ে উঠছে।’