Image description

গল্পটি অনেক আগের। ফাইভ স্টার হোটেলের। প্রবেশমুখেই আর্চওয়ে। লুঙ্গিপরা একজন কবি প্রবেশ করতে গেলে আটকে দেয়া হয়। নিরাপত্তাকর্মী জানায়, লুঙ্গি পরে হোটেলে প্রবেশ করা যাবে না। হতচকিত কবি। কিংকর্তব্যবিমূঢ়। দূরে অপেক্ষায়। হঠাৎ দেখলেন এক ফরেনার শর্টপ্যান্ট পরিহিত, গডগড করে ঢুকে গেলেন। কবির মাথা খুলে গেল। পরনে থাকা লুঙ্গির নিচে ছিল শর্টপ্যান্ট। তিনি চটজলদি লুঙ্গি খুলে ব্যাগে পুরে আর্চওয়ে ক্রস করলেন। দায়িত্বরত সিকিউরিটি তখন ‘থ’।

ঢাকা ক্লাবে পোশাক নিয়ে বিতর্ক চলমান। এটা সকলের জানা। বৃটিশদের করা এই ক্লাবের রয়েছে পোশাক বিধিমালা। একসময় এর গেটে লেখা থাকতো বাঙালি আর কুকুরের প্রবেশ নিষেধ। বৃটিশ রাজের বিদায় হয়েছে। ভারত ভেঙে পাকিস্তান এসেছে। একাত্তরে মুক্তিসংগ্রামের মধ্যদিয়ে লাল সবুজের বাংলাদেশ। কিন্তু পোশাক নিয়ে টলেনি ক্লাব কর্তৃপক্ষ। অনেক বিতর্কের পর হালে তারা পোশাক নীতিমালায় কিছু পরিবর্তন এনেছে। প্রসঙ্গ ক্রমে, ২০০৯ সালের একটি ঘটনার উল্লেখ করছি। সে বছর অক্টোবরে লুঙ্গি পরার কারণে ফরহাদ মজহারকে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়েছিল। তা নিয়ে জল গড়িয়েছিল অনেকদূর।

২০২২ সালে নরসিংদী স্টেশনের ঘটনা উল্লেখ না করলেই নয়। সে বছরের ১৮ই মে একটি ঘটনা আলোচনার জন্ম দেয়। ঢাকার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী ট্রেনের জন্য অপেক্ষায়। পরনে জিনস ও টপস। অপেক্ষারত সেই তরুণী গালিগালাজ ও মারধরের শিকার হন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই ঘটনার ভিডিওচিত্র ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ভিডিওতে দেখা যায়, দুজন বোরকা পরা নারী ও দুজন পুরুষ মারমুখী আচরণ করছে তরুণীর সঙ্গে। তারা গালিগালাজের সঙ্গে পোশাক ধরে টানাটানি করছিল। নরসিংদী গোয়েন্দা পুলিশ প্রধান অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করেছিল। এ ঘটনায় মামলাও হয়েছিল। দেশ জুড়ে এর প্রতিবাদ হয়েছিল। রাজধানী থেকে জিনস টপস পরে দলবেঁধে অসংখ্য মানুষ নরসিংদীতে গিয়ে জানিয়েছিল এ পোশাকে অশালীন কিছু নেই।

ব্যক্তিগত একটি স্মৃতিচারণ করছি। সময়টা ১৯৯৩ সাল। নটর ডেম কলেজে আমার প্রথম দিন। গার্ডিয়ান টেরেন্স পিনেরু ক্লাসে প্রবেশ করে জানতে চাইলেন কারও কোনো প্রশ্ন আছে কিনা? তখনো কলেজে ড্রেস নির্ধারিত হয়নি। একজন প্রশ্ন করেন, পোশাক কী? স্যার বললেন, এখনো পোশাক নির্ধারিত হয়নি। তার মানে এই নয় যে, জিনস কেঁচি দিয়ে কেটে পাঙ্কু ডিজাইনে ক্লাসে আসবে। তা হবে না। এই ভিড়ের মধ্যে স্যারের চোখে পড়লো এক শিক্ষার্থী আয়রন মেইডেন লেখা টি-শার্ট পরা। স্যার তাকে দাঁড়িয়ে এর অর্থ বলতে বললেন। সে অপারগতা প্রকাশ করলে তিনি বললেন, এর অর্থ হচ্ছে ‘লৌহময়ী তরুণী’। কাজেই তুমি না জেনে যা পরেছো তা কখনোই ঠিক হয়নি। এ বিষয়গুলো মাথায় রাখা জরুরি।

উপরের প্রসঙ্গগুলো টানলাম একটাই কারণে, মেট্রোরেলের যাত্রীদের পোশাক নিয়ে কোনো বিধিনিষেধ নেই। হাফপ্যান্ট পরা একজন অ্যাথলেটকে পুলিশ মেট্রোরেলে প্রবেশে বাধা দেয়। হেনস্তা করে। চল্লিশ মিনিট তাকে প্রবেশ মুখে আটকে রাখে। ঘটনা ২৭শে সেপ্টেম্বরের। কর্র্তৃপক্ষ এ ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছে এবং মেট্রোতে প্রবেশে পোশাকের কোনো বিধিমালা নেই বলে জানিয়েছে। কথা হচ্ছে, হাফপ্যান্ট কী অশালীন পোশাক? তাহলে একজন যাত্রীকে মেট্রোরেলে প্রবেশে বাধা দেয়া হলো কেন? পুলিশের এই আচরণ নিয়েই বিতর্ক। অতি উৎসাহী ওই কর্মকর্তা কী নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে দিয়েছেন অন্যের ওপর?

প্রতিটি নাগরিকের চলাফেরা ও পোশাকের স্বাধীনতা তার অধিকার। কে হাফপ্যান্ট পরছে? কে জিনস টপস পরছে? কে বোরকা পরে চলাফেরা করছে এটা তার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। তামাম দুনিয়ায় সভ্য দেশগুলোতে এমনটাই নজির। তাহলে আমাদের অবস্থান কোথায়? শর্টস পরে মেট্রোতে ওঠতে বাধা দেয়ার প্রতিবাদে কর্মসূচি পালন করেছে এক পক্ষ। এর বিপরীতে আরেক পক্ষ শর্টসকে অশালীন বলে ফুলপ্যান্ট, বোরকা বিতরণ শুরু করেছে। চাপিয়ে দেয়া কোনো কিছু সঠিক বার্তা দেয় না। ভুল বার্তা পৌঁছে দেয়। সমাজে ভিন্ন মত, ভিন্ন সংস্কৃতির বিকাশ ও লালনই সত্যিকার বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের ইতিবাচক সূচক।

শালীন-অশালীন পার্থক্য শুধু ‘অ’ তে। তফাৎটা চিন্তা-চেতনায়। মন-মানসিকতায়। যিনি শর্টস পরে মেট্রোতে চড়েছেন তিনি একজন অ্যাথলেট। প্র্যাকটিস সেশন শেষে তিনি ফিরছেন। এর মধ্যে অশালীন কী ছিল? তিনি যদি অ্যাথলেট না-ও হতেন তাতেই বা দোষের কী? যদি মন ও মস্তিষ্কে অসুস্থ বিকৃত মানসিকতা না থাকে, দেখার দৃষ্টিভঙ্গি যদি সুন্দর থাকে- এ নিয়ে কোনো পক্ষেরই বাড়াবাড়ি বিবেচনাপ্রসূত নয়।