সরকারি হিসাব অনুযায়ী, মামলার এজাহার, প্রাথমিক তথ্যবিবরণী, জামিন কিংবা জামিন নামঞ্জুরের আদেশ, চার্জশিট, রায়সহ বিভিন্ন সময়ের আদেশের অনুলিপি তুলতে প্রতি পাতায় সর্বসাকুল্যে খরচ পড়ে ৮ টাকা। তবে চট্টগ্রামের বিভিন্ন আদালতের অনুলিপি শাখা থেকে নকল পেতে বিচারপ্রার্থীদের প্রতি পাতায় ৬০ থেকে ৭০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
শুধু তা-ই নয়, স্পর্শকাতর কিংবা গুরুত্বপূর্ণ মামলার রায় বা আদেশের নকল জরুরি ভিত্তিতে পেতে ক্ষেত্রবিশেষে প্রতি পাতায় সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায়ের নজির রয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) মোহাম্মদ রায়হানুল ওয়াজেদ চৌধুরী।
তিনি অভিযোগ করেন, অতিরিক্ত টাকা না দিলে দিনের পর দিন আদালতে ঘুরেও নকল কপি পাওয়া সম্ভব হয় না। আদালতের অনুলিপি শাখা ও বিভিন্ন সেকশনের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং আইনজীবীদের ক্লার্ক-মুহুরিদের একটি চক্র অবৈধভাবে এই টাকা আয় করছে।
তবে নকল সরবরাহের ক্ষেত্রে টাকা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন চট্টগ্রাম জেলা ও দায়রা জজ আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তা গিয়াস উদ্দিন। গতকাল বুধবার বিকেলে দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘আবেদনকারীরা অনুলিপির চাহিদামতো কোর্ট ফি ও কোর্ট ফলিও দিলেই নকল বা সার্টিফাইড কপি সরবরাহ করা হয়। প্রতি পাতার হিসাবে টাকা আদায়ের অভিযোগ সত্য নয়।’
জানা গেছে, সরকারি হিসাব অনুযায়ী অনুলিপির জন্য প্রতি পাতায় কোর্ট ফলিও বাবদ ভ্যাটসহ ৪ টাকা এবং ২ টাকা ৪০ পয়সা কোর্ট ফি দিতে হয়। অর্থাৎ প্রতি পাতায় সর্বসাকুল্যে খরচ পড়ে ৬ টাকা ৪০ পয়সা। কিন্তু চট্টগ্রামের বিভিন্ন আদালতের অনুলিপি শাখায় নকলের প্রতি পাতার জন্য বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীদের কাছ থেকে ৬০ থেকে ৭০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে বিপাকে পড়েছেন দরিদ্র ও অসহায় বিচারপ্রত্যাশীরা।
তথ্যসূত্র বলছে, চট্টগ্রামে দেওয়ানি ও ফৌজদারি মিলিয়ে আদালতের সংখ্যা প্রায় ১০০টি। অনুলিপি শাখা রয়েছে প্রায় ১০টি। এসব নকল শাখা থেকে গড়ে প্রতিদিন এক হাজারের বেশি বিভিন্ন মামলার নথি, রায় ও আদেশের অনুলিপি সরবরাহ করা হয়। নকল সরবরাহের খাতে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
আইনজীবীরা জানান, মামলার নথি পেতে একটি আবেদনপত্র ৬০ থেকে ৭০ টাকা দিয়ে কিনে তা পূরণ করে ২৫ টাকা কোর্ট ফি (স্ট্যাম্প) দিয়ে সংশ্লিষ্ট আদালতের নকল শাখায় জমা দিতে হয়। পরে ওই আবেদনপত্র সংশ্লিষ্ট আদালতে পাঠানো হয়। এ জন্য আদালতের কর্মচারীদের ২০০ থেকে ৫০০ টাকা দিতে হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
আইনজীবীদের অভিযোগ, মামলার সার্টিফাইড কপি পেতে তদবির না করলে আবেদনপত্র রেকর্ডরুমে পড়ে থাকে। নথি পাওয়া যায় না। ফলে অনেকেই বাড়তি টাকা দিয়ে নকল নেন। একটি মামলা বা নথির অনুলিপির জন্য সর্বনিম্ন ১ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। নথির পাতার সংখ্যা বাড়লে প্রতি পাতায় ৬০ থেকে ৭০ টাকা করে নেওয়া হয়। অর্থাৎ পাতা যত বাড়ে, টাকার অঙ্কও তত বাড়ে।
সৈয়দ মুরসালিন নামে এক ভুক্তভোগী জানান, চট্টগ্রামের তৃতীয় সাবজজ আদালতে জমিজমাসংক্রান্ত একটি মামলায় বাদীর অনুপস্থিতিতে খারিজের আদেশ হয় চলতি বছরের ১৫ জুন। ওই আদেশের অনুলিপি পেতে তার নিযুক্ত আইনজীবী গত ২০ জুলাই আবেদন করেন। প্রায় এক মাস পর গত ১৮ আগস্ট তিনি অনুলিপি হাতে পান। তিন পাতার ওই আদেশের অনুলিপির জন্য তাকে প্রতি পাতায় ১ হাজার টাকা করে দিতে হয়েছে।
গত মঙ্গলবার দুপুরে সরেজমিন চট্টগ্রাম জেলা আদালতের অনুলিপি শাখায় যান এই প্রতিবেদক। পরিচয় গোপন রেখে একটি মামলার রায়ের নকল পেতে প্রতি পাতায় কত টাকা খরচ পড়বে জানতে চাইলে ওই দপ্তরের প্রধান তুলনাকারী মো. শাহ আলম মজুমদারের পাশে বসা এক তুলনাকারী বলেন, ‘প্রতি পাতা ৬০ টাকা খরচ হবে।’
তবে অনুলিপি শাখার প্রধান তুলনাকারী মো. শাহ আলম মজুমদার জানান, যত পৃষ্ঠাই হোক, দেওয়ানি মামলার রায়ের অনুলিপির জন্য ৮ টাকা কোর্ট ফি লাগে। ফৌজদারি মামলার রায়ের জন্য প্রতি পৃষ্ঠায় ২ টাকা কোর্ট ফি লাগে। তার দপ্তর থেকে গড়ে প্রতিদিন ৮০০ থেকে ১ হাজার পৃষ্ঠার অনুলিপি সরবরাহ করা হয়। জরুরি ভিত্তিতে বিচারপ্রার্থীদের অনুলিপি সরবরাহ করতে ২ থেকে ৩ দিন সময় লাগে।
অনুলিপি সরবরাহে টাকা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে শাহ আলম মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আবেদনকারীরা মামলার রায় বা আদেশ সরবরাহের জন্য কোর্ট ফি ও কোর্ট ফলিও কিনে দেন। আমরা টাইপ করে যথাযথ কর্তৃপক্ষের স্বাক্ষর নিয়ে অনুলিপি সরবরাহ করি। কারও কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয় না।’
চট্টগ্রাম চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের অনুলিপি শাখার প্রধান তুলনাকারী রহমত উল্লাহ জানান, তার দপ্তর থেকে প্রতিদিন গড়ে বিভিন্ন মামলার রায় বা আদেশের ১০০ থেকে ১৫০টি অনুলিপি সরবরাহ করা হয়। তিনি বলেন, ‘আমি ২০১৩ সাল থেকে এখানে কর্মরত। এই দপ্তরে অনুলিপি সরবরাহের জন্য কোনো টাকা নেওয়া হয় না।’
চট্টগ্রাম আদালতের ট্রেজারি শাখার ট্রেজারার ফজলে আকবর চৌধুরী জানান, ১, ২, ৩, ৪, ৫, ১০ ও ২০ টাকার কোর্ট ফি এবং ২ টাকার কোর্ট ফলিও ভেন্ডারদের সরবরাহ করা হয়।
ভেন্ডার রতন কুমার নাথ জানান, ১০০ টাকার কোর্ট ফি ২৫ শতাংশ ভ্যাটসহ ১২০ টাকায় বিক্রি করা হয়। প্রতি পৃষ্ঠা কোর্ট ফলিও বিক্রি করা হয় ৪ টাকায়। আইনজীবীসহ বিভিন্ন হাত ঘুরে নকল শাখা পর্যন্ত গেলে টাইপিং খরচসহ নকল পেতে কিছু টাকা হয়তো নেওয়া হয়। তবে কেউ মাত্রাতিরিক্ত টাকা নেওয়া উচিত নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তথ্যসূত্র জানায়, সরকারি সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও হয়রানির অভিযোগ চট্টগ্রামের চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের (সিএমএম) কাছে সরাসরি দাখিল করা যাবে। সম্প্রতি এ জন্য একটি ই-মেইল খোলা হয়েছে। সিএমএমের দপ্তরের বাইরে বসানো হয়েছে স্বচ্ছ অভিযোগ বক্সও।
সরকারি সেবায় জবাবদিহিতা ও জনস্বার্থ সংরক্ষণের লক্ষ্যে দুর্নীতি, অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার ও বেআইনি কর্মকাণ্ডসংক্রান্ত তথ্য গ্রহণের জন্য ‘সিএমএম, চট্টগ্রাম সমীপে’ নামে এ অভিযোগ গ্রহণ ব্যবস্থা চালু করে এ বিষয়ে একটি প্রশাসনিক আদেশ জারি করা হয়েছে।