Image description

যেকোনো দেশের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক উন্নতির মূল শর্ত সুশাসন। কিন্তু বাংলাদেশের চিত্রটি একেবারেই উল্টো। সুশাসনের ছয়টি সূচকের সবকটিতেই হতাশার চিত্র। বিশ্বমানের মাপকাঠিতে কখনোই মাঝপথ পেরোতে পারেনি দেশ।

দুর্বল শাসনব্যবস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক অদক্ষতা আর দুর্নীতির জালে আটকে আছে অগ্রযাত্রা। খোদ সরকারি প্রতিষ্ঠান পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) ‘ফাইভ ইয়ার স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক’ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক এমন তথ্য।

বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ‘ওয়ার্ল্ডওয়াইড গভর্ন্যান্স ইন্ডিকেটরস (ডব্লিউজিআই) ট্রেন্ড ফর বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনের তথ্য উল্লেখ করে জিইডি বলেছে, সুশাসনের প্রধান ছয়টি সূচকের একটিতেও ১০০-এর মধ্যে ৫০ স্কোর ছুঁতে পারেনি বাংলাদেশ। দুর্নীতি দমন, আইনের শাসন কিংবা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা— সব খাতেই প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে পিছিয়ে বাংলাদেশ। সুশাসনের সূচকগুলো হলো— মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও জবাবদিহি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সরকারের কার্যকারিতা, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর গুণমান, আইনের শাসন এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ।

সংস্কারের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে জিইডি আরও বলেছে, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং উন্নয়নমূলক ফলাফল নির্ধারণের জন্য সুশাসন অপরিহার্য পূর্বশর্ত। এর অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলো হলো— সরকারি সম্পদের কার্যকর ব্যবস্থাপনা, আইনের শাসনের প্রতি আনুগত্য, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, বিচক্ষণ রাজস্ব ও মুদ্রানীতি, স্বল্প মূল্যস্ফীতি ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি। এসব বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত পরিবেশ প্রতিষ্ঠা করাকেই সুশাসন বোঝায়। যখন শাসন কাঠামো দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে, তখন তা স্থিতিশীল অর্থনৈতিক অবস্থা সৃষ্টি করে।

ফ্রেমওয়ার্কটি তৈরিতে যুক্ত ছিলেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. কে এ এস মুর্শিদ। তিনি আগামীর সময়কে বললেন, ‘সুশাসন নিশ্চিত করা হয়তো রাতারাতি সম্ভব নয়। তবে এ বিষয়ে যেরকম দৃঢ় পদক্ষেপ প্রয়োজন তেমনটা অতীতে দেখা যায়নি। এটি একটি জটিল জায়গা। এখানে খুব ফোকাসভাবে না দেখে শুধু পরিকল্পনা করলেই হবে না। কেননা আমাদের পরিকল্পনায় অনেক জিনিস থাকে, কিন্তু বাস্তবায়নের অবস্থা ঐতিহাসিকভাবে দুর্বল। সুশাসনে অগ্রগতির জন্য এত দিন কোনো ম্যাকানিজম (কাঠামো) তৈরি হয়নি। এখন চেষ্টা চলছে। আশা করা যাচ্ছে, কিছু একটা হবে।’

ফ্রেমওয়ার্কে জিইডি বলেছে, ২০১৫-২৪ সাল পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী সুশাসন সূচক এবং বাংলাদেশের সামগ্রিক সুশাসন স্কোরের বার্ষিক প্রবণতা দেখানো হয়েছে। তথ্য থেকে দেখা যায়, বাংলাদেশ সুশাসনের ছয়টি সূচকের সবকটিতেই ধারাবাহিকভাবে মধ্যবিন্দুর (৫০) নিচে স্কোর করেছে। এই পুরো ১০ বছর সময়কাল জুড়ে সামগ্রিক সুশাসন স্কোর এই সীমার নিচেই থেকেছে।

সূচকগুলোর মধ্যে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ সবচেয়ে উদ্বেগজনক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। যার স্কোর ধারাবাহিকভাবে ৩০-এর নিচে রয়েছে, যা ক্ষুদ্র-বৃহৎ— উভয় প্রকার দুর্নীতি মোকাবিলায় উল্লেখযোগ্য প্রতিবন্ধকতার প্রতিফলন।

এ ছাড়া ২০২৪ সালে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কমেছে। এটি সম্ভবত দেশের রাজনৈতিক পালাবদলের কারণে হয়েছে। আঞ্চলিক পর্যায়ে বাংলাদেশের সুশাসনের কার্যকারিতা বেশ কয়েকটি দেশের তুলনায় তুলনামূলকভাবে দুর্বল। ভারত, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কাসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় এই তুলনামূলক দুর্বল কর্মক্ষমতা ব্যাপক প্রাতিষ্ঠানিক ও নীতিগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।

বৈশ্বিক সুশাসনের মানের সঙ্গে আরও ভালোভাবে সামঞ্জস্য বিধানের জন্য, বাংলাদেশ সরকার দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থা জোরদার করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে সূচক উন্নয়নের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেবে।

দেশের বর্তমান শাসনব্যবস্থার চিত্রটি কাঠামোগত দুর্বলতা, প্রাতিষ্ঠানিক বিভাজন এবং উদীয়মান সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপের সংমিশ্রণকে প্রতিফলিত করে বলে মনে জিইডি। এ অবস্থা সম্মিলিতভাবে কার্যকর জনপ্রশাসন এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে বাধাগ্রস্ত করে। প্রধান বৈশ্বিক সূচকগুলো এই চলমান চ্যালেঞ্জগুলোকে তুলে ধরে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও জবাবদিহির স্কোর ৩৬ দশমিক ৫৩, সরকারি কার্যকারিতা ৩৯ দশমিক ৩১। কম স্কোর দুর্বল স্বচ্ছতা, সীমিত প্রতিষ্ঠানিক অদক্ষতা এবং প্রয়োগ ক্ষমতার ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়। এই শাসনতান্ত্রিক ঘাটতিগুলো বিশেষত অবকাঠামো, ব্যাংকিং, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি এবং সামাজিক সুরক্ষার মতো খাতগুলোয় দৃশ্যমান, যেখানে খণ্ডিত প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা, দুর্বল তদারকি এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ অদক্ষতা, সম্পদের অপব্যবহার এবং দুর্নীতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

দুর্নীতির কারণে বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পগুলোয় ব্যয় ও সময়সীমা ক্রমাগতভাবে অনেক বেড়ে যাচ্ছে বলে জানালেন ফ্রেমওয়ার্কটি তৈরির দায়িত্বপ্রাপ্ত জিইডির সদস্য (সচিব) ড. মঞ্জুর হোসেন। আগামীর সময়কে তিনি বললেন, ব্যাংক খাত গভীর দুর্বলতার সম্মুখীন, যার প্রমাণ হলো খেলাপি ঋণের হার উদ্বেগজনক ঊর্ধ্বগতি। একই সময়ে জননিরাপত্তা, বিচারিক সক্ষমতা এবং আইন প্রয়োগ ব্যবস্থার দুর্বলতা আইনের শাসনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধতা সৃষ্টি করেছে। এগুলো ব্যবসায়িক আস্থা এবং চুক্তি প্রয়োগকে দুর্বল করে। আমলাতান্ত্রিক অদক্ষতা, নিম্ন প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে সম্পদের অপর্যাপ্ত বরাদ্দের কারণে সরকারি সেবা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কেন্দ্রীভূত শাসন কাঠামো এবং দুর্বল সমন্বয়, স্থানীয় চাহিদা পূরণে সক্ষমতাকে আরও সীমিত করে, যা সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে পরিষেবা দেওয়ায় ঘাটতি, পুনরাবৃত্তি এবং অপচয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

শাসনতান্ত্রিক চ্যালেঞ্জগুলো ক্রমবর্ধমানভাবে বাহ্যিক অভিঘাতের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করছে উল্লেখ করে ড. মঞ্জুর বলছিলেন, ‘বিশেষ করে চলমান জ্বালানি সংকট, যা নীতি সমন্বয়, ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর স্বচ্ছতার ঘাটতিগুলোকে উন্মোচিত করেছে। জ্বালানির ক্রমবর্ধমান মূল্য, সরবরাহ বিঘ্ন এবং অসামঞ্জস্যপূর্ণ নীতি সংকেত মুদ্রাস্ফীতির চাপ ও জনমনে অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে দিয়েছে। সামগ্রিকভাবে, বাংলাদেশের বর্তমান শাসনব্যবস্থা দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়, সীমিত জবাবদিহি এবং সক্ষমতা বৃদ্ধিতে অপর্যাপ্ত বিনিয়োগকে চিহ্নিত করে। এর সবই দক্ষ সেবা প্রদানে বাধা সৃষ্টি করে, বিনিয়োগ পরিবেশকে দুর্বল এবং টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য ঝুঁকি সৃষ্টি করে। এসব বিচেনায় পাঁচ বছরের স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্কে নানা পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।’

ফ্রেমওয়ার্কে বলা হয়েছে, যখন আইনশৃঙ্খলার প্রয়োগ দুর্বল হয় এবং অপর্যাপ্ত মনোযোগ পায়, তখন অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ কার্যকারিতা ব্যাহত হয়। কারণ এটি ব্যবসায়িক কার্যক্রম এবং বিনিয়োগের জন্য স্থিতিশীল ও নিরাপদ পরিবেশ দিতে ব্যর্থ হয়। এ বিষয়ে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত ডেটাসেট হলো বিজনেস রেডি (বি-রেডি) সূচক, যা প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রভাবিত করে এমন নিয়ন্ত্রক কাঠামো এবং সরকারি পরিষেবাগুলোর মূল্যায়ন করে। পাশাপাশি এই নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা এবং পরিষেবাগুলো বাস্তবে কতটা দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়িত হয় সেটিও মূল্যায়ন করে। এটি তিনটি মাত্রার ওপর ভিত্তি করে গঠিত।

ফ্রেমওয়ার্কের কৌশলগত ব্যবস্থা: স্বচ্ছতা ও দুর্নীতি দমন ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ, সরকারি সেবা দেওয়া এবং আমলাতান্ত্রিক দক্ষতার সংস্কার, আইনের শাসন ও বিচার ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ এবং উপজাতীয় শাসন ও বিকেন্দ্রীকরণ বৃদ্ধি করা হবে। এ ছাড়া বিনিয়োগ ও বেসরকারি খাতের উন্নয়নের জন্য সুশাসনের উন্নতি ঘটনো হবে। আরও আছে, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা ও দুর্নীতি দমন। প্রধান সরকারি প্রকল্পগুলোয় অতিরিক্ত ব্যয় এবং অনিয়ম কমপক্ষে ২০ শতাংশ কমিয়ে সরকারি ব্যয়ে দুর্নীতি ও অর্থ অপচয় কমানো হবে। সব সরকারি প্রতিষ্ঠান যেন স্বচ্ছ প্রতিবেদন, নিরীক্ষা সম্মতি এবং অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা নেয়, তা নিশ্চিতের মাধ্যমে জবাবদিহি ও তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করা হবে।

সম্ভব্য প্রধান কার্যক্রমগুলোর মধ্যে রয়েছে— সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় বড় সংস্কার। সব মন্ত্রণালয় ও সংস্থায় বাধ্যতামূলক ই-জিপি প্ল্যাটফর্মের বাস্তবায়ন কার্যকরের মাধ্যমে সরকারি ব্যয় সুরক্ষিত করা হবে। অস্বচ্ছতা ও যোগসাজশ কমাতে উন্মুক্ত চুক্তি মানদণ্ড এবং ক্রয়সংক্রান্ত তথ্যের বাধ্যতামূলক প্রকাশ ব্যবস্থা চালু হবে। নিরীক্ষা ও তদারকি প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালীকরণ করা হবে। বৃহৎ অবকাঠামো এবং মেগা প্রকল্পগুলোর জন্য রিয়েল টাইম ব্যয় ট্র্যাকিং এবং ঝুঁকিভিত্তিক নিরীক্ষা চালু হবে। সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা, প্রকল্প পর্যবেক্ষণ এবং সেবা প্রদান নিরীক্ষণের জন্য তৈরি করা হবে সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। সরকারি ব্যয়, প্রকল্পের অগ্রগতি এবং ক্রয়সংক্রান্ত ফলাফলের ওপর সর্বসাধারণের জন্য প্রবেশযোগ্য ড্যাশবোর্ড স্থাপন করা হচ্ছে। দুর্নীতি দমন আইন প্রয়োগ এবং আইনি সংস্কার আনা হবে। বিশেষ বিচারিক ব্যবস্থার মাধ্যমে দুর্নীতি-সম্পর্কিত মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি এবং উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতির জন্য কঠোর শাস্তির বিধান হবে। অবকাঠামো ও সামাজিক সুরক্ষার মতো খাতগুলোয় বিভাজন কমাতে প্রতিষ্ঠা হবে আন্তঃসংস্থা সমন্বয় ব্যবস্থা। সেবা প্রদানের ফলাফলের সঙ্গে সংযুক্ত সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য কর্মদক্ষতাভিত্তিক জবাবদিহির ব্যবস্থা চালু হবে। আর্থিক খাতের সুশাসন শক্তিশালীকরণ করা হবে। ব্যাংক খাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বাধীনতা ও তত্ত্বাবধান কার্যক্রম বাড়ানো হবে। এ ছাড়া মামলা নিষ্পত্তির হার বৃদ্ধি, পদ্ধতিগতভাবে বিদ্যমান জমে থাকা মামলা হ্রাস এবং গড় নিষ্পত্তির সময় ৩০ শতাংশ কমানোর মাধ্যমে বিচারিক দক্ষতা বাড়ানো হবে। পাশাপাশি ১০ বছর বা তার বেশি সময় ধরে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো এবং নারী ও শিশু নির্যাতনসংক্রান্ত মামলার নিষ্পত্তি ত্বরান্বিত নিশ্চিত করা হবে।