Image description
ড. ইয়াসির ক্বাধীর
 
কারণ সেদিনই প্রথম বুঝলাম, আন্দালুসের পতনের সঙ্গে আমেরিকা অভিযানের ইতিহাস কতটা গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
১৪৯২ সাল ইতিহাসের পাতায় শুধু একটি বছর নয়। এই বছরেই স্পেনে প্রায় সাড়ে সাতশ বছরের মুসলিম শাসনের শেষ দুর্গ গ্রানাডার পতন ঘটে। আর একই বছর স্প্যানিশ রাজদরবারের পৃষ্ঠপোষকতায় ক্রিস্টোফার কলম্বাস আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে আমেরিকার উপকূলে পৌঁছান।
 
আমি যখন প্রথম আন্দালুসে যাই, তখন আমার ইতিহাসের জ্ঞান মূলত আরবি উৎসের বইগুলোর ওপর নির্ভরশীল ছিল। আর এসব বইয়ে ১৪৯২ সালে মুসলিম শাসনের পতনের মধ্য দিয়েই যেন ইতিহাসের একটি অধ্যায় শেষ হয়ে যায়।
 
তাই পশ্চিমা ইতিহাসের সঙ্গে এই পতনের কী সম্পর্ক, তা নিয়ে আমার তেমন কোনো ধারণা ছিল না।
একদিন গ্রানাডার বিখ্যাত আলহামব্রা প্রাসাদের বাগানে ঘুরছিলাম। হঠাৎ সেখানে ক্রিস্টোফার কলম্বাসের একটি বিশাল ভাস্কর্য দেখতে পেলাম।
আমি অবাক হয়ে ট্যুর গাইডকে জিজ্ঞেস করলাম, “এখানে কলম্বাস কী করছেন? এই জায়গার সঙ্গে তাঁর কী সম্পর্ক?”
 
তখন গাইড আমাকে এমন একটি তথ্য জানালেন, যা আমার কাছে অত্যন্ত বিস্ময়কর ছিল।
তিনি বললেন, কলম্বাসের এই ভাস্কর্যটি ঠিক সেই জায়গায় স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে দাঁড়িয়ে কলম্বাস ১৪৯২ সালের ২ জানুয়ারি গ্রানাডার মুসলিম শাসনের আত্মসমর্পণ প্রত্যক্ষ করেছিলেন।
সেদিন নাসরিদ বংশের শেষ সুলতান আবু আব্দুল্লাহ ফার্দিনান্দ ও ইসাবেলার হাতে আলহামব্রা প্রাসাদের চাবি তুলে দিয়েছিলেন। আর কলম্বাস তখন সেই রাজদরবারের ভিড়ের মধ্যেই উপস্থিত ছিলেন।
তখন আমি বুঝতে শুরু করলাম, ১৪৯২ সালের এই দুটি ঘটনা আসলে একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।
 
কলম্বাস তখন ভারতে যাওয়ার একটি নতুন সমুদ্রপথ খুঁজে বের করার পরিকল্পনা করছিলেন। কিন্তু এমন একটি অভিযানের জন্য তাঁর প্রয়োজন ছিল প্রচুর অর্থ, জাহাজ ও রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা।
তিনি বহু বছর ধরে রাজা ফার্দিনান্দ ও রানি ইসাবেলার পেছনে পেছনে ঘুরছিলেন। এক যুদ্ধশিবির থেকে আরেক যুদ্ধশিবিরে গিয়ে তাঁদের কাছে তাঁর অভিযানের জন্য অর্থ বরাদ্দ চাচ্ছিলেন।
কিন্তু তখন স্পেন মুসলিমদের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে ব্যস্ত। রাজদরবারের বিপুল অর্থ যুদ্ধেই ব্যয় হচ্ছিল। ফলে কলম্বাসের এই ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে অর্থ দেওয়ার মতো পরিস্থিতি ছিল না।
কিন্তু গ্রানাডার পতনের পর সবকিছু বদলে গেল।
 
মুসলিম শাসকদের রাজকোষ, শত শত বছরের সঞ্চিত সম্পদ এবং আলহামব্রার বিপুল ঐশ্বর্য স্প্যানিশ রাজপরিবারের হাতে চলে এলো।
আর এরপরই ফার্দিনান্দ ও ইসাবেলা কলম্বাসের অভিযানে অর্থায়নের অনুমোদন দিলেন।
 
অর্থাৎ, যে অভিযানের মাধ্যমে কলম্বাস আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে নতুন ভূখণ্ডে পৌঁছালেন, তার পেছনের অর্থনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছিল গ্রানাডার পতনের পর।
এই বিষয়টি জানার পর আমার কাছে ১৪৯২ সালকে আর কখনোই শুধু একটি কাকতালীয় বছর মনে হয়নি।
 
এরপর আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, কলম্বাস তাঁর ঐতিহাসিক সমুদ্রযাত্রার প্রস্তুতি কোথায় নিয়েছিলেন, সেই জায়গাটিও আমাকে দেখতে হবে।
আমি একটি গাড়ি ভাড়া করে স্পেনের উপকূলীয় অঞ্চলের পালোস দে লা ফ্রন্তেরার কাছে লা রাবিদা নামের একটি আশ্রমে গেলাম।
জায়গাটি ছিল একেবারেই নিরিবিলি। সেখানে পর্যটকদের ভিড়ও ছিল না।
 
আমি যখন টিকিট কাটতে গেলাম, সেখানে কর্মরত এক নারী আমাকে দেখে বুঝতে পারলেন যে আমি একজন মুসলিম। তিনি হঠাৎ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লেন।
তারপর তিনিই আমার গাইড হয়ে গেলেন।
 
তিনি আমাকে আশ্রমটির ভেতর ঘুরিয়ে দেখাতে শুরু করলেন এবং বললেন, “আপনি জানেন, এটি আগে কী ছিল?”
তিনি আমাকে জানালেন, এই জায়গাটি আগে একটি মুসলিম মসজিদ ও রিবাত ছিল।
 
তারপর তিনি আমাকে মেহরাবের পুরোনো জায়গাটি দেখালেন। তিনি দেখালেন, মসজিদের মিনারটি কীভাবে কেটে ফেলা হয়েছিল এবং সেখানে কীভাবে খ্রিষ্টানদের ক্রুশ স্থাপন করা হয়েছিল।
আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম, এখানেই একসময় মুসলিমরা নামাজ পড়তেন। আর কয়েক শতাব্দী পর ঠিক এই জায়গাতেই কলম্বাস তাঁর সমুদ্রযাত্রার পরিকল্পনা করছেন।
‘লা রাবিদা’ নামটির উৎস নিয়েও আমাকে বলা হলো। এটি আরবি ‘রিবাত’ শব্দ থেকে এসেছে বলে ব্যাখ্যা করা হয়। রিবাত ছিল সীমান্ত পাহারা ও ধর্মীয় সাধনার সঙ্গে যুক্ত একটি সামরিক-আধ্যাত্মিক দুর্গ।
আর সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, কলম্বাস এখানে প্রায় ছয় মাস অবস্থান করেছিলেন। এখানেই তিনি তাঁর সমুদ্রযাত্রার পরিকল্পনা, মানচিত্র ও নৌ-পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছিলেন।
আজও সেখানে তাঁর ব্যবহৃত বলে পরিচিত সেই পুরোনো কাঠের ডেস্ক ও চেয়ার সংরক্ষিত রয়েছে।
 
আমি যখন সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম, তখন বিষয়টি আমার কাছে আরও পরিষ্কার হয়ে উঠছিল। আন্দালুসের পতন শুধু একটি মুসলিম রাজ্যের পতন ছিল না। এর পরপরই ইউরোপীয় শক্তির দৃষ্টি আরও বড় এক বিশ্বের দিকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছিল।
 
কলম্বাসের অভিযানকে শুধু একটি নতুন সমুদ্রপথ খোঁজার নিরীহ প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখলে বিষয়টির একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যায়।
এর পেছনে ছিল রিকনকোয়েস্তার দীর্ঘ ইতিহাস। স্পেনের মাটি থেকে মুসলমানদের বিতাড়িত করার যে দীর্ঘ সামরিক ও ধর্মীয় প্রক্রিয়া চলেছিল, গ্রানাডার পতনের মাধ্যমে তার সমাপ্তি ঘটে।
আর এরপর সেই দখলদারির মানসিকতা আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে বিশ্বের অন্য প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে।
স্পেনে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যে ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্ববোধ, জোরপূর্বক ধর্মান্তর, বিতাড়ন ও নিপীড়নের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে আমেরিকার আদিবাসীদের ওপর ইউরোপীয় উপনিবেশবাদের মধ্যেও তার নানা প্রকাশ দেখা যায়।
 
আরেকটি বিষয়ও আমাকে ভাবিয়েছে।
ইউরোপ যখন সমুদ্র পাড়ি দিয়ে নতুন পৃথিবী জয় করতে শুরু করল, তখন তারা যে জ্ঞান ও প্রযুক্তি ব্যবহার করছিল, তার একটি বড় অংশের পেছনে ছিল মুসলিম বিশ্বের দীর্ঘ জ্ঞানচর্চা।
জ্যোতির্বিজ্ঞান, মানচিত্র, দিকনির্ণয়, অ্যাস্ট্রোলোব এবং ভূগোলের উন্নত জ্ঞান, এসব ক্ষেত্রে আন্দালুসসহ মুসলিম বিশ্বের গবেষণা ইউরোপীয় নৌ-অভিযানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছিল।
তাই আন্দালুসের ট্র্যাজেডি শুধু একটি জনপদ হারানোর গল্প নয়।
১৪৯২ সালে একদিকে শেষ হয়ে গেল প্রায় সাড়ে সাতশ বছরের মুসলিম আন্দালুস, আর অন্যদিকে শুরু হলো এমন এক ইউরোপীয় সম্প্রসারণের যুগ, যা পরবর্তী কয়েক শতাব্দীতে বিশ্বের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মানচিত্র বদলে দেবে।
 
ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয়গুলোর একটি হলো, একটি সভ্যতার পতনের মুহূর্ত কখনো কখনো অন্য একটি যুগের উত্থানের সূচনাও হয়ে যায়।
১৪৯২ সাল তারই এক গভীর উদাহরণ।
 
লেখাটি ড. ইয়াসির ক্বাধীর ‘Lessons From Andalusia’ শীর্ষক ঐতিহাসিক লেকচারের ভাবানুবাদ।