Image description

মুমূর্ষু রোগী নিয়ে হাসপাতালে ছুটে এসেছেন স্বজনেরা। দ্রুত চিকিৎসা দরকার। এমন সংকটের মুহূর্তে দেবদূতের মতো এগিয়ে আসেন কেউ একজন। নিজেকে হাসপাতালের লোক পরিচয় দিয়ে বলেন, রোগী নিয়ে চিন্তার কিছু নেই, সব ব্যবস্থা করে দেবেন তিনি। বিপদের সময় তাঁর কথাই বিশ্বাস করেন স্বজনেরা। এরপর রোগীকে নিয়ে যান আশপাশের কোনো বেসরকারি হাসপাতালে। সেখানেই শুরু হয় নতুন বিপদ। চিকিৎসা মিললেও গুনতে হয় কয়েক গুণ বেশি টাকা। কখনো আবার টাকার অভাবে মেলে না চিকিৎসাও। যথাসময়ে চিকিৎসা না পেয়ে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে।

কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (কুমেক) চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও স্বজনদের এমনই ফাঁদে ফেলছে একটি দালাল চক্র। জরুরি বিভাগ, বহির্বিভাগ ও প্রধান ফটকসহ হাসপাতালের বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান নিয়ে রোগীদের বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও প্যাথলজি সেন্টারে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। কয়েক দফা অভিযান চালিয়ে কারাদণ্ড দেওয়ার পরও বন্ধ হয়নি দালালদের এই তৎপরতা।

আশপাশের কয়েকটি জেলার মানুষের চিকিৎসার অন্যতম ভরসা কুমেক। হাসপাতালটিতে অনুমোদিত শয্যার তুলনায় প্রায় আড়াই গুণ বেশি রোগী ভর্তি থাকেন। প্রতিদিন বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসেন দেড় হাজারের বেশি রোগী। জরুরি বিভাগেও সেবা নেন শতাধিক মানুষ। রোগীর এই চাপকেই কাজে লাগাচ্ছেন দালালেরা।

হাসপাতাল সূত্র ও স্থানীয় একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দালালদের এই তৎপরতার সবচেয়ে বড় লক্ষ্য বহির্বিভাগে আসা রোগীরা। চিকিৎসকের কক্ষ থেকে বের হওয়ার পর তাদের ব্যবস্থাপত্র দেখে পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা বোঝার চেষ্টা করেন দালালরা। এরপর কম খরচে উন্নতমানের পরীক্ষা করিয়ে দেওয়ার কথা বলে নির্দিষ্ট বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। গ্রামের রোগীরা এ ধরনের প্রলোভনে তুলনামূলক বেশি পড়ছেন।

তাদেরই একজন কুমিল্লা নগরের চকবাজার এলাকার বাসিন্দা তাসলিমা বেগম। তার ভাষ্য, ৯ মাস আগে অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় কুমেকের বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে গিয়েছিলেন। চিকিৎসকের কক্ষ থেকে বের হওয়ার পর তিনজন তাকে বেসরকারি ক্লিনিকে যাওয়ার জন্য ঘিরে ধরেন। একপর্যায়ে তাকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করিয়ে তারা চলে যান। পরে সেখানে তাকে নানা ভোগান্তিতে পড়তে হয়।

২০২৪ সালের অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে একই ধরনের ঘটনার শিকার হন ফাতেমা বেগম নামের এক প্রসূতি। হাসপাতালের গেট এলাকায় এক ব্যক্তি নিজেকে হাসপাতালের লোক পরিচয় দিয়ে কম খরচে সন্তান প্রসব করানোর কথা বলেন। তার কথায় ফাতেমা ও তার স্বজনরা একটি বেসরকারি হাসপাতালে যান। সেখানে চিকিৎসার খরচ হিসাবে ৬০ হাজার টাকা নেওয়ার পর ওই ব্যক্তি সরে যান। সন্তান জন্মের পর নবজাতকের মৃত্যু হলে পরিবার এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়।

দালালদের তৎপরতা শুধু রোগীকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। হাসপাতাল সূত্র ও স্থানীয় ব্যক্তিদের অভিযোগ, নির্দিষ্ট প্যাথলজি সেন্টারে পরীক্ষা করানো, নির্দিষ্ট ফার্মেসি থেকে ওষুধ কেনা এবং অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহারের ক্ষেত্রেও কমিশনভিত্তিক লেনদেন রয়েছে।

 

তবে দালালদের বিরুদ্ধে এর আগেও ব্যবস্থা নিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ২০২৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডের সামনে থেকে চারজনকে আটক করেন আনসার সদস্যরা। তাদের বিরুদ্ধে রোগীদের বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া, নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা করানো এবং নির্দিষ্ট ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনতে বাধ্য করার অভিযোগ ছিল। এরপরও তৎপরতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবর র‌্যাব-১১ ও জেলা প্রশাসন কুমেক হাসপাতাল ও আশপাশের এলাকায় যৌথ অভিযান চালায়। এ সময় ১৪ জনকে আটক করে যাচাই করা হয়। এর মধ্যে দালালি কার্যক্রমে সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়ায় ১০ জনকে ভ্রাম্যমাণ আদালতে ২০ দিন করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত  পরিচালক ডা. শাহজাহানের ভাষ্য, ‘দালালদের উৎপাত রোধে আনসার ও হাসপাতালের স্টাফরা সক্রিয় রয়েছেন। আমরা প্রায় সময়ই পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতা চাই। প্রশাসন এসে দালালদের ধরে নিয়ে যায়। আবার এক দেড় মাস পর তারা হাজত থেকে বের হয়ে এসে উৎপাত শুরু করে। তাদের বেশিরভাগই স্থানীয়। সম্প্রতি দালাল ও অ্যাম্বুলেন্স প্রতিরোধ কমিটি করা হয়েছে।’

তবে তারা যদি দীর্ঘ সময় কারাবরণ করতো, তখন দালাল চক্রের সক্রিয়তা হ্রাস পেত- মনে করেন তিনি। তারপরও প্রতিরোধ কমিটির মাধ্যমে দালাল প্রতিরোধে আরো সক্রিয়ভাবে কাজ শুরু করার আশ্বাস দিয়েছেন ডা. শাহজাহান।

হাসপাতাল এলাকার আশপাশের লোকজনের ভাষ্য, দালালদের একটি অংশ সকাল থেকে বিকাল, আরেকটি অংশ বিকাল থেকে রাত এবং অন্যরা রাত থেকে সকাল পর্যন্ত দায়িত্ব ভাগ করে কাজ করে। অর্থাৎ হাসপাতালের ২৪ ঘণ্টার কার্যক্রমকে ঘিরেই তাদের তৎপরতা চলে।

এক আনসার সদস্য বললেন, ‘জরুরি বিভাগ ও ক্যাজুয়েলটি থেকে রোগীদের কৌশলে বেসরকারি ক্লিনিকে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। উন্নত পরীক্ষা-নিরীক্ষার কথা বলে রোগীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।’

হাসপাতালের নিরাপত্তাকর্মীরা বলছেন, দালালদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে গিয়ে নিরাপত্তাকর্মীসহ কেউ কেউ হুমকি ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এমনকি প্রতিবাদ করায় রোগীর স্বজনদের বাড়ি ফেরার পথে হামলার ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ারের ভাষ্য, হাসপাতালে দালাল চক্রের ফাঁদ থেকে রোগীদের রক্ষা করতে পুলিশের নজরদারি রয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সহযোগিতা চাইলে অভিযান পরিচালনা করা হয়।