Image description

দেশে ও বিদেশে বাংলাদেশিদের পাসপোর্ট হারানো, চুরি ও নষ্ট হওয়ার ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। গত ছয় মাসে হারানো পাসপোর্টের জন্য ১ লাখ ৭ হাজার ৩০০টি আবেদন এসেছে বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরে। অর্থাৎ প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ১৭ হাজার ৮৮৫টি এবং প্রতিদিন প্রায় ৬০০টি হারানো পাসপোর্টের আবেদন জমা পড়েছে।

অধিদফতর সূত্র বলছে, পাসপোর্ট হারানোর কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে তিনটি বিষয় সামনে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে বিদেশ যাওয়ার ক্ষেত্রে ভিসা এজেন্সির কাছে পাসপোর্ট জমা দিয়ে তা ফেরত না পাওয়া, বিদেশে গিয়ে কর্মরত এজেন্সির কাছে পাসপোর্ট আটকে থাকা এবং অবৈধ উপায়ে বিদেশে যাওয়ার পর নতুন পাসপোর্টের আবেদন করা।

পাসপোর্ট হারানোর আবেদনের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় অধিদফতরে কাজের চাপও বাড়ছে। নতুন পাসপোর্টের আবেদনের পাশাপাশি এসব পুনঃইস্যুর আবেদন সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন কর্মকর্তারা। একই সঙ্গে সরকারি অর্থেরও অপচয় হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

পাসপোর্ট হারানোর নেপথ্যে যা জানা গেছে

অধিদফতরের কর্মকর্তারা জানান, একজন ব্যক্তি পাসপোর্ট পাওয়ার পর বিদেশ যাওয়ার জন্য কোনও এজেন্সির কাছে তা জমা দেন। এজেন্সি ভিসা করে দিতে ব্যর্থ হলে বিভিন্নভাবে সময়ক্ষেপণ করতে থাকে। একপর্যায়ে পাসপোর্টটি ফেরত না পেয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি থানায় পাসপোর্ট হারিয়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। এরপর নতুন পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেন।

বিদেশে যাওয়ার পরও একই ধরনের ঘটনা ঘটছে। কোনও এজেন্সির মাধ্যমে বিদেশে গিয়ে কাজের জন্য পাসপোর্ট জমা দিয়ে আকামা নেওয়ার পর কাজ করতে থাকেন অনেকে। পরে ভালো কোনও সুযোগ পেয়ে অন্য জায়গায় যাওয়ার চেষ্টা করলে এজেন্সির কাছে থাকা পাসপোর্ট আর ফেরত পান না। তখন দূতাবাসে গিয়ে পাসপোর্ট হারিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়ে নতুন পাসপোর্টের আবেদন করেন।

এ ছাড়া অবৈধ উপায়ে যারা বিদেশে যান, তাদের কেউ কেউ হাতে থাকা পাসপোর্ট থাকা সত্ত্বেও নতুন পাসপোর্টের আবেদন করেন। কেউ আবার অবৈধভাবে বিদেশে গিয়ে নিজের পাসপোর্ট নষ্ট করে নতুন পাসপোর্টের আবেদন করেন। এভাবেই প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক হারানো পাসপোর্টের আবেদন আসছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

দ্বিতীয়বার হারালে ১০ হাজার টাকা

পাসপোর্ট হারানোর প্রবণতা কমাতে প্রথমবার হারানো বা নষ্ট হওয়া পাসপোর্টের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কোনও ফি না নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে দ্বিতীয়বার পাসপোর্ট হারালে নির্ধারিত ফির সঙ্গে অতিরিক্ত ১০ হাজার টাকা দণ্ড ফি বা জরিমানা দিতে হবে।

অধিদফতরের কর্মকর্তারা জানান, পাসপোর্ট হারানোর ঘটনা বাড়তে থাকায় বিষয়টি নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়। এরপর কয়েক দফা সভা হয়। বাংলাদেশের মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার বিবেচনায় ১০ হাজার টাকা অতিরিক্ত অর্থকে বেশি মনে করা হলেও পাসপোর্ট হারানোর প্রবণতা কমাতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গত ২১ সেপ্টেম্বর এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।

হারালে যা করতে হবে

নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, পাসপোর্ট হারালে বা নষ্ট হলে অবিলম্বে বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদফতরের ওয়েবসাইট বা অনলাইনে তা রিপোর্ট করতে হবে। পাশাপাশি নিকটস্থ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে হবে।

সংশ্লিষ্ট থানা ৭২ ঘণ্টার মধ্যে জিডির সত্যতা যাচাই করে রিপোর্ট পাঠাবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিপোর্ট পাওয়া না গেলে জিডির কপি সংযুক্ত করে ‘লস্ট সার্কুলার’ জারি করে নতুন পাসপোর্টের আবেদন করতে হবে।

কোনও ভিসা এজেন্সি, ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বেআইনিভাবে পাসপোর্ট আটকে রাখলে এবং তা উদ্ধার করা সম্ভব না হলে আগের পাসপোর্ট বাতিল করে নতুন পাসপোর্ট ইস্যু করা যাবে। হারানো বা চুরি হওয়া পাসপোর্টের তথ্য পাওয়া মাত্র স্পেশাল ব্রাঞ্চের ইমিগ্রেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে (আইএমএস) তা হালনাগাদ করা হবে। প্রয়োজনে ইন্টারপোলকেও অবহিত করা হবে।

বিদেশে হারালে

বিদেশে অবস্থানকালে পাসপোর্ট হারালে সংশ্লিষ্ট দেশের বাংলাদেশ দূতাবাস বা হাইকমিশনকে জানাতে হবে। সংশ্লিষ্ট মিশন লস্ট সার্কুলার জারি করে পুনঃইস্যুর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবে।

পুনঃইস্যু করা নতুন পাসপোর্টের ডাটাপেজে স্পষ্টভাবে ‘প্রিভিয়াস পাসপোর্ট ইজ রিপোর্টেড টু বি লস্ট’ লেখা থাকবে। হারানো বা চুরি হওয়া পাসপোর্ট পুনঃইস্যুর সময় আবেদনকারীর নাম, বাবা-মায়ের নাম বা জন্মতারিখের মতো মৌলিক তথ্য সম্পূর্ণ পরিবর্তন করা যাবে না।

একবার বাতিল করা পাসপোর্ট পরে উদ্ধার হলেও সেটি দিয়ে ভ্রমণ করা যাবে না। সেটি নিষ্ক্রিয় করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা থানায় অবিলম্বে জানাতে হবে।

সচেতন হওয়ার আহ্বান

পাসপোর্ট অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পাসপোর্ট, ভিসা ও ইমিগ্রেশন) এ টি এম আবু আসাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, যেভাবে পাসপোর্ট হারানো, নষ্ট হওয়া বা চুরির বিষয়ে নতুন আবেদন আসছে, তা উদ্বেগজনক। পাসপোর্টধারীদের সচেতন করতে কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, প্রথমবার পাসপোর্ট হারালে কোনও অতিরিক্ত ফি ধার্য করা হয়নি। তবে দ্বিতীয়বার হারালে ১০ হাজার টাকা অতিরিক্ত অর্থ ধার্য করা হয়েছে। এটি শুধু সচেতনতার জন্য।

তিনি আরও বলেন, পাসপোর্টধারীরা সচেতন হয়ে পাসপোর্ট যত্নসহকারে রাখবেন; এটাই তাদের আবেদন।