জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমিতে (নায়েম) ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকার হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ)। শুধু তাই নয়; দৈনিক মজুরিভিত্তিক ১৮ জন কর্মচারীকে বিভিন্ন ধরনের সম্মানী ও মজুরি দেওয়া হলেও তাদের কাউকেই নায়েমের দৈনিক মজুরিভিত্তিতে নিয়োজিত কর্মীদের তালিকায় পাওয়া যায়নি। ফলে এই অর্থ কাদের পরিশোধ করা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
নায়েমের প্রশিক্ষণ, হোস্টেল, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও ইনডাকশন ট্রেনিং কোর্সের ব্যয় নিয়ে নানা অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে ডিআইএ’র তদন্তে। সংস্থাটির প্রশিক্ষণের মডিউলে ব্যাপক সাদৃশ্য, সরকারি ক্রয়ে পিপিআর যথাযথভাবে অনুসরণ না করা, হোস্টেলের আয়-ব্যয়ের হিসাবের অসংগতি এবং ক্যাম্পাসের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়া অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ডিআইএ জানিয়েছে, নায়েমের হোস্টেল ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানেই ৩ কোটি ৫০ লাখ ৬৯ হাজার ১১১ টাকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এর মধ্যে হোস্টেল খাতের ৩ কোটি ২০ লাখ ১৫ হাজার ৩৬১ টাকা রাজস্ব খাতে জমা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। আর বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়া ৩০ লাখ ৫৩ হাজার ৭৫০ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া অন্যান্য খাতে যেসব অনিয়মের কথা বলা হয়েছে, সেগুলোর অনেকগুলোর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট অর্থের পরিমাণ উল্লেখ নেই।
২৬ প্রশিক্ষণের ৭৮টি টপিকে মিল
ডিআইএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নায়েম পরিচালিত ২৬ ধরনের প্রশিক্ষণের মডিউল ও টপিকে ব্যাপক সাদৃশ্য রয়েছে। এতে প্রতিটি প্রশিক্ষণের জন্য আলাদাভাবে মডিউল প্রণয়ন না করায় অর্থ ও সময়ের অপচয় হচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসিইএম (ACEM) কোর্সে টপিক রয়েছে ১০৮টি এবং এসএসসিইএম (SSCEM) কোর্সে ১১৫টি। এর মধ্যে ৭৮টি টপিকে সাদৃশ্য রয়েছে।
এসিইএম কোর্সটি সহযোগী অধ্যাপক পর্যায়ের এবং এসএসসিইএম কোর্সটি অধ্যাপক পর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য। কিন্তু দুটি কোর্সের পাঠ্যসূচি পর্যালোচনা করে বিষয়বস্তু ও মডিউলে উল্লেখযোগ্য সাদৃশ্য ও পুনরাবৃত্তি পেয়েছে ডিআইএ।
প্রতিবেদনে বলা হয়, পদমর্যাদা, দায়িত্ব ও অভিজ্ঞতার স্তর ভিন্ন হওয়া সত্ত্বেও প্রায় একই ধরনের পাঠ্যসূচি অনুসরণ করায় কোর্স দুটির স্বতন্ত্র উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের বিষয়টি যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি।
এসিইএম কোর্সের অনুমোদিত উদ্দেশ্য ছিল সহকারী অধ্যাপক পর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধি। কিন্তু চূড়ান্ত প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত পুস্তিকা (Training Brochure)-এর মডিউল ও সিলেবাসে অনুমোদিত উদ্দেশ্যের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য বিচ্যুতি পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হোস্টেলের অব্যয়িত টাকা জমা হয়নি কোষাগারে
প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, নায়েমের পাঁচটি হোস্টেলে মোট আসন ৫৫২টি। ২০২১-২০২২ অর্থবছর থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত এসব হোস্টেলের বিভিন্ন কোর্স বাবদ ১২ কোটি ১৯ লাখ ৬১ হাজার ১৭ টাকা আয় হয়েছে। এর বিপরীতে ব্যয় দেখানো হয়েছে ৮ কোটি ৯৯ লাখ ৪৫ হাজার ৬৬৫ টাকা। তবে এই ব্যয়ের কোনো স্টক রেজিস্টার বা বিল-ভাউচার দেখাতে পারেনি নায়েম কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া বিভিন্ন ক্রয়ের ক্ষেত্রে ভ্যাট ও ট্যাক্স দেওয়ার প্রমাণও পায়নি ডিআইএ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হোস্টেলের প্রকৃত আয় পুরোপুরি প্রদর্শিত হয়নি এবং ব্যয়ও স্বচ্ছতার সঙ্গে করা হয়নি। হোস্টেল থেকে আয় হওয়া অর্থের মধ্যে অব্যয়িত ৩ কোটি ২০ লাখ ১৫ হাজার ৩৬১ টাকা রাজস্ব খাতে জমা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে আয় হওয়া ৩০ লাখ টাকা জমা হয়নি সরকারি কোষাগারে
ডিআইএ জানিয়েছে, নায়েমের জমিতে থাকা ক্যাফেটেরিয়া-১, লন্ড্রি, সেলুন ও মনোহারী দোকান থেকে পাওয়া অর্থ নায়েম কর্মচারী বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেডের নিজস্ব তহবিলে নেওয়া হয়েছে।
বিগত পাঁচ বছরে ক্যাফেটেরিয়া-১ থেকে ২১ লাখ ৫০ হাজার টাকা, লন্ড্রি থেকে ৪ লাখ ২০ হাজার, সেলুন থেকে থেকে ২ লাখ ৭৩ হাজার ৭৫০, মনোহারী দোকান থেকে ২ লাখ ১০ হাজার টাকা ভাড়া বাবদ আদায় করা হয়েছে। বাণিজ্যিক স্থাপনা থেকে আয় করা সমুদয় অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
সরকারি বেতন নেওয়া কর্মচারী ক্যাফেটেরিয়ার দায়িত্বে
নায়েমের রাজস্ব খাত থেকে বেতন-ভাতা দেওয়া হয় এমন একজন কর্মচারী নায়েমের প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমে নিয়োজিত না থেকে ক্যাফেটেরিয়া-১-এর দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন বলেও ডিআইএর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পিপিআর না মেনে ক্রয়, পণ্য গ্রহণেও অনিয়ম
ডিআইএ জানিয়েছে, রাজস্ব খাতের সরকারি বরাদ্দ ব্যয়ের ক্ষেত্রে পিপিআর যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারকে পণ্য সংগ্রহ ও পূর্ত দুই ধরনের কাজই দেওয়া হয়েছে। পণ্য সংগ্রহের জন্য গ্রহণকারী কমিটি থাকলেও বাস্তবে শুধু স্টোরকিপারের মাধ্যমে পণ্য গ্রহণ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে পণ্য গ্রহণের সময় গ্রহণকারী কমিটির মাধ্যমে স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী পণ্যের মান যাচাই, হিসাবসংক্রান্ত তথ্য সঠিকভাবে সংরক্ষণ এবং একই প্রকৃতির কাজের সঙ্গে ভিন্ন প্রকৃতির আইটেম যুক্ত করে ক্রয় না করার সুপারিশ করা হয়েছে।
এক দিনে ১২টি গাড়ি, ভাড়া দেখানো ৯৬ হাজার টাকা
জাতীয়করণকৃত কলেজ শিক্ষকদের ৪৫ দিনের বেসিক ট্রেনিং কোর্স হিসেবে এসইডিপির অর্থায়নে ইপিএসটি স্কিমের আওতায় ইনডাকশন ট্রেনিং পরিচালিত হয়। নিরীক্ষাকাল পর্যন্ত মোট ৪০টি কোর্স সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে পঞ্চম ইনডাকশন ট্রেইনিং কোর্স পর্যালোচনা করে দেখা যায়, দৈনিক মজুরিভিত্তিক ১৮ জন কর্মচারীকে বিভিন্ন ধরনের সম্মানী ও মজুরি দেওয়া হলেও তাদের কাউকেই নায়েমের দৈনিক মজুরিভিত্তিতে নিয়োজিত কর্মীদের তালিকায় পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া অফিস এটাচমেন্টে ৪০ জন এবং কোর্স পরিচালকদের ৩ জনের জন্য একদিনে ১২টি গাড়ি ভাড়া করা হয়। অফিস এটাচমেন্টের জন্য বরাদ্দ করা পুরো ৯৬ হাজার টাকা গাড়িভাড়া খাতে দেখানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, পঞ্চম এসিএসডি কোর্সে অফিস এটাচমেন্টের প্রতিটি গাড়ির ভাড়া ছিল ৪ হাজার টাকা। অথচ পঞ্চম Induction Course-এ প্রতিটি গাড়ির ভাড়া দেখানো হয়েছে ৮ হাজার টাকা। এটিকে অস্বাভাবিক বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিরীক্ষায় অস্বাভাবিক সংখ্যক যানবাহন ও সহায়ক জনবল ব্যবহার, প্রয়োজনীয় চাহিদাপত্র ও গ্রহণপত্রের ঘাটতি, পুনরাবৃত্ত সামগ্রী ক্রয় এবং যানবাহন ও জ্বালানি খাতে একই ধরনের ব্যয়-প্রবণতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
স্টক টেকিং নেই, পড়ে আছে অকেজো মালামাল
পরিদর্শনের সময় প্রশাসনিক ভবনের বেজমেন্ট ও স্টোর রুমের সামনের করিডোরে নিলামযোগ্য চেয়ার, এসি, ফটোকপি মেশিন, ডেক্সটপ কম্পিউটার, প্রিন্টার ও ফ্রিজ স্তুপাকারে পড়ে থাকতে দেখা যায়।
এ ছাড়া ১০ আসনবিশিষ্ট মাইক্রোবাস (ঢাকা-মেট্রো-চ-৫১-৯৬৭৩) দীর্ঘদিন ধরে অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অকেজো থাকা মালামাল নিলামের ব্যবস্থা এবং নিয়মিত স্টক টেকিং চালুর সুপারিশ করা হয়েছে।