Image description

নাগরিকদের মধ্যে তথ্য জানার আগ্রহ বাড়লেও ‘প্রতিশোধের ভয়’ বাধা হিসেবে কাজ করে বলে একটি জরিপে উঠে এসেছে। এতে বলা হয়, স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থার ঘাটতি ও তথ্য দিতে প্রাতিষ্ঠানিক অনীহাও নাগরিকের তথ্য পাওয়ার পথে বাধা হয়ে আছে।

আন্তর্জাতিক তথ্য জানার অধিকার দিবস উপলক্ষে মঙ্গলবার রাজধানীর দ্য ডেইলি স্টার সেন্টারে আয়োজিত ‘তথ্য অধিকার সম্মেলনে’ জরিপের ফলাফলটি উপস্থাপন করেন প্রধান গবেষক অনন্য রায়হান।

গবেষকদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে নাগরিকের তথ্য পাওয়ার অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে কি না, তার চেয়ে আবেদনটি আইন অনুযায়ী হয়েছে কি না, কারিগরি বিষয় বা জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন রয়েছে কি না—এসবকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

জরিপে ৩ হাজার ২০০ নাগরিক, ১০০ জন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, ২০ জন আপিল কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধি, ১৫টি ফোকাস গ্রুপ আলোচনা ও ৮টি কি-ইনফরম্যান্ট সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। পাশাপাশি তথ্য কমিশনের ১০০টি শুনানি ও রায় বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

জরিপ অনুযায়ী, ২০১৯ সালে নাগরিকদের তথ্যের চাহিদা ছিল ৬৮ দশমিক ২ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা বেড়ে ৭৫ দশমিক ৪ শতাংশ হয়েছে।

কর্মসংস্থান, উন্নয়ন প্রকল্প, সামাজিক সেবা, শিক্ষা, সরকারি উদ্যোগ, কৃষি ও সরকারি বরাদ্দ বিষয়ে তথ্যের চাহিদা বেশি। তবে তথ্যের প্রয়োজন থাকলেও আইনটির ব্যবহার সীমিত। ৬২ শতাংশ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তারা কোনো তথ্যের আবেদন পাননি।

অনন্য রায়হান বলেন, ‘তথ্যের চাহিদা অনেক বেশি, কিন্তু এর ব্যবহার খুবই সীমিত। আইন সম্পর্কে জানা আর আইনটি ব্যবহার করতে জানা এক বিষয় নয়। এ দুটির মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে।’

জরিপ অনুযায়ী তথ্য চাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিশোধের ভয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেশি। অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকেরাও তাদেরকে তথ্য চাইতে নিরুৎসাহিত করেন।

রায়হান বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, প্রতিশোধের ভয়ে অনেকে তথ্য চান না। এ ক্ষেত্রে অভিভাবকদের ভূমিকা রয়েছে।’

নারীদের ক্ষেত্রেও বাধার মাত্রা বেশি। জরিপে ৬৭ শতাংশ নারী মনে করেন, তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে তাদের প্রতিবন্ধকতা পুরুষদের তুলনায় বেশি। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অনেককেই তথ্য পেতে মধ্যস্থতাকারীর সহায়তা নিতে হয়।

রিসার্চ ইনিশিয়েটিভস বাংলাদেশের (রিইব) উপপরিচালক রুহী নাজ বলেন, ‘তথ্য অধিকার শুধু সেবা পাওয়ার বিষয় নয়। তথ্য অধিকার ব্যবহার করতে গিয়ে একজন নাগরিক সরকারি দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করেন। এতে নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি সম্পর্ক তৈরি হয়, যা গুরুত্বপূর্ণ।’

সিভিক এনগেজমেন্ট ফান্ডের ডিরেক্টর আদি ওয়াকার বলেন, ‘আমরা শুধু তথ্য পাওয়ার অধিকারের কথা বলছি না, আমরা জানার অধিকার বা জ্ঞান অর্জনের অধিকারের কথা বলছি। তথ্য সহজলভ্য হলেও মানুষ যদি তা খুঁজে বের করা, বোঝা ও ব্যবহার করা না জানে, তাহলে সেই তথ্যের মূল্য কমে যায়।’

আলোচনায় তথ্য কমিশনের স্থবিরতার বিষয়টিও উঠে আসে।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, ‘প্রধান তথ্য কমিশনার ও তথ্য কমিশনারের পদ খালি। যোগ্য প্রার্থীদের তালিকা সার্চ কমিটির কাছে পাঠানো হলেও নিয়োগের বিষয়ে এখনো কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। বিষয়টি দ্রুত সম্পন্ন করা জরুরি।’

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘তথ্য কমিশন দীর্ঘদিন না থাকা উদ্বেগজনক। কমিশন গঠনের বিষয়ে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ঘোষণা আসবে বলে আশা করছি। নতুন কমিশনকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে।’

আলোচনায় বলা হয়, তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রেও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে। জরিপ অনুযায়ী তথ্য অধিকার আইন সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা রয়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৫ শতাংশ কর্মকর্তার। অর্ধেকেরও কম কর্মকর্তা প্রশিক্ষণ পেয়েছেন।

তথ্য কমিশনে করা আবেদনের ৬০ শতাংশের ক্ষেত্রে ৩০ দিনের মধ্যে গ্রহণ বা তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া শেষ হয়নি। তবে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রায় দেওয়া হয়েছে। ইতিবাচক রায় পাওয়ার পরও ২৩ শতাংশ ক্ষেত্রে তা বাস্তবায়িত হয়নি। প্রায় ৩৯ শতাংশ ক্ষেত্রে দ্বিতীয়বার তথ্য কমিশনে আবেদন বা অভিযোগ করা হয়েছে।

তথ্য কমিশনে যাওয়া আপিলের ৮৬ শতাংশ ক্ষেত্রে আপিল কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা বা মনোযোগের ঘাটতিকে কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, এসব বিষয় আপিল কর্তৃপক্ষের পর্যায়েই নিষ্পত্তির সুযোগ ছিল।

জরিপের সুপারিশে বাজেট, সরকারি সেবা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও জনসেবার তথ্য স্বপ্রণোদিতভাবে প্রকাশ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। তথ্য চাইতে গিয়ে নাগরিক যাতে প্রতিশোধ বা হয়রানির শিকার না হন, সে জন্য সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং হুইসেলব্লোয়ার সুরক্ষার সঙ্গে তথ্য অধিকার আইন যুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি আবেদন ও আপিল প্রক্রিয়া সহজ করা এবং তথ্য কমিশনের রায় বাস্তবায়নের ব্যবস্থা জোরদারের কথা বলা হয়েছে।

এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর পরিচালক কে এম মামুন উজ্জামান বলেন, এক সময় তথ্যের সংকট থাকলেও এখন তথ্যের আধিক্যের পাশাপাশি ভুল তথ্য ও অপতথ্য নতুন সমস্যা তৈরি করেছে। যাচাই করা তথ্য নাগরিকদের কাছে পৌঁছানো জরুরি।