Image description

বহুল আলোচিত জুলাই জাতীয় সনদের ৮৪ দফা সংস্কারের বড় অংশ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য তৈরি হলেও এর বাস্তবায়ন নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন আইনি ও রাজনৈতিক জটিলতা। বিশেষ করে গণভোটে জনগণের অনুমোদন পাওয়া সাংবিধানিক সংস্কারগুলো কোন প্রক্রিয়ায় বাস্তবায়িত হবে—সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে, নাকি বিদ্যমান সংসদীয় কাঠামোর মধ্য দিয়ে—এ প্রশ্নে সরকার ও বিরোধী পক্ষের অবস্থান এখনো পরস্পরবিরোধী।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোটে জুলাই জাতীয় সনদের সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাবের পক্ষে ৬৮ দশমিক ৫৯ শতাংশ বৈধ ভোট পড়ে। গণভোটে অনুমোদিত সংস্কারের মধ্যে ছিল নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিত করা, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ প্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকার সুরক্ষার সম্প্রসারণসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব। তবে গণভোটের পর এসব সংস্কার বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়েই মূল বিরোধ তৈরি হয়েছে।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও শাসনব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। প্রথম পর্যায়ে সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন, জনপ্রশাসন ও পুলিশ সংস্কার নিয়ে ছয়টি কমিশন গঠন করা হয়। পরে গণমাধ্যম, স্বাস্থ্য, নারী, শ্রম ও স্থানীয় সরকার খাতেও আরও পাঁচটি কমিশন গঠন করা হয়। প্রথম পর্যায়ের ছয় কমিশনের সুপারিশ থেকে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনার জন্য ১৬৬টি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব নির্ধারণ করা হয়। প্রায় নয় মাসের রাজনৈতিক সংলাপ ও দর-কষাকষির পর ৮৪ দফার জুলাই জাতীয় সনদ চূড়ান্ত হয় এবং ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণে এটি স্বাক্ষরিত হয়।

চূড়ান্ত সনদের ৮৪ দফার মধ্যে ৪৭টি নয়, পরবর্তী সরকারি ও গবেষণাভিত্তিক নথিতে ৪৮টি প্রস্তাবকে সাংবিধানিক সংস্কারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাকি প্রস্তাবগুলো আইন, বিধি, অধ্যাদেশ বা নির্বাহী ব্যবস্থার মাধ্যমে বাস্তবায়নের কথা ছিল। গণভোটে মূলত সাংবিধানিক সংস্কারসংক্রান্ত প্রস্তাবগুলোর ওপর জনগণের অনুমোদন নেওয়া হয়। ফলে গণভোটের ফলকে ৮৪ দফার প্রতিটি বিষয়ের সরাসরি অনুমোদন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

দ্বৈত শপথেই প্রথম বাধা ও সংকট

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের একই সঙ্গে সংসদ সদস্য এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের কাঠামো রাখা হয়েছিল। সেই অনুযায়ী জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির সংসদ সদস্যরা দ্বিতীয় শপথ নিলেও বিএনপির সংসদ সদস্যরা তা গ্রহণ করেননি। বিএনপির যুক্তি ছিল, বিদ্যমান সংবিধানে এ ধরনের সংস্কার পরিষদের সাংবিধানিক ভিত্তি নেই এবং নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের ওপর এভাবে অতিরিক্ত শপথ আরোপের আইনি বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ। ফলে প্রস্তাবিত সংবিধান সংস্কার পরিষদ কার্যকরভাবে গঠিত হয়নি।

এই অবস্থায় জুলাই সনদের সাংবিধানিক সংস্কার বাস্তবায়নে সংসদীয় পথ বেছে নেয় সরকার। জুলাইয়ে জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠনের প্রস্তাব পাস হয়। বিরোধী দলের সদস্যরা কমিটিতে না গিয়ে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন। তাদের বক্তব্য, গণভোটে জনগণ যে প্রক্রিয়াকে অনুমোদন দিয়েছে, বিশেষ সংসদীয় কমিটি তা প্রতিস্থাপন করতে পারে না।

ডিসেম্বরের মধ্যে খসড়া, লক্ষ্য ১৮তম সংশোধনী

বর্তমানে ১২ সদস্যের বিশেষ সংসদীয় কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। বিরোধী দলের সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করে কমিটিকে ১৭ সদস্যে রূপ দেওয়ার সুযোগও রাখা হয়েছে। সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় বৈঠকে জুলাই সনদে স্বাক্ষরকারী ২৬টি রাজনৈতিক দলকে আলোচনায় আমন্ত্রণ জানানো হয়। এর মধ্যে ১৫টি দল সরাসরি বৈঠকে অংশ নেয় এবং একটি দল লিখিত প্রস্তাব দেয়। বৈঠকে ২০২৬ সালের মধ্যেই সংবিধান সংশোধনের খসড়া প্রস্তুতের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।

কমিটির চেয়ারম্যান সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, জুলাই জাতীয় সনদ যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেভাবেই তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হবে। এ জন্য রাজনৈতিক দল, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, সাবেক বিচারপতি, আইনজীবী, শিক্ষক, সাংবাদিক, জুলাইয়ের আন্দোলনকারী, শহীদ পরিবারের সদস্যসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নেওয়া হবে। ডিসেম্বরের মধ্যে আলোচনা শেষ করে সংসদে প্রতিবেদন দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে কমিটির।

তবে সরকারের এই উদ্যোগের সঙ্গে একমত নয় বর্তমান সংসদের প্রধান বিরোধীদল জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। ২০ সেপ্টেম্বর জোটটি বিশেষ সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ প্রত্যাখ্যান করে জানায়, গণভোটে অনুমোদিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে হবে। জোটের ভাষ্য, সাধারণ সংসদীয় সংশোধন প্রক্রিয়া দিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদের জায়গা পূরণ করা যাবে না।

নোট অব ডিসেন্টও বড় বাধা

জুলাই সনদের আরেকটি বড় জটিলতা তৈরি হয়েছে বিভিন্ন দলের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ নিয়ে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় অধিকাংশ বিষয়ে বিস্তৃত ঐকমত্য তৈরি হলেও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দলগুলো ভিন্নমত জানিয়েছিল। ফলে স্বাক্ষরিত সনদের কোনো কোনো প্রস্তাব কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে এখনো রাজনৈতিক ব্যাখ্যার পার্থক্য রয়েছে।

দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের উচ্চকক্ষে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা, নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো, তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের পদ্ধতি এবং আন্তর্জাতিক চুক্তির ক্ষেত্রে সংসদের অনুমোদন—এসব বিষয় নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থানে পার্থক্য রয়েছে। ফলে গণভোটের ফলাফল বাস্তবায়নের পরবর্তী ধাপটি কেবল আইনি নয়, রাজনৈতিক সমঝোতারও বিষয় হয়ে উঠেছে।

অনিশ্চিত ১১ সংস্কার কমিশনের সুপারিশের ভবিষ্যৎ

জুলাই সনদের সীমাবদ্ধতা নিয়ে আরেকটি প্রশ্ন উঠেছে দ্বিতীয় পর্যায়ের পাঁচ সংস্কার কমিশনের সুপারিশ নিয়ে। স্বাস্থ্য, গণমাধ্যম, নারী, শ্রম ও স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের অধিকাংশ সুপারিশ জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মূল আলোচনায় স্থান পায়নি। ফলে এসব খাতের কাঠামোগত সংস্কারের বিষয়ে জুলাই সনদের বাইরে পৃথক উদ্যোগ প্রয়োজন হচ্ছে।

এ কারণেই জুলাই সনদকে ঘিরে এখন দুটি পৃথক প্রশ্ন সামনে এসেছে। প্রথমত, গণভোটে অনুমোদিত সাংবিধানিক সংস্কার কীভাবে বাস্তবায়িত হবে। দ্বিতীয়ত, ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় না আসা স্বাস্থ্য, শ্রম, গণমাধ্যম, নারী ও স্থানীয় সরকার সংস্কারের সুপারিশগুলোর কী হবে।

বিএনপি বলছে সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই সংস্কার

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, জুলাই সনদের লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ। তবে সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামো ও সংসদীয় প্রক্রিয়াই অনুসরণ করতে হবে। বিশেষ কমিটির মাধ্যমে রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন অংশীজনের মতামত নিয়ে একটি সমন্বিত প্রস্তাব তৈরির উদ্যোগ সেই অবস্থানেরই প্রতিফলন।

অন্যদিকে জামায়াত ও তাদের মিত্রদের বক্তব্য, জনগণের গণভোটের রায়কে পাশ কাটিয়ে সাধারণ সংসদীয় প্রক্রিয়ায় সংস্কার করা হলে তা জুলাই সনদের মূল উদ্দেশ্যকে খর্ব করবে। ২০ সেপ্টেম্বর জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের নেতৃত্বে ১১ দলীয় জোট বিশেষ সংসদীয় কমিটির উদ্যোগ প্রত্যাখ্যান করে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি জানায়।

সামনে রাজনৈতিক সমঝোতার পরীক্ষা

ফলে জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন এখন কেবল সংস্কারের প্রশ্ন নয়; এটি হয়ে উঠেছে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামো পরিবর্তনের পদ্ধতি নিয়ে একটি বড় রাজনৈতিক বিতর্ক। একদিকে গণভোটে পাওয়া জনগণের সরাসরি ম্যান্ডেট, অন্যদিকে বিদ্যমান সংবিধানের কাঠামোর মধ্যে থেকে সংশোধন আনার যুক্তি—এই দুই অবস্থানের মধ্যেই বর্তমান অচলাবস্থা।

বিশেষ সংসদীয় কমিটি ডিসেম্বরের মধ্যে তাদের কাজ শেষ করে সংসদে প্রতিবেদন দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সংবিধানের ১৮তম সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। সেপ্টেম্বরে কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকের পর সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত খসড়া তৈরির কথা জানানো হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই সনদের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এখন বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া। কারণ গণভোটের মাধ্যমে জনগণের মতামত প্রকাশের পরও যদি সেই ম্যান্ডেটের সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়ে রাজনৈতিক সমঝোতা তৈরি না হয়, তাহলে সংস্কারের মূল উদ্দেশ্যই প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। একই সঙ্গে দলীয় স্বার্থের বাইরে গিয়ে কোন কোন বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য ধরে রাখা যায়, সেটিও হবে পরবর্তী রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

অতএব, জুলাই সনদের সামনে এখন মূল প্রশ্ন—সংস্কারের পক্ষে জনম্যান্ডেট কি শেষ পর্যন্ত একটি কার্যকর সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় রূপ নেবে, নাকি বাস্তবায়ন-পদ্ধতি নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধেই এর বড় অংশ আটকে থাকবে? ডিসেম্বরের মধ্যে বিশেষ সংসদীয় কমিটির সুপারিশ এবং পরবর্তী সংসদীয় প্রক্রিয়াই এ প্রশ্নের উত্তর নির্ধারণ করবে।