বিরোধী দল আলোচনায় এলে জুলাই সনদের কোনো কোনো বিষয়ে পরিবর্তনের প্রস্তাব দিলে তা আলোচনার মাধ্যমে বিবেচনা করা যেতে পারে বলে জানিয়েছেন সংসদের সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদ যেভাবে প্রণীত ও স্বাক্ষরিত হয়েছে, নোট অব ডিসেন্টসহ সেটি বাস্তবায়ন করতে চায় সরকার।’ মঙ্গলবার সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘বিরোধী দল যদি আলোচনায় আসে, আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে যদি জুলাই জাতীয় সনদের কিছু কিছু অংশে তারা ব্যত্যয় ঘটাতে চান, সেটাও আলোচনা হতে পারে। কিন্তু আমরা জুলাই জাতীয় সনদ যেভাবে প্রণীত হয়েছে, স্বাক্ষরিত হয়েছে, নোট অব ডিসেন্টসহ, সেটা বাস্তবায়ন করতে চাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘যদি বিরোধী দলের কোথাও কোনো বক্তব্য থাকে, সমঝোতার ভিত্তিতে সেটা করা যায়। কিন্তু তাতে তো আলোচনায় আসতে হবে।’
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির ৪র্থ বৈঠক কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে বিভিন্ন ইলেকট্রনিক, টিভি ও অনলাইন মিডিয়ার প্রতিনিধি এবং টকশো অংশগ্রহণকারীরা সংবিধান সংশোধন বিষয়ে প্রস্তাব দেন। কমিটি বৈঠকের বাইরে কারও লিখিত প্রস্তাব থাকলে তা পাঠানোর অনুরোধ জানায় এবং পাওয়া প্রস্তাবগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার কথা জানায়।
সংবিধান সংশোধন নিয়ে পরবর্তী বৈঠকগুলোতে সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, নারী নেতৃত্ব, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তি ও সংগঠন, জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নে যুক্ত ব্যক্তি, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক ও আইনজীবী, শিক্ষক, শ্রমজীবীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানাবে কমিটি।
বৈঠকে বিভিন্ন প্রস্তাব ও মতামত পাওয়ার কথা জানিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আজকের আমাদের বৈঠকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে এবং আমরা অনেক মূল্যবান মতামত পেয়েছি। তার মধ্যে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য মতামত আছে, যেগুলো আমরা বিবেচনা করতে পারি। সেটা কমিটির বৈঠকে আমরা আলোচনা করব।’
সব পক্ষের মতামত নেওয়ার পর সংবিধান বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে প্রতিবেদন প্রণয়ন করা হবে বলে জানান তিনি। পরে সেই প্রতিবেদন সংসদে উপস্থাপন করে তার ভিত্তিতে বিল আনা হবে। তখনো সংসদের ভেতরে ও বাইরে আলোচনা হবে বলে জানান তিনি।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ও জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নে যারা অবদান রেখেছেন, তাদের সঙ্গেও আলোচনা করা হবে বলে জানান সালাহউদ্দিন। তিনি বলেন, ‘যারা জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নের সঙ্গে এবং ঐকমত্য কমিশনে অবদান রেখেছেন, তাদের সঙ্গেও আমরা আলাপ-আলোচনা করব, বৈঠকে বসব। তবে শেষের দিকে।’
বৈঠকে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে বলে জানান তিনি। বাংলাদেশ একক রাষ্ট্র হওয়ায় দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ প্রয়োজন কি না, তা পুনর্বিবেচনার প্রস্তাব এসেছে। তবে জুলাই জাতীয় সনদে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠনে ঐকমত্য হওয়ায় কমিটি সেই অনুযায়ী এগোতে চায় বলে জানান তিনি।
এ ছাড়া বিচার বিভাগের বিকেন্দ্রীকরণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা এখনো পর্যন্ত এমন কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি যে কী প্রক্রিয়ায় এবং কাদের নিয়ে, কোন প্রসেস অবলম্বন করে এই তত্ত্বাবধায়ক সরকারটা গঠন হবে।’
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কোনো ব্যক্তি ১০ বছরের বেশি দায়িত্বে না থাকার প্রস্তাব নিয়েও মতামত এসেছে বলে জানান তিনি। কেউ কেউ এটিকে গণতান্ত্রিক অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মত দিয়েছেন। তবে এ প্রস্তাব থেকে তার দল সরে আসেনি বলে জানান সালাহউদ্দিন।
তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের দলের পক্ষ থেকে, এই জুলাই জাতীয় সনদ প্রণীত হওয়ার সময়, এই প্রস্তাব আমরা দিয়েছি। আমাদের প্রধানমন্ত্রী, তিনি তখন চেয়ারম্যান দলের, তার প্রস্তাবের ভিত্তিতে দিয়েছি এবং স্ট্যান্ডিং কমিটির সিদ্ধান্ত মোতাবেক দিয়েছি। তারপরে ইশতেহারেও আমরা সেটা আবার উল্লেখ করেছি।’
সংবিধানের প্রস্তাবনা ও রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতেও পরিবর্তনের প্রস্তাব এসেছে বলে জানান তিনি। এসব প্রস্তাব সংকলন করে পরে প্রকাশ করা হবে।
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের ভিত্তি ছিল ছয়টি সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন বলেন, সরকার চাইলে ভবিষ্যতে জনদাবির ভিত্তিতে অন্য খাতেও সংস্কার কমিশন করতে পারে। তবে সেগুলো জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক নয়।