আন্তর্জাতিক বাজারে পাম ও সয়াবিন তেলের দাম কমলেও চট্টগ্রামের পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র। গত দেড় মাসে পাম ও সয়াবিন তেলের দাম মণপ্রতি বেড়েছে প্রায় ৩০০ টাকা। শুধু তেল নয়, পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে অন্যান্য নিত্যপণ্যের বাজারেও। এরসঙ্গে বৃষ্টি ও সরবরাহ কমে যাওয়ায় সবজি, মাছ, ডিম ও মাংসের দামও বেড়েছে।
বিশ্বব্যাংকের কমোডিটি প্রাইস ডেটা বা ‘পিংক শিট’-এর আগস্টের তথ্য অনুযায়ী, জুন-আগস্ট তিনমাসে আন্তর্জাতিক বাজারে পাম তেলের গড় দাম এপ্রিল-জুনের তুলনায় ১ দশমিক ৯ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে সয়াবিন তেলের গড় দাম কমেছে ২ দশমিক ৫ শতাংশ।
বিশ্বব্যাংকের ২রা সেপ্টেম্বর প্রকাশিত তথ্য বলছে, এপ্রিল-জুন সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পাম তেলের গড় দাম ছিল টনপ্রতি ১ হাজার ১২৮ দশমিক ৬৭ ডলার। জুন-আগস্টে তা কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ১০৭ দশমিক ৩৩ ডলারে। অর্থাৎ তিন মাসের ব্যবধানে গড় দাম কমেছে ২১ দশমিক ৩৪ ডলার। সয়াবিন তেলের ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক বাজারে একই প্রবণতা দেখা গেছে। এপ্রিল-জুনে টনপ্রতি গড় দাম ছিল ১ হাজার ৭২১ দশমিক ৩৩ ডলার। জুন-আগস্টে তা নেমে আসে ১ হাজার ৬৭৮ দশমিক ৬৭ ডলারে। অর্থাৎ গড় দাম কমেছে ৪২ দশমিক ৬৭ ডলার।
তথ্য অনুযায়ী, দেড় মাস আগে সয়াবিন তেল প্রতি মণ বিক্রি হয়েছে প্রায় ৭ হাজার ২০০ টাকায়। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৫০০ টাকায়। পাম তেলের দামও মণপ্রতি প্রায় ৩০০ টাকা বেড়ে হয়েছে ৬ হাজার ৬০০ টাকা। আর সুপার পাম তেল বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৬ হাজার ৮০০ টাকা মণ।
খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ী শাহজালাল বলেন, বাজারে তেলের সরবরাহ তুলনামূলক কম। চাহিদার তুলনায় কম থাকায় দাম বেড়েছে। খুচরা বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। বর্তমানে খোলা সয়াবিন তেল প্রতি কেজি ২০৮ থেকে ২১০ টাকা, পাম তেল ১৭৫ থেকে ১৮০ টাকা এবং সুপার পাম তেল ১৯০ থেকে ১৯৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেই দেশের বাজারে তাৎক্ষণিকভাবে দাম কমে না। আমদানির সময়কার মূল্য, ডলারের বিনিময় হার, জাহাজভাড়া, বন্দর ও পরিবহন ব্যয়, শুল্ক-কর, ব্যাংকিং খরচ, পরিশোধন ও প্যাকেজিং ব্যয়সহ বিভিন্ন উপাদান স্থানীয় বাজারের দামে প্রভাব ফেলে।
চলতি বছর সরকার দুই দফায় সয়াবিন তেলের দাম সমন্বয় করেছে। ২৯শে এপ্রিল এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ১৯৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৯৯ টাকা করা হয়। পাঁচ লিটারের বোতলের দাম ৯৫৫ থেকে বাড়িয়ে ৯৭৫ টাকা এবং খোলা সয়াবিন তেল ১৭৬ থেকে বাড়িয়ে ১৮০ টাকা করা হয়। এরপর ২রা সেপ্টেম্বর এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য আরও ৫ টাকা বাড়িয়ে ২০৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়। পাঁচ লিটারের বোতলের দাম করা হয় ১ হাজার টাকা। চট্টগ্রাম কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই থেকে ২৩শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট এইচএস কোডে মোট ৬৫ হাজার ৯৫৬ টন ভোজ্যতেল আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে পাম তেল ৫০ হাজার ৮৯৬ টন এবং সয়াবিন তেল ১৫ হাজার ৬১ টন।
মোট আমদানির মধ্যে পাম তেলের অংশ প্রায় ৭৭ দশমিক ১ শতাংশ এবং সয়াবিন তেলের অংশ ২২ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ ওই সময়ে সয়াবিন তেলের তুলনায় পাম তেল আমদানি হয়েছে প্রায় ৩ দশমিক ৪ গুণ বেশি। খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে বর্তমানে প্রতি কেজি চিনি ১০২ টাকা, পিয়াজ ৪০ টাকা, আদা ৯৫ টাকা, রসুন ১২২ টাকা এবং ভারতীয় লাল মরিচ ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ভারতীয় মিষ্টি মরিচের দাম ৪৪০ টাকা। দেশি মরিচ মানভেদে ২৮০ থেকে ৩১০ টাকা এবং হাটহাজারীর মিষ্টি মরিচ ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া মোটা মসুর ডাল ৮০ টাকা, মুগ ডাল ১৫০ টাকা, মটর ডাল ৫৪ টাকা এবং সাদা মটর ৫৪ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ান ছোলা ৯৫ টাকা এবং ভারতীয় ছোলা ৯৮ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। খাতুনগঞ্জের আমদানিকারক আলাউদ্দীন বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দেশের পাইকারি দামের তুলনা করতে শুধু টনপ্রতি মূল্য দেখলে হবে না। আমদানি থেকে খাতুনগঞ্জ পর্যন্ত পুরো ব্যয় কাঠামো বিবেচনায় নিতে হবে। সরবরাহ পরিস্থিতি ও আমদানি ব্যয়ের পরিবর্তনও বাজারদরে প্রভাব ফেলে।
চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের সহকারী কমিশনার শরীফ মোহাম্মদ আল আমিন বলেন, কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী জুলাই থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৬৫ হাজার ৯৫৬ টন ভোজ্য তেল আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে পাম তেল প্রায় ৭৭ শতাংশ এবং সয়াবিন তেল প্রায় ২৩ শতাংশ। তবে বাজারদর সরবরাহ ও বাণিজ্যিক বিভিন্ন উপাদানের ওপর নির্ভর করে। বাংলাদেশে ভোজ্য তেলের মোট চাহিদার প্রায় ৯০ শতাংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের পাশাপাশি আমদানি, পরিবহন ও সরবরাহ পরিস্থিতির পরিবর্তনও দেশের বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলে।
খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ এসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আবু বক্কর বলেন, ডিজেলের দাম বাড়ায় নিত্যপণ্যের বাজারে প্রভাব পড়বে। খাতুনগঞ্জ থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সড়ক ও নৌপথে পণ্য পরিবহন করা হয়। জ্বালানির দাম বাড়ায় সড়ক পরিবহনের পাশাপাশি লাইটার জাহাজের ভাড়াও বাড়তে পারে, যা শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত হবে।
কনজ্যুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলেন, সামনে রমজান। এখন থেকেই দাম বৃদ্ধির কোনো অজুহাত তৈরি হচ্ছে কি না, সেটি নজরদারিতে রাখা দরকার। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমার সুফল ভোক্তারা কতটা পাচ্ছেন, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। একই সঙ্গে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে মূল্য বৃদ্ধির কারণও নজরদারির আওতায় আনা উচিত।