Image description

মাত্র চার মাসের ব্যবধানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে ২৫টি বোয়িং উড়োজাহাজ যুক্ত করার চুক্তি করেছে সরকার। বর্তমানে বিমানের বহরে রয়েছে ১১টি বোয়িংসহ ১৯টি উড়োজাহাজ। এর মধ্যে ১৪টি বোয়িং কেনার চুক্তি হয়েছে গত ৩০ এপ্রিল। সর্বশেষ নিউ ইয়র্কে আরও ১১টি বোয়িং কেনার চুক্তি সই হয়েছে। সবগুলো যুক্ত হলে বিমানের বহরে বোয়িংয়ের সংখ্যাই দাঁড়াবে ৩৬-এ। আর সব মিলিয়ে এয়ারক্রাফটের সংখ্যা হবে ৪৪।

এর পাশাপাশি ১০টি এয়ারবাস কেনার প্রস্তাবও যাচাই করছে বিমান। এয়ারবাস কেনা নিয়ে এখনও আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের কথা জানায়নি সরকার। তবে নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী এয়ারবাস কেনার কথাও একাধিকবার বলা হয়েছে। সব মিলিয়ে নতুন ৩৫টি উড়োজাহাজ সংগ্রহের পরিকল্পনা এগোচ্ছে।

নতুন উড়োজাহাজগুলো বহরে যুক্ত হতে ১০ থেকে ১৫ বছর সময় লাগবে। এর মধ্যে জনবল, অবকাঠামো, প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালন সক্ষমতা কতটা তৈরি করা যাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে এত বড় বহর নিয়ে কোন রুটে কীভাবে উড়োজাহাজ পরিচালনা করা হবে, আয়-ব্যয়ের হিসাব কী হবে, সেই কৌশলও স্পষ্ট করার দাবি রয়েছে।

অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহেদুল আলম বলেন, সরকার যেসব উড়োজাহাজের ক্রয়াদেশ দেবে বা দিচ্ছে, সেগুলো ধাপে ধাপে আগামী ১৫ বছরে বাংলাদেশের বিমানের বহরে যুক্ত হতে পারে। আগে অর্ডার দিলে দাম কম হয়। আগামী ১০ বছরে যাত্রী এখনকার চেয়ে দুই থেকে আড়াই গুণ বেশি হতে পারে। ফলে বিমানের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

তিনি বলেন, ‘বর্তমানে দেশের অ্যাভিয়েশন খাত বিদেশি এয়ারলাইন্সের হাতে জিম্মি। তারাই বাজারের ৭০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। তবে বড় বিমান বহর পরিচালনার সক্ষমতা বিমানের আছে কিনা, সেটিই বড় প্রশ্ন।’

তবে কাজী ওয়াহেদুল আলম সতর্ক করে বলেন, ‘বিমান গত ৫৪ বছরে নিজেদের লাভজনক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে পারেনি। এটি সরকারি করপোরেশন হিসেবে তৈরি হয়েছে, বাণিজ্যিক এয়ারলাইন্স হিসেবে গড়ে ওঠেনি। সক্ষম বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠতে না পারলে শেষ পর্যন্ত উড়োজাহাজগুলো বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে।’ তবে যাত্রী সংখ্যা বৃদ্ধির সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে কৌশলগত পরিকল্পনা করতে পারলে নতুন উড়োজাহাজ কেনাটা বাংলাদেশের জন্য লাভজনক হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

আরেক অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ এটিএম নজরুল ইসলাম বলেন, বিমান যদি কমার্শিয়াল ও মার্কেটিং কৌশল বিশ্লেষণ করে উড়োজাহাজ কেনার কারণ জানাতে পারতো, তাহলে এর যৌক্তিকতা বোঝা যেত। বাজারের কথা চিন্তা করলে বিমানের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজন আছে। কিন্তু তাদের কৌশল কী, তারা চাহিদাকে বিবেচনায় নিয়েছে কিনা; এসব পরিষ্কার করা প্রয়োজন।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর জন্য ২৫টি উড়োজাহাজ কেনা হচ্ছে কিনা, সেই আলোচনা রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তবে যথাযথ পরিকল্পনা নিতে পারলে এ পরিকল্পনা থেকে বাংলাদেশ লাভবান হতে পারে। সে জন্য শুধু উড়োজাহাজ কেনা নয়, পর্যাপ্ত প্রকৌশলী ও পাইলট তৈরি, প্রশিক্ষণ এবং রক্ষণাবেক্ষণ দক্ষতা অর্জনের প্রস্তুতিও নিতে হবে।

বিমান পরিবহন খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বড় বহরের পাশাপাশি বোয়িং ও এয়ারবাস; দুই নির্মাতার উড়োজাহাজ পরিচালনা করলে পাইলট ও প্রকৌশলী প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ, খুচরা যন্ত্রাংশ ও কারিগরি সহায়তায় বাড়তি প্রস্তুতি প্রয়োজন হবে।

কতটা প্রস্তুত বিমান

বিমানের একটি সূত্র জানায়, ২০৩৪-৩৫ অর্থবছরের মধ্যে বিমানের বহর ৪৭টি উড়োজাহাজে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে সরকার। এরই মধ্যে ১৪টি বোয়িং কেনার চুক্তি হয়েছে। সর্বশেষ আরও ১১টি বোয়িং কেনার চুক্তি হয়েছে। পাশাপাশি ১০টি এয়ারবাস কেনার প্রস্তাবও যাচাই করা হচ্ছে।

বিমানের তথ্য বলছে, তারা বর্তমানে মুনাফায় আছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সংস্থাটি ৭৮৫ কোটি ২১ লাখ টাকা নিট মুনাফা করেছে। একই সময়ে পরিচালন মুনাফা ছিল ১ হাজার ৬০২ কোটি টাকা এবং মোট আয় ১১ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা। ওই অর্থবছরে ২১টি উড়োজাহাজ দিয়ে ৩০টি অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক গন্তব্যে ৩৩ লাখ ৮৩ হাজার যাত্রী পরিবহন করে বিমান।

তবে বড় বহর যুক্ত হওয়ার পর এই মুনাফার প্রবণতা ধরে রাখা যাবে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বহর বাড়ার সঙ্গে স্থায়ী ও পরিচালন ব্যয়ও বাড়বে। নতুন উড়োজাহাজের অর্থায়ন ব্যয়ের পাশাপাশি জ্বালানি, রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ, ক্রু, পাইলট, প্রশিক্ষণ, বিমা, বিমানবন্দর ফি এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ও বহন করতে হবে।

বিমানের জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মহিউদ্দীন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এখন চুক্তি হয়েছে। উড়োজাহাজগুলো যুক্ত হতে কিছু সময় পাওয়া যাচ্ছে। এই সময়ের মধ্যে বিমান তার সব পরিকল্পনা সম্পন্ন করবে।

বিমান ক্রয়ের আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে তিনি বলেন, বিমান আর্থিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এর আগে উড়োজাহাজ কেনা ও লিজ নিজস্ব অর্থায়ন থেকেই করা হয়েছে। ২৫টি বোয়িং কেনার আর্থিক খরচও বিমান নিজস্বভাবেই করবে।

তিনি বলেন, বিগত কয়েক বছর ধরেই বিমান আর্থিকভাবে লাভ করে আসছে। এমনকি আর্থিক ক্ষতি হলেও সেটি প্রকাশ করা হয়।

জনবলের বিষয়ে মহিউদ্দীন আহমেদ বলেন, বিমানে প্রতিনিয়ত জনবল নিয়োগ হচ্ছে। উড়োজাহাজগুলো হাতে আসতে সময় পাওয়া যাচ্ছে। এই সময়ের মধ্যে জনবল নিয়োগ হয়ে যাবে। পরিচালনায় কোনও সমস্যা হবে না।

উড়োজাহাজ রাখার অবকাঠামো নিয়ে তিনি বলেন, সব উড়োজাহাজ যুক্ত হতে প্রায় ১০ থেকে ১৫ বছর সময় লাগবে। এই সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোও প্রস্তুত হয়ে যাবে। বিমান নিজস্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী সবকিছু সমাধান করবে।

চাহিদার কারণে বহর বাড়ানোর দাবি

চাহিদা অনুযায়ী নতুন উড়োজাহাজ কেনা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ গেটওয়ের ক্ষেত্রে আরও রুটে পরিষেবা দেওয়া দরকার। এ জন্য আরও বিমানের প্রয়োজন আছে। ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্সের ১৫০টির বেশি বিমান আছে। বাংলাদেশের চাহিদা আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে ৭০ থেকে ৮০টির মতো হতে পারে। তবে সেই অনুযায়ী এখনও অর্ডার করা হয়নি। প্রয়োজন অনুযায়ী আরও বিমান কেনা হবে, এয়ারবাসও কেনা হবে।

বোয়িং বা এয়ারবাস কেনা নিয়ে কূটনৈতিক কোনও চাপ আছে কিনা জানতে চাইলে হুমায়ূন কবীর বলেন, ‘কোনও চাপ নয়, এটি অ্যাভিয়েশনের চাহিদা অনুযায়ী করা হচ্ছে। বাংলাদেশের পর্যাপ্ত বহর নেই। বহরের সক্ষমতা বাড়ানো দরকার। তা না হলে নতুন রুট খোলা সম্ভব হচ্ছে না এবং অর্থ হারাতে হচ্ছে।’

তিনি বলেন, বিমান না কিনলে এবং গেটওয়ের নেটওয়ার্ক ও রুটগুলো না বাড়ালে ঢাকায় যাত্রীদের চাপ বাড়বে। দীর্ঘমেয়াদে এতে অ্যাভিয়েশন খাতের টার্নওভার বাড়বে।