‘আমি বাঁচতে চাই। আপনারা সকলে একটু মানবিক হলেই বেঁচে যেতে পারি আমি, বেঁচে যেতে পারে আমার পরিবার, বেঁচে যেতে পারে আমার দুঃখিনী মায়ের দীর্ঘ লালিত স্বপ্ন—ছেলে একদিন জজ হবে।’ ২০১৭ সালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে বাঁচার আকুতি জানিয়ে কথাগুলো লিখেছিলেন এস এম তাইজুল ইসলাম।
তখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বেডে শুয়ে জীবন বাঁচানোর জন্য মানুষের কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন তিনি। দুই কিডনি অকেজো হয়ে গিয়েছিল, সঙ্গে হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের আক্রমণ। চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন ছিল ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকা। সেই কঠিন সময় পেরিয়ে দীর্ঘ নয় বছর পর ২০২৬ সালে সেই তাইজুলই বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সিভিল জজ হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। পূরণ হয়েছে অসহায় মায়ের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষার চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর সামনে আসে তাইজুল ইসলামের এই সংগ্রামের গল্প। বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন সচিবালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (জেলা ও দায়রা জজ) মো. তসলিম আরিফ স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ফলাফল ঘোষণা করা হয়। এতে সহকারী জজ পদে নিয়োগের জন্য মোট ২০০ জন প্রার্থীকে মনোনীত করা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিসের প্রবেশ পদে নিয়োগের জন্য ১৮তম বিজেএস পরীক্ষা, ২০২৫-এ সাময়িকভাবে উত্তীর্ণ ও মনোনীত ২০০ জন প্রার্থীর রোল নম্বর মেধাক্রম অনুসারে প্রকাশ করা হয়েছে।
ফল প্রকাশের পর বৃহস্পতিবার সকালে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে নিজের জীবনের দুই সময়ের দুটি ছবি পাশাপাশি দিয়ে একটি স্ট্যাটাস দেন এস এম তাইজুল ইসলাম। এর মধ্যে একটি ছবি ২০১৭ সালের। ওই সময় তিনি ভয়াবহ অসুস্থ ছিলেন। আর পাশে ২০২৬ সালের সিভিল জজ হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার রেজাল্টের ছবি দিয়েছেন।
ওই পোস্টে তাইজুল লিখেছেন, ‘This is my life! আল্লাহর শুকরিয়া এবং অশেষ নিয়ামত বলে শেষ করা যাবে না। মৃত্যুর কাছ থেকে ফিরে ক্যারিয়ার এবং জীবন যুদ্ধে উভয় জয়ী হলাম। My life is not less than an Epic। আর এই সেপ্টেম্বর মাসের ১৭ তারিখে আমার নতুন জীবনের ৯ বছর পূর্ণ হলো।’
তবে এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ এক লড়াই। রয়েছে অসুস্থতা, হাসপাতালের বেড, ডায়ালাইসিস, কিডনি প্রতিস্থাপনের অনিশ্চয়তা এবং অসহায় পরিবারের দুশ্চিন্তা।
এস এম তাইজুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ৩৯তম ব্যাচের ছাত্র। তার গ্রামের বাড়ি মাদারীপুর জেলার কালকিনি উপজেলায়। তারা দুই ভাই ও এক বোন। মাত্র ছয় বছর বয়সেই পিতৃহারা হন তিনি। এরপর অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্টের মধ্য দিয়ে বড় হয়েছেন। সেই প্রতিকূলতার মধ্যেও দাখিল ও এইচএসসি সফলভাবে পাস করে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে।
চলছিল সবকিছু ঠিকঠাক। পরিশ্রম করে কৃতিত্বের সঙ্গে এলএলবি সম্পন্ন করেন তিনি। কিন্তু এরপরই তার শরীরে ধরা পড়ে ‘ক্রনিক কিডনি ডিজিজ’। হঠাৎ করেই যেন তার মাথার ওপর আকাশ ভেঙে পড়ে। শুভাকাঙ্ক্ষীদের পরামর্শে তড়িঘড়ি করে ভারতে গিয়ে কয়েক লাখ টাকা খরচ করে চিকিৎসা নেন তাইজুল। কিন্তু তাতেও শেষ হয়নি বিপদ। এলএল.এম-এ ভর্তি হয়ে ক্লাস শুরুর কিছুদিন পর আবারও অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। একের পর এক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকরা জানান, তার দুটি কিডনিই অকেজো হয়ে গেছে। কোনোটিই আর কাজ করছে না।
এরপর থেকেই জীবন-মৃত্যুর এক কঠিন পরীক্ষায় পড়েন তিনি। হাসপাতালের বেডই হয়ে ওঠে তার জীবনের ঠিকানা। রেনাল ডায়ালাইসিস চলার সময়ই তার শরীরে আক্রমণ করে হেপাটাইটিস বি ভাইরাস। চিকিৎসকদের মতে, জরুরি ভিত্তিতে তার কিডনি প্রতিস্থাপন প্রয়োজন। কিন্তু কিডনি ট্রান্সপ্লান্টের আগে তাকে হেপাটাইটিস বি নেগেটিভ হতে হবে। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। এমন অবস্থায় চিকিৎসকরা তাকে ভারতে গিয়ে দ্রুত উন্নত চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দেন। আর সেই চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন ছিল প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকা।
এত বড় অঙ্কের টাকা জোগাড় করা তার দরিদ্র পরিবারের পক্ষে ছিল প্রায় অসম্ভব। বিপন্ন হয়ে পড়েন তাইজুল ও তার পরিবার। শেষ পর্যন্ত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বেডই হয়ে ওঠে তার অনিশ্চিত বসবাসের জায়গা। আর শিয়রে বসে অবিরাম আল্লাহকে ডাকছিলেন তার অসহায় মা হাওয়া বেগম। সেই সময়ই মানুষের কাছে সাহায্যের আবেদন জানিয়েছিলেন তাইজুল। নিজের বেঁচে থাকার আকুতি জানিয়ে বলেছিলেন, তিনি বাঁচতে চান। তার বেঁচে থাকার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল পুরো পরিবারের বেঁচে থাকা। আর জড়িয়ে ছিল তার মায়ের দীর্ঘদিনের একটি স্বপ্ন ‘ছেলে একদিন জজ হবে।’
২০১৭ সালের সেই অসহায় অবস্থার নয় বছর পর অবশেষে ২০২৬ সালের ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পরীক্ষায় সহকারী জজ পদে নিয়োগের জন্য মনোনীত ২০০ জনের একজন হয়েছেন তিনি। তাইজুল ইসলামের মেধাক্রম ১২০।