ঢাকার ব্যস্ততা থেমে থাকে না। যানবাহনের শব্দ, মানুষের ছুটে চলা, উঁচু ভবনের সারি আর প্রতিদিন বদলে যাওয়া নগরদৃশ্যের ভেতরেও এই শহর তার পুরোনো একটি পরিচয় ধরে রেখেছে। সেটি হচ্ছে-মসজিদের শহর ঢাকা। পাড়া-মহল্লার ছোট মসজিদ থেকে শুরু করে শতবর্ষী স্থাপনা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে আধুনিক নকশার দৃষ্টিনন্দন মসজিদও। ইসলামি স্থাপত্যের নানা বৈচিত্র্য ছড়িয়ে আছে রাজধানীর আনাচকানাচে।
তবে সব মসজিদের গল্প এক নয়।
রাজধানীর ভাটারা এলাকার মাদানি এভিনিউয়ে গেলে এমন একটি মসজিদ চোখে পড়ে, যার স্থাপত্য প্রথম দর্শনেই মানুষকে থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করে। দূর থেকে তাকালে কালো বর্ণের একটি বিশাল স্থাপত্য চোখে পড়ে। কাছে গেলে বোঝা যায়, এটি কোনো আধুনিক স্থাপত্য প্রদর্শনী নয়, একটি মসজিদ। মসজিদটির নাম- মসজিদ আল মোস্তফা।
ইউনাইটেড সিটির এলাকায়, ইউনাইটেড ইউনিভার্সিটির প্রবেশমুখের কাছে অবস্থিত এই মসজিদের সবচেয়ে আলোচিত বৈশিষ্ট্য এর নকশা। পবিত্র কাবা শরিফের স্থাপত্যিক ভাবধারার অনুপ্রেরণা এখানে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মসজিদের সামনের অংশে কালো রঙের আবহ, তার ওপর সোনালি বর্ণের অলংকরণ এবং আল্লাহর নাম ও মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নামের শৈল্পিক উপস্থাপন পুরো স্থাপনাটিকে দিয়েছে স্বতন্ত্র একটি পরিচয়।
দিনের আলোয় এর সৌন্দর্য একরকম, আর রাতের আলোকসজ্জায় যেন বদলে যায় পুরো দৃশ্যপট।
বাইরে কাবার ছোঁয়া, ভেতরেও একই আবহ
মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করলে বাইরের স্থাপত্যভাবনার সঙ্গে একটি ধারাবাহিকতা চোখে পড়ে। মিহরাব ও মিম্বরের দেয়ালের নকশায়ও ইসলামি শিল্পরীতির ব্যবহার রয়েছে। মিম্বরের পেছনের অংশে বড় করে সোনালি অক্ষরে লেখা হয়েছে—‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’।
স্থাপত্যের এই উপস্থাপনা শুধু সৌন্দর্য তৈরির জন্য নয়, বরং পুরো মসজিদজুড়ে একটি ধর্মীয় আবহ তৈরি করার চেষ্টা বলেই মনে হয়।
মসজিদের আরেকটি ব্যতিক্রমী দিক হলো নামাজের কাতারের পাশে রাখা কয়েকটি বেঞ্চ। দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে অসুবিধা হয় এমন মুসল্লি কিংবা বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিরা সেখানে বসতে পারেন। প্রয়োজন অনুযায়ী হেলান দেওয়ার সুযোগও রয়েছে। মসজিদের ব্যবহারিক পরিকল্পনায় মুসল্লিদের শারীরিক স্বাচ্ছন্দ্যের বিষয়টি যে বিবেচনায় রাখা হয়েছে, এই ব্যবস্থা তারই একটি উদাহরণ।
পাঁচতলা ভবন, অথচ আলো আসে প্রকৃতির কাছ থেকে
মসজিদ আল মোস্তফা পাঁচতলা বিশিষ্ট। স্থাপনাটির অন্যতম উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো, প্রচলিত অর্থে আলাদা জানালার ব্যবস্থা না থাকলেও এর ভেতরে প্রাকৃতিক আলোর ব্যবহার লক্ষণীয়।
দিনের বেলায় ভেতরে প্রবেশ করলে কৃত্রিম আলোর ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল কোনো আবদ্ধ স্থাপনার অনুভূতি হয় না। স্থাপত্যের পরিকল্পনার মধ্য দিয়েই এমনভাবে আলো প্রবেশের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যাতে মসজিদের অভ্যন্তর আলোকিত থাকে।
আরেকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো দৃষ্টিসীমা। ভবনের বিভিন্ন তলা থেকে ইমাম ও খতিবকে দেখা যায় এমনভাবে এর অভ্যন্তরীণ বিন্যাস করা হয়েছে। ফলে ওপরের তলার মুসল্লিরাও মিম্বার দেখতে পারেন।
নারীদের জন্যও রয়েছে পৃথক নামাজের ব্যবস্থা। পুরো মসজিদে পুরুষ ও নারী মিলিয়ে প্রায় ১১ হাজার মুসল্লির নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা রয়েছে বলে জানা যায়। বিশাল এই ধারণক্ষমতার কারণে বড় জামাত কিংবা বিশেষ ধর্মীয় আয়োজনেও মসজিদটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
মসজিদ, নাকি স্থাপত্যের এক প্রদর্শনী?
মসজিদটির দিকে তাকালে এই প্রশ্নটি স্বাভাবিকভাবেই মনে আসে। কারণ ধর্মীয় স্থাপনা হিসেবে এর ব্যবহারিক প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি নকশা, আলো, সবুজ, পানি ও অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জায়ও দেওয়া হয়েছে বিশেষ গুরুত্ব।
মসজিদের চারপাশে রয়েছে খেজুরগাছ। কয়েকটি গাছে ফলও দেখা যায়। পাশে রয়েছে পানির ফোয়ারা। সবুজের সঙ্গে স্থাপত্যের সমন্বয়ে জায়গাটিতে তৈরি হয়েছে আলাদা এক পরিবেশ।
ফলে নামাজ আদায় করতে আসা মানুষের পাশাপাশি স্থাপত্য দেখতে আসা মানুষের সংখ্যাও কম নয়। রাজধানীর বাইরে থেকেও অনেকে মসজিদটির নান্দনিকতা দেখতে আসেন। ধীরে ধীরে এটি ধর্মীয় স্থাপনার পাশাপাশি দর্শনীয় স্থান হিসেবেও মানুষের আগ্রহের জায়গা তৈরি করেছে।
স্বাচ্ছন্দ্যের ব্যবস্থাতেও আধুনিকতা
মসজিদটিতে রয়েছে দুটি চলন্ত সিঁড়ি। মুসল্লিদের ওঠানামার সুবিধার কথা মাথায় রেখেই এসব ব্যবস্থা করা হয়েছে। মসজিদের অভ্যন্তরে রয়েছে উন্নতমানের শব্দব্যবস্থা এবং কেন্দ্রীয় শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা।
মেঝেতে ব্যবহৃত কার্পেট চীন থেকে আনা হয়েছে বলে জানা যায়। অজুর স্থানটিও সাধারণ ধাঁচের নয়। পরিচ্ছন্ন ও নান্দনিকভাবে সাজানো অজুখানায় রয়েছে একাধিক বেসিন।
আর গাড়ি নিয়ে আসা মুসল্লিদের জন্য রয়েছে বড় সুবিধা। মসজিদের নিচে থাকা পার্কিং এলাকায় প্রায় ১০৫টি গাড়ি রাখার ব্যবস্থা রয়েছে।
মসজিদটির নির্মাণ ব্যয় নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা অঙ্কের কথা শোনা যায়। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত একটি হিসাব অনুযায়ী, নির্মাণে ব্যয় হয়েছে তিনশ কোটি টাকারও বেশি। তবে এই অঙ্কটি জনশ্রুতিনির্ভর এবং নির্ভরযোগ্য আনুষ্ঠানিক নথি ছাড়া এটিকে নিশ্চিত নির্মাণ ব্যয় মনে করার সুযোগ নেই।

সোনালি গম্বুজ, আকাশছোঁয়া মিনার
মসজিদের ওপরের দিকে রয়েছে বিশেষ ধরনের একটি সুউচ্চ গম্বুজ। সোনালি রঙের এই গম্বুজ দূর থেকেই চোখে পড়ে। পাশে রয়েছে বিশাল উচ্চতার মিনার। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর যখন একে একে মসজিদের আলোগুলো জ্বলে ওঠে, তখন দিনের চেনা স্থাপনাটি যেন অন্য এক রূপ নেয়। আলো-ছায়ার খেলায় কালো বহির্ভাগ, সোনালি অলংকরণ, গম্বুজ ও মিনার মিলিয়ে তৈরি হয় ভিন্ন এক দৃশ্য।
ধর্মীয় স্থাপনা থেকে মানুষের মিলনস্থল
একটি মসজিদের মূল পরিচয় অবশ্যই তার ইবাদতের স্থান হিসেবে। নান্দনিকতা, স্থাপত্য, আলো কিংবা আধুনিক সুযোগ-সুবিধা তার সেই মূল পরিচয়কে ছাপিয়ে যাওয়ার বিষয় নয়। মসজিদ আল মোস্তফার ক্ষেত্রেও এর মূল প্রাণ নামাজ ও ইবাদত।
তবে একই সঙ্গে এর স্থাপত্য মানুষকে আকৃষ্ট করে। কেউ আসে নামাজ পড়তে, কেউ আসে স্থাপনাটি দেখতে, কেউ আবার আসে দুটো উদ্দেশ্যেই।
এখানেই সম্ভবত মসজিদটির আলাদা হয়ে ওঠার গল্প।
ঢাকার মতো দ্রুত বদলে যাওয়া একটি নগরে যেখানে পুরোনো স্থাপত্যের সঙ্গে নতুন নির্মাণের প্রতিনিয়ত সংঘাত, সেখানে মসজিদ আল মোস্তফা আধুনিক স্থাপত্যের ভাষায় একটি ধর্মীয় স্থাপনা নির্মাণের আলাদা উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর নকশায় পবিত্র কাবার স্মৃতি, অভ্যন্তরে ইসলামি শিল্পের ছাপ, বাইরে সবুজ ও পানির সমন্বয় এবং ভেতরে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা; সব মিলিয়ে এটি রাজধানীর মসজিদ স্থাপত্যে একটি স্বতন্ত্র সংযোজন।
ভিতরের দৃশ্য
কীভাবে যাবেন
মসজিদ আল মোস্তফা দেখতে চাইলে রাজধানীর ভাটারা থানার সামনে থেকে মাদানি এভিনিউয়ের দিকে যেতে হবে। এরপর ১০০ ফুট সড়ক ধরে ইউনাইটেড ইউনিভার্সিটির প্রবেশমুখের কাছে ইউনাইটেড সিটির এলাকায় পৌঁছানো যায়। সেখানেই অবস্থিত মসজিদটি।
দিনের আলোয় এর স্থাপত্য দেখতে যেমন ভালো লাগে, সন্ধ্যার পর আলোকসজ্জায় এর চেহারা হয়ে ওঠে আরও আকর্ষণীয়।
ঢাকার মসজিদের তালিকায় তাই মসজিদ আল মোস্তফার পরিচয় শুধু আরেকটি নতুন মসজিদ হিসেবে নয়। এটি এমন একটি স্থাপনা, যেখানে ইবাদতের পবিত্রতা, স্থাপত্যের নান্দনিকতা এবং আধুনিক নগরজীবনের প্রয়োজনীয়তা একই পরিসরে এসে মিলেছে।
আর সেই কারণেই হয়তো ব্যস্ত ঢাকার পথে হঠাৎ চোখে পড়া কালো-সোনালি এই স্থাপনাটি অনেককে কয়েক মুহূর্তের জন্য থামিয়ে দেয়।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক