Image description

রেলওয়ের উন্নয়নে গত ১৭ বছরে বিনিয়োগ হয়েছে দেড় লাখ কোটি টাকা। বিপুল বিনিয়োগের পরও পণ্য পরিবহনে ২০ এবং যাত্রী পরিবহনে ৫ বছর পিছিয়েছে সংস্থাটি। এ সময়ে পণ্য পরিবহন কমেছে ৬৫ হাজার টন। আর যাত্রী কমেছে প্রায় দুই কোটি।

নতুন লাইন ও স্টেশন আধুনিক করায় জোর দেওয়া হলেও লোকোমোটিভ বা ইঞ্জিন সংকটের কারণে ট্রেন চালানো সম্ভব হচ্ছে না, এ মত কর্মকর্তাদের। আর ব্যবসায়ীদের কথা, ঢাকা-চট্টগ্রামের সাড়ে আট ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে মালগাড়ির লাগছে ৭২ ঘণ্টা। কম খরচের রেলসেবায় অসন্তুষ্ট যাত্রীরাও।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ বলেছেন, ‘অতীতে লাইন সম্প্রসারণ করলেও ইঞ্জিন আনা হয়নি, স্টেশন আধুনিক করলেও বগি কেনা হয়নি। এসব কারিগরি জটিলতা নিয়ে বিভাগীয় তদন্ত চলছে এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মামলা করেছে।’

ইঞ্জিন সংকট দ্রুত কাটিয়ে ওঠার আশ্বাস দিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলছিলেন, ব্রডগেজ লাইনে আগামী এক বছরের মধ্যে ইঞ্জিনস্বল্পতা সমাধানের চেষ্টা চলছে এবং মিটারগেজের সমস্যা দূর করতেও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

রেলওয়ের ২০০৮-০৯ অর্থবছর থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী, ১০৯টি সমাপ্ত ও চলমান প্রকল্পে ১ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। এর মধ্যে পূর্বাঞ্চলেই বিনিয়োগ হয়েছে ১ লাখ ১ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকা।

২০০৬-০৭ অর্থবছরে পূর্বাঞ্চল রেলওয়ে ৫ লাখ ৭৪ হাজার টন পণ্য পরিবহন করেছিল, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কমে ৫ লাখ ৮ হাজার টনে নেমেছে।

রেলওয়ের গত ২৩ বছরের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০০৩-০৪ অর্থবছরে ৭০ হাজার কনটেইনার পরিবহন করা হলেও বর্তমানে তা ৪৩ হাজারে নেমে এসেছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে রেলওয়ে সর্বোচ্চ ৭ লাখ টন পণ্য পরিবহন করে ১৯৭ কোটি টাকা আয় করেছিল। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৫ লাখ টন পণ্য পরিবহন করে আয় হয়েছে ৬৭ কোটি ৯ লাখ টাকা। ছয় বছরের ব্যবধানে আয় কমেছে ৬৬ শতাংশ বা ১৩০ কোটি টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ১ লাখ কনটেইনার এবং প্রায় ১৬ লাখ টন পণ্য পরিবহন করে ১১৪ কোটি টাকা আয় করেছিল রেলওয়ে। পাঁচ বছরের ব্যবধানে কনটেইনার পরিবহন ৫৮ এবং পণ্য পরিবহন ৬৭ শতাংশ কমেছে।

একসময় রেলপথে সার, পাথর ও খাদ্যশস্য পরিবহন লাভজনক ছিল। গত দুই অর্থবছর ধরে এ তিনটি পণ্য পরিবহন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে ৫ হাজার ২৬২টি ওয়াগনে খাদ্যশস্য পরিবহন করা হলেও সর্বশেষ অর্থবছরে তা ৯৮ শতাংশ কমে ১২০টি ওয়াগনে দাঁড়িয়েছে।

জ্বালানি তেল পরিবহন কমেছে প্রায় ৭৭ শতাংশ। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৩৩ হাজার ওয়াগন তেল পরিবহন করা হয়, যা সর্বশেষ অর্থবছরে ৭ হাজারে নেমেছে।

পণ্য পরিবহনের জন্য প্রতিদিন গড়ে ১৩টি ইঞ্জিন প্রয়োজন। ২০২২-২৩ অর্থবছরেও প্রতিদিন ১২টি ইঞ্জিন পণ্য পরিবহনে যুক্ত ছিল। কিন্তু যাত্রীবাহী ট্রেনকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে পণ্যবাহী ট্রেনের ইঞ্জিন কমানো হয়েছে। সর্বশেষ ২০২৬ সালের মে মাসে সারা দেশে পণ্য পরিবহনের জন্য প্রতিদিন গড়ে মাত্র দুটি ইঞ্জিন বরাদ্দ দিয়েছে রেলওয়ে।

ইঞ্জিন সংকটের কারণে চট্টগ্রাম গুডস পোর্ট ইয়ার্ডে (সিজিপিওয়াই) কনটেইনার আটকে থাকছে। ঢাকা কাস্টমস এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে সিজিপিওয়াই থেকে ঢাকার কমলাপুর আইসিডির উদ্দেশে ৪৮ হাজার কনটেইনার পরিবহন করা হয়, তখন আটকে ছিল ২ হাজার। ২০২৫ সালে আইসিডিগামী কনটেইনারের সংখ্যা ২৮ হাজারে নেমে আসে। চলতি ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত মাত্র ১৪ হাজার কনটেইনার পরিবহন করা সম্ভব হয়েছে। দেশের মোট আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় ৯২ এবং কনটেইনার বাণিজ্যের ৯৮ শতাংশ চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে হয়।

ঢাকা কাস্টমস এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে প্রতিদিন অন্তত চারটি ইঞ্জিন প্রয়োজন হলেও পাওয়া যাচ্ছে এক থেকে দুটি। কখনো টানা দু-তিন দিন ট্রেন চলে না। চট্টগ্রাম বন্দরে ১৫ থেকে ২০ দিন পর্যন্ত কনটেইনার আটকে থাকায় শিপিং এজেন্টরা বিলম্ব মাশুল চাপাচ্ছে। আর্থিক ক্ষতির কারণে ব্যবসায়ীরা রেলপথ ব্যবহারে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।

রেলওয়ের ২০২৪ সালের ‘ইনফরমেশন বুক’ অনুযায়ী, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে যাত্রী পরিবহন করা হয় ৬ কোটি ৫৩ লাখ ৩১ হাজার। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তা সর্বোচ্চ ৯ কোটি ২৭ লাখ ৫ হাজারে পৌঁছায়। কিন্তু ২০২৩-২৪ অর্থবছরে যাত্রীসংখ্যা কমে ৭ কোটি ৪১ লাখে নেমে আসে। পাঁচ বছরের ব্যবধানে যাত্রী কমেছে ১ কোটি ৮৫ লাখ ৯১ হাজার।

২০২৩-২৪ অর্থবছরের হিসাবে, রেলওয়ের ২৮৯টি ডিজেল ইঞ্জিনের মধ্যে ৮২টি বিকল। এর মধ্যে ব্রডগেজের ২৪ এবং মিটারগেজের ৫৮টি।

কবে বড় সংখ্যায় লোক নিয়োগ হয়েছে তা ভুলতে বসেছেন রেলকর্মীরা। অথচ স্বাভাবিক নিয়মে মেয়াদ শেষ করে প্রতি মাসেই অবসরে যাচ্ছেন তারা। জরুরি পরিস্থিতি সামাল দিতে ছোটখাটো পদেও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। রেলে পোষ্য কোটায় নিয়োগ হয় একটা বড় অংশ। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে রেলওয়েতে ৩০ হাজার ৪৪৪ জন কর্মী থাকলেও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে ২৪ হাজার ১৩১ জনে দাঁড়িয়েছে।

একাধিক গবেষণায় রেলের যাত্রীসেবার ঘাটতির চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৫ সালে ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি (আইইউটি) এবং ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজির (আইইউবিএটি) গবেষকদের পরিচালিত বিভিন্ন রুটের ৫২৫ জন যাত্রীর ওপর করা জরিপে দেখা যায়, ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় যাত্রীরা কালোবাজার থেকে টিকিট কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। প্ল্যাটফর্মের অসমান উচ্চতা, বগিতে অতিরিক্ত ভিড়, নিম্নমানের খাবার এবং পাথর নিক্ষেপের মতো ঘটনায় যাত্রীরা অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

একই বছর ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের করা অন্য এক গবেষণায় দেখা যায়, ৬৬ দশমিক ৪ শতাংশ যাত্রী অনলাইনে টিকিট কাটতে গিয়ে পেমেন্ট জটিলতায় পড়েছেন। ৩৭ শতাংশ যাত্রী উৎসবের সময় সার্ভার ক্র্যাশের কথা জানিয়েছেন। ৫৯ শতাংশ যাত্রীর মতে, কাস্টমার সাপোর্ট সন্তোষজনক নয়।

২০২৩ সালে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) গবেষণায় রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনের অবকাঠামোগত ত্রুটি উঠে আসে। ২০০৩ সালে বিপুল বিনিয়োগে আধুনিকায়ন করা হলেও প্ল্যাটফর্ম ও ট্রেনের বগির দরজার মধ্যে ৬ থেকে ৮ ইঞ্চি উচ্চতার পার্থক্য রয়েছে। তিনতলা ভবনে লিফট বা র‌্যাম্প না থাকায় বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা ওপরের তলা ব্যবহার করতে পারেন না। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য ট্যাকটাইল টাইলস নেই। বসার পর্যাপ্ত জায়গা নেই। মেঝেতে প্লাস্টিক বা মাদুর বিছিয়ে বসতে হয় তাদের। স্টেশনের লাগেজ ট্রলিগুলো কুলি সিন্ডিকেটের দখলে থাকায় যাত্রীদের নিজে ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই। উল্টো কুলিরা অতিরিক্ত টাকা আদায় করে। ডিজিটাল ডিসপ্লে বোর্ডে ট্রেনের তথ্যের বদলে বিজ্ঞাপন প্রচারের কারণে যাত্রীরা বিভ্রান্ত হচ্ছেন।

চট্টগ্রাম-সিলেট রুটের নিয়মিত যাত্রী ডা. হামিদ হোসাইন আযাদ বলেছেন, ‘অনলাইনে টিকিট দ্রুত শেষ হলেও কালোবাজারে ঠিকই পাওয়া যায়। এসি বগিতেও দাঁড়িয়ে যাত্রী নেওয়া হয় এবং টাকার বিনিময়ে অবৈধ যাত্রী তোলেন রেলওয়ের কর্মচারীরা। ট্রেন নির্ধারিত সময়ের চেয়ে দুই থেকে তিন ঘণ্টা দেরিতে ছাড়ে।’

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মামুনুল ইসলাম ইঞ্জিন সংকটের বিষয়টি স্বীকার করে বলেছেন, ‘দুটি প্রকল্পের আওতায় ৪০টি ইঞ্জিন কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ২০টির দরপত্র আহ্বান করা হবে। বিশ্বে এখন মিটারগেজ লাইন না থাকায় এর ইঞ্জিন পাওয়া কঠিন। টেন্ডারের পর উৎপাদন করে আনতে কমপক্ষে দুই বছর সময় লাগবে। নতুন ইঞ্জিন না আসার আগপর্যন্ত পুরনো ইঞ্জিন দিয়েই পণ্যবাহী ট্রেন চালুর চেষ্টা চলছে।’