ঢাকার আশুলিয়ায় প্রীটি গ্রুপের কারখানা চত্বরে গ্যাসবাহী লরি বিস্ফোরণে হতাহতের ঘটনায় মামলা হয়েছে। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) আশুলিয়া থানার জামগড়া পুলিশ ক্যাম্পের এসআই আবু তালেব মামলাটি করেন।
অবহেলাজনিত হত্যার অভিযোগে এই মামলা ছয়জনের নামে এবং অজ্ঞাতপরিচয়ের অন্তত ১২ জনকে আসামি করা হয়েছে। এজাহারভুক্ত আসামিরা হলেন– প্রীতি গ্রুপের জিএম সোহেল রানা, এজিএম মো. মহিউদ্দিন, ম্যানেজার মোজাম্মেল হোসেন, কারখানার ইঞ্জিনিয়ার রাজীব হোসেন এবং দুই হেলপার– আল আমিন ও মো. এনামুল।
এজাহারে অপরিকল্পিতভাবে বিপজ্জনক অবস্থায় এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণে অবহেলার অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে মামলায় মালিকপক্ষের কাউকে রাখা হয়নি।
জানা যায়, প্রীতি গ্রুপের সিইও রাজীব আহমেদ তালুকদার পিয়াল। তিনি কার্যক্রম নিষিদ্ধ কেন্দ্রীয় যুবলীগের সহসম্পাদক এবং বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক। পিয়ালের মা পারভীন তালুকদার প্রীতি গ্রুপের ডিরেক্টর। তিনি সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও বাকেরগঞ্জ উপজেলা মহিলা লীগের সভাপতি। পারভীন তালুকদারের আরেক ছেলে রেজিন আহমেদ তালুকদার কারখানার এমডি। এই বিষয়ে রেজিনের নম্বরে একাধিকবার কল দিয়েও বক্তব্য জানতে পারেনি স্ট্রিম।
কারখানার কর্মীদের নামে মামলার বিষয়ে আশুলিয়া থানার ওসি তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘প্রাথমিক তদন্তে যাদের সরাসরি দায়িত্বে অবহেলা পাওয়া গেছে, আপাতত এজাহারে তাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মালিকপক্ষের রাজনৈতিক পরিচয়ের বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই।’ তিনি বলেন, ‘মামলায় অজ্ঞাতপরিচয়ের আসামি রাখা হয়েছে। তদন্ত চলমান। পরে তদন্তে যাদের গাফিলতি বা সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।’
পুলিশের মামলা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক ইউনিটির সভাপতি ফরিদুল ইসলাম। স্ট্রিমকে তিনি বলেন, ‘কারখানায় বড় দুর্ঘটনা ঘটলে দায় বেতনভুক্ত সাধারণ কর্মচারীদের ওপর চাপানো যৌক্তিক নয়। যানবাহনের দুর্ঘটনায় যেমন মালিকের দায় আসে, তেমনি কারখানার অগ্নিকাণ্ড বা নিরাপত্তাজনিত গাফিলতির দায় মালিকপক্ষের ওপর বর্তায়। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দায়ীদের আইনের আওতায় আনা উচিত।’
গত ২০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় আশুলিয়ার জামগড়ায় প্রীতি গ্রুপের ‘এস সূহী ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক’ প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে থাকা গ্যাস সিলিন্ডারবাহী লরিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ হয়। এতে এখন পর্যন্ত আটজন নিহত এবং অন্তত ৩০ জন দগ্ধ ও আহত হয়েছেন।
কালো কাপড়ে ঢাকা মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার, আতঙ্ক
সিলিন্ডারের গায়ে লেখা– ‘ডু নট ইউজ আফটার ২০২০’। অর্থাৎ ২০২০ সালের পর এটি ব্যবহারের কথা নয়। অথচ আশুলিয়ার প্রীটি গ্রুপের কারখানা চত্বরের পাশে মঙ্গলবার এমন একটি অবিস্ফোরিত সিলিন্ডার পাওয়া গেছে। সোমবারও ‘ডু নট ইউজ আফটার ২০২১’ লেখা একাধিক সিলিন্ডার পাওয়া যায়।
ক্ষতিগ্রস্ত সিলিন্ডার সরানো হয়নি। বরং কালো কাপড়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। এতে আশপাশের বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
সরেজমিন বিস্ফোরণের ক্ষতচিহ্ন ঘটনাস্থল থেকে ৫০ গজ দূরে আইনাল মীরের বাড়িতে পাওয়া যায়। তাঁর বাড়িতে তিনটি গ্যাস সিলিন্ডার এসে পড়ে। এতে টিনের চালার কিছু অংশ দুমড়েমুচড়ে যায়। ওই এলাকায় নির্মাণাধীন চার তলা একটি ভবনের ছাদে বিস্ফোরণের গোলাকার ছিদ্র পাওয়া যায়। ছাদের লোহার রড বেঁকে গেছে; খসে পড়েছে সিমেন্ট-বালুর ঢালাই।
ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ৩০০ গজের মধ্যে একটি ভবনের দ্বিতীয় তলায় কক্ষের দেয়াল ভেদ করে ঢুকে গেছে লোহার টুকরা। দেয়ালে তৈরি হয়েছে দুটি ছিদ্র। বিস্ফোরণে শুধু কারখানা চত্বর নয়, আশপাশের বাড়িঘর এবং দোকানপাট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিস্ফোরিত সিলিন্ডার ও ধাতব অংশ ছিটকে বিভিন্ন স্থানে পড়েছে।
নাজমা বেগম জানিয়েছেন, রোববার সন্ধ্যায় মেয়েকে নিয়ে বাড়িতে ছিলেন তিনি। বিস্ফোরণের কিছুক্ষণের মধ্যে তাঁর দ্বিতীয় তলার একটি কক্ষের দেয়াল ভেদ করে লোহার টুকরা। এতে দেয়ালে ফাটল ধরার পাশাপাশি দুটি বড় গোলাকার ছিদ্র হয়।
নাজমা বলছিলেন, ‘আমি বাসায় ছিলাম। হঠাৎ বিল্ডিংয়ে একটা ঝাঁকুনি টের পেলাম। কক্ষে ঢুকে দেখি, আসবাবপত্র ও দেয়ালের ইট ভেঙে পড়েছে। আতঙ্কে মেয়েকে নিয়ে দৌড়ে নিচে নামি।’
ক্ষতিগ্রস্ত একটি ভবনের মালিক মোহাম্মদ আইয়ুব খান বলেন, ‘সিলিন্ডারগুলো কালো কাপড়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। কিন্তু এগুলো অপসারণ না করায় আশপাশের বাড়িওয়ালা ও দোকানদারদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। শব্দ হলেই মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়ছে। সোমবার রাতে শব্দ শোনার পর অনেকের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়।’ তিনি দ্রুত এসব অপসারণ করে জায়গাটি নিরাপদ ও বসবাসের উপযোগী করার দাবি জানান।
সিলিন্ডারে ‘ডু নট ইউজ আফটার ২০২০’ লেখা নজরে এসেছে বলে জানিয়েছেন আশুলিয়া সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মহিবুল্লাহ আকন। তিনি বলেন, একটি সিলিন্ডার আমাকে কয়েকজন দেখিয়েছেন। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা এই বিষয়ে ভালো বলতে পারবেন।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ঢাকা অঞ্চলের জোন-৪ এর উপসহকারী পরিচালক হাফিজুর রহমান বলেন, ‘মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডারের বিষয়টি আমরা এখনো পরীক্ষা করে দেখিনি। তবে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি, আগুনের সংস্পর্শ অথবা মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডারের কারণেই এই বিস্ফোরণ ঘটে থাকতে পারে।’
তাপ থেকে বাঁচতে দৌড়, চালক হারান পায়ের আঙুল
পায়ের দুটি আঙুল হারিয়েছেন ট্রাকচালক ওমর সুলতান (৩৮)। ঢাকার একটি সিএনজি ফিলিং স্টেশন থেকে সিলিন্ডার নিয়ে তিনি এসেছিলেন। তাঁর ভাষ্য, বিস্ফোরণের সময় সেখানে অন্তত ২৫টি ট্রাক ছিল।
ঘটনাস্থল থেকে কয়েকশ গজ দূরে থাকা মিজানুর রহমান সিলিন্ডারের টুকরোর আঘাতে আহত হন। তাঁর বাবা আব্দুর হালিম বলেন, দূর থেকে আসা টুকরোয় তাঁর ছেলে আহত হন। এরপর পাশের আরেক দোকানে বসে থাকা জয়নাব বেগমের (৫৫) ওপর একটি সিলিন্ডার পড়লে, তাঁর মৃত্যু হয়।
স্থানীয় জুতার দোকানি সাদ্দাম হোসেন বলেন, বিস্ফোরণের পর আগুন ধরে যায়। তাপ পৌঁছে দোকান পর্যন্ত। কোনো রকম প্রাণ নিয়ে দোকান থেকে দৌড়ে চলে যাই। প্রায় দেড় ঘণ্টা পর এসে দেখি দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
নিয়ম না মানায় বাড়ছে ঝুঁকি
লরিতে এভাবে গ্যাস সিলিন্ডার সংরক্ষণ ও পরিবহন সম্পূর্ণ অবৈধ বলে জানিয়েছেন বিস্ফোরক অধিদপ্তরের সহকারী বিস্ফোরক পরিদর্শক মুহাম্মদ মেহেদী ইসলাম খান। তিনি বলেন, ‘কাভার্ড ভ্যান বা লরিতে করে গ্যাস সিলিন্ডার পরিবহন করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। দেশের কোনো আইন বা বিধানে এর অনুমতি নেই।’
গাজীপুরের ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ডুয়েট) মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক হাসান মোহাম্মদ মোস্তফা আফরোজ বলেন, ‘আমাদের এখানে সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে মূলত গাইডলাইন যথাযথভাবে অনুসরণ না করাই। একটি সিলিন্ডার তৈরির নির্দিষ্ট সময় পরপর সেটি পরীক্ষা করে দেখা প্রয়োজন। কিন্তু তা হচ্ছে না। উল্টো ইদানীং যত্রতত্র এলপিজির বড় সিলিন্ডার তৈরি হচ্ছে।’
তদন্তে পৃথক কমিটি
ঘটনার কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে বিভাগীয়ভাবে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি করেছে ফায়ার সার্ভিস। কমিটির প্রধান করা হয়েছে ফায়ার সার্ভিসের ঢাকা বিভাগের সহকারী পরিচালক কাজী নজমুজ্জামানকে।
জিরাবো মডার্ন ফায়ার স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন অফিসার মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন বলেন, কমিটি শিগগির তদন্ত কার্যক্রম শুরু করবে এবং ঘটনার মূল কারণ সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারবে। ঘটনাস্থলে যাতে নতুন করে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে এবং আশপাশের লোকজন সেখানে না যায়, সে বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।
তিনি বলেন, গ্যাস অপসারণের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট গ্যাস বিভাগের কর্মকর্তারা পরামর্শ দিয়ে কাজটি সম্পন্ন করবেন। তদন্তে সিলিন্ডারগুলোর মেয়াদ রয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা হবে। মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার ব্যবহার আইনবিরোধী। এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
বিজিএমইএ সহসভাপতি রেজওয়ান সেলিম বলেন, কারখানায় পাইপলাইনের গ্যাসের তীব্র সংকট থাকায় ট্রাকের মাধ্যমে এসব সিএনজি সিলিন্ডার আনা হচ্ছিল। নিহতদের বেশির ভাগ ট্রাকচালক। ঘটনা তদন্তে বিজিএমইএ একটি কমিটি করেছে।