সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী ১৯ বছর বয়সী মরিয়ম খাতুনের মৃত্যু নতুন করে আলোচনায় তুলে এনেছে ক্ষমতার ব্যবহার, রাজনৈতিক পরিবেশ, গণমাধ্যমের দায়িত্ব এবং জনসমক্ষে বিতর্কে জড়িয়ে পড়া নারীদের প্রতি সমাজের আচরণের বিষয়গুলো।
মানবাধিকারকর্মী ও বিশ্লেষকেরা বলেছেন, অনলাইনে ও গণমাধ্যমে মরিয়মের ব্যক্তিগত জীবন যেভাবে প্রকাশ করা হয়েছে, তা উদ্বেগের। একই সঙ্গে জনসাধারণের তীব্র মনোযোগের মধ্যে তিনি প্রয়োজনীয় সহায়তা ও সুরক্ষা পেয়েছিলেন কি না, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে চাঞ্চল্যকর সংবাদ পরিবেশনের ক্রমবর্ধমান প্রবণতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা। তাদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে খুব কম গুরুত্ব দেওয়া হয় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির গোপনীয়তা, মর্যাদা ও মানসিক সুস্থতার বিষয়ে।
রোববার সন্ধ্যায় রাজধানীর ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে মরিয়মের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে গাজী নজরুল, তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগম এবং মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকে আসামি করে মামলা করেন মরিয়মের বাবা মো. মাসুম বিল্লাহ। পরে পুলিশ গাজী নজরুল ও মাকসুদাকে গ্রেপ্তার করে।
সোমবার ঢাকার একটি আদালত গাজী নজরুলের চার দিন এবং মাকসুদার এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
ব্যক্তিগত জীবন যখন প্রকাশ্যে
গত জুলাইয়ের শেষ দিকে গাজী নজরুলকে নিয়ে একটি অন্তরঙ্গ ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর মরিয়মকে ঘিরে জনসাধারণের মনোযোগ তৈরি হয়। জামায়াতে ইসলামীর কয়েকজন নেতাকর্মী শুরুতে দাবি করেছিলেন, ভিডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি। তবে পরে গাজী নজরুল বলেন, ভিডিওতে থাকা নারী তার দ্বিতীয় স্ত্রী। প্রথম স্ত্রী মাকসুদার সম্মতিতে ১৭ জুন তাদের বিয়ে হয়।
তবে তাদের সম্পর্ক কীভাবে গড়ে উঠেছিল, তা নিয়ে পরে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য সামনে আসে। গাজী নজরুলের গাড়িচালক ও মরিয়মের মামা ওবায়দুর দাবি করেন, সম্পর্কের বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর মরিয়মকে অর্থ ও চাকরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।
অভ্যন্তরীণ তদন্তের পর ২২ জুলাই গাজী নজরুলকে দল থেকে বহিষ্কার করে জামায়াত। তবে তার সংসদ সদস্য পদ এখনো বহাল রয়েছে।
সংবিধান অনুযায়ী, কোনো রাজনৈতিক দল থেকে বহিষ্কৃত হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয় না। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার এখতিয়ার স্পিকারের। প্রয়োজন মনে করলে তিনি বিষয়টি নির্বাচন কমিশনে পাঠাতে পারেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ এখনো এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেননি।
গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদ প্রতিবেদনে মরিয়মের ব্যক্তিগত জীবন যেভাবে তুলে ধরা হয়েছিল, তার মৃত্যুর পর তা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই মানুষের ব্যক্তিগত দুর্বলতাকে প্রকাশ্য অপমানের হাতিয়ারে পরিণত করা হয়।
ইজাজুল ইসলাম টাইমসকে বলেন, ‘আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে মূল্যবোধের বড় ঘাটতি রয়েছে। আইন না মানার প্রবণতাও প্রবল। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা প্রতিনিয়ত দেখি, মানুষ একে অন্যকে যতটা সম্ভব অপমান করার চেষ্টা করছে।’
তিনি বলেন, রাষ্ট্রকে এ ধরনের কর্মকাণ্ড নজরদারির আওতায় এনে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির ডক্টরাল ফেলো ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিফ বিন আলী বলেন, এ ঘটনা ক্ষমতার সম্পর্ক ও গণমাধ্যমের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
তিনি বলেন, ‘এখানে একজন সংসদ সদস্য তার ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। উনিশ বছরের এক তরুণীর ওপর তার যে ক্ষমতা ও প্রভাব ছিল, তিনি সেটির অপব্যবহার করেছেন।’
গণমাধ্যমের সংবাদ পরিবেশনের সমালোচনা করে আসিফ বলেন, মরিয়মের গোপনীয়তা উপেক্ষা করে বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘নারীর গোপনীয়তার কথা বিবেচনা না করেই পুরো বিষয়টিকে চাঞ্চল্যকর করে তোলা হয়েছিল। তার ছবি প্রকাশ করা হয়েছে, ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে, তার মুখ ঝাপসা করা হয়নি, তার নামসহ সবকিছু প্রকাশ করা হয়েছে। ওই পর্যায়ে বিষয়টি আর সংবাদ থাকে না। এটি বিনোদনের একটি রূপ হয়ে ওঠে।’
আসিফ বলেন, গণমাধ্যমের আরও মানবিক এবং ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি নেওয়া উচিত ছিল।
তিনি বলেন, ‘গণমাধ্যম পুরো ঘটনাটি যেভাবে তুলে ধরেছে, তাতে মেয়েটি পার্শ্বক্ষতির শিকার হয়েছেন। এখানে গণমাধ্যমের অবশ্যই বড় ধরনের নৈতিক ব্যর্থতা রয়েছে।’
রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকারও সমালোচনা করেন আসিফ। তিনি বলেন, বিতর্ক চলাকালে কোনো পক্ষই মরিয়মের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করেনি।
সহায়তার প্রয়োজনীয়তা
মরিয়মের মৃত্যুর পর জনসমক্ষে ও ব্যক্তিগত জীবনে সংকটে পড়া নারীদের জন্য সামাজিক ও মানসিক সহায়তাব্যবস্থার অনুপস্থিতির বিষয়টিও তুলে ধরেছেন বিশ্লেষকেরা
মরিয়মের সহায়তা, পুনর্বাসন ও একটি নিরাপদ পরিবেশ প্রয়োজন ছিল, বলেন আসিফ বিন আলী।
তিনি বলেন, ‘ঘটনায় জড়িত ওই নারীর জন্য মানসিক সহায়তাব্যবস্থা, পুনর্বাসনের জায়গা অথবা একটি নিরাপদ আশ্রয় থাকা উচিত ছিল। অন্যদিকে দায়ী ব্যক্তির শাস্তির ব্যবস্থাও করা উচিত ছিল।’
আসিফ আরও বলেন, ‘যে মেয়েটিকে মানসিক ও সামাজিক সহায়তা দিয়ে পুনর্বাসন করার কথা ছিল, তাকে উল্টো বিয়ে দিয়ে সেই ব্যক্তির বাড়িতে পাঠানো হয়েছে, যিনি তাকে শোষণ করছিলেন।’
পরিবারের অভিযোগ
মরিয়মের বিয়ে এবং এর পরের কয়েক মাসের ঘটনা নিয়ে তার বাবা ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন।
এজাহার অনুযায়ী, ১৭ জুন ঢাকায় বাবার বাসায় গাজী নজরুলের সঙ্গে মরিয়মের বিয়ে হয়। গাজী নজরুল আগে বলেছিলেন, দুই পরিবারের উদ্যোগে এবং তার প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে বিয়েটি হয়েছিল।
তবে মরিয়মের বাবার অভিযোগ, বিয়ের পর মরিয়ম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। এজাহারে বলা হয়েছে, ফোনে পরিবারের সদস্যদের তিনি তার পরিস্থিতির কথা জানিয়েছিলেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, বিয়ের ব্যবস্থা করতে সহায়তা করা ওবায়দুর রহমান পরে মরিয়মের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন।
পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, গাজী নজরুল, মাকসুদা ও ওবায়দুরের কর্মকাণ্ড এবং অন্য ঘটনাগুলো মরিয়মকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল।
এজাহারে বলা হয়েছে, ঘটনাস্থল থেকে একটি চিরকুট উদ্ধার করা হয়েছে। এতে মরিয়মের ঘনিষ্ঠ কয়েকজনকে ঘিরে বিশ্বাসঘাতকতা, প্রতারণা ও হতাশার কথা উল্লেখ রয়েছে। তবে চিরকুটটি মরিয়মের লেখা কি না, পুলিশ এখনো তা নিশ্চিত করেনি।
মরিয়মের কক্ষ থেকে কয়েকটি চিরকুট জব্দ করেছে পুলিশ। পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. ফজলুল করিম বলেন, প্রাথমিকভাবে পুলিশের ধারণা, সেগুলো মরিয়মের লেখা হতে পারে। তবে ফরেনসিক পরীক্ষার পর এর সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যাবে।