সরকারের সঙ্গে মতভিন্নতার কারণে আগামী ১২ নভেম্বর থেকে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন শুরুর পূর্বনির্ধারিত অবস্থান থেকে সরে এসেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। কমিশন এখন আগামী বছরের জানুয়ারি থেকে এই নির্বাচন শুরুর আশা করছে।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাসউদ স্ট্রিমকে বলেন, ‘নভেম্বর-ডিসেম্বরে যে ভোট হচ্ছে না, এটা আমরা বুঝতে পারছি। বিশেষ করে ১২ নভেম্বর হচ্ছে না, এটা নিশ্চিত। এখন নভেম্বর-ডিসেম্বরে না হলে জানুয়ারিতে শুরু করতে পারব বলে আশা করছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘তবে এখনো কোনো তারিখ চূড়ান্ত হয়নি। আমরা সরকারের কাছে তথ্য চেয়েছি। সরকার তথ্য-উপাত্ত দেওয়ার পর সেগুলো বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেব। ১৭ তারিখের বৈঠকে আমরা বলেছি যে আমাদের যেন শিগগিরই সব তথ্য দেওয়া হয়। একদম স্পষ্ট করে বলেছি, শিগগিরই জানাবেন, দেরি করবেন না; তাহলে আমরা সিদ্ধান্ত নিতে পারব।’
১৭ তারিখের বৈঠকে দ্রুত তথ্যের পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট তথ্য দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে উল্লেখ করে এই নির্বাচন কমিশনার স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমরা বলেছি আরও সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে হবে। কবে পরীক্ষা, কোন তারিখে পরীক্ষা—সব জানাতে হবে। এমনকি বৃত্তি পরীক্ষার সময়ও আমাদের জানা ছিল না। এটার সময়টাও আমরা সুনির্দিষ্টভাবে জানাতে বলেছি। সরকারের তো অনেক কর্মসূচি থাকে, ফলে একটু সময় লাগতে পারে।’
সরকারের প্রতিক্রিয়ায় হতাশ ইসি
গত ১৩ ও ১৪ সেপ্টেম্বর দুই দিনের প্রাক-প্রস্তুতিমূলক বৈঠক শেষে সাত ধাপে ইউপি নির্বাচন করার প্রাথমিক সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছিলেন নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। তখন এই সাত ধাপের মধ্যে তিনটি ধাপ চলতি বছরের ১২ নভেম্বর, ১৩ ডিসেম্বর ও ৩০ ডিসেম্বর শেষ করার পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু এর পরদিনই ১৫ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম অভিযোগ তোলেন, সরকারের সঙ্গে আলোচনা না করেই ইসি এই তারিখ ঘোষণা করেছে। প্রতিমন্ত্রীর এই আপত্তির পর কমিশন জানায়, এটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয় এবং ১৭ সেপ্টেম্বর আন্তমন্ত্রণালয় সভায় তা চূড়ান্ত হবে। তবে ১৭ সেপ্টেম্বরের বৈঠকের পরও কমিশন চূড়ান্ত তারিখ ঘোষণা করতে পারেনি, যা নিয়ে কিছুটা হতাশা তৈরি হয়েছে।
হতাশা প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাসউদ স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমরা তো সবার সঙ্গে আলোচনা করতে করতেই এ পর্যন্ত এসেছি। সরকার যেভাবে বলছিল, আমরাও সরকারের সঙ্গে সেভাবেই কথা বলেছি। এখন আমাদের সঙ্গে একটা আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ করলেই তো সমস্যা ছিল না। আগেও বলেছি, আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক উভয় পদ্ধতিতেই আমরা যোগাযোগ করেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘যোগাযোগের কাজটি তো করে সচিবালয়। তারা কী পর্যায়ে যোগাযোগ করছে? বললেই তো হতো যে নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে আমরা নির্বাচন করতে পারি। তাহলে তো এই পরিস্থিতি হতো না। এখন সবাই বলছে নভেম্বর বাদ দিতে হবে। যাই হোক, বিষয়টি যে পর্যায়ে চলে গেছে, এই পর্যায়ে না গেলেই ভালো হতো।’
বাতিল আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক সভা ও সংলাপ
নভেম্বরে ইউপি নির্বাচনের প্রাথমিক সময়সূচি ধরে ২১ সেপ্টেম্বর আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক সভা এবং ২৩, ২৪ ও ২৫ সেপ্টেম্বর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের দিন ঠিক করেছিল ইসি। তবে নির্বাচন পেছানোর কারণে নির্ধারিত আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক সভা ও রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ বাতিল করতে হয়েছে।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাসউদ স্ট্রিমকে বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক সভা ও রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ অবশ্যই হবে। যেহেতু পুরো প্রক্রিয়া কিছুটা ঢিলেঢালা হয়ে পড়েছে, তাই সংগত কারণেই আগের সূচি বাতিল করা হয়েছে। আর দলগুলোকে তো আমরা কোনো আনুষ্ঠানিক চিঠি দিইনি, শুধু সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। চিঠি দেওয়া হয়নি বলেই এগুলো পরে করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।’
১৩২ কোটি টাকার বাজেট চূড়ান্ত
নির্বাচনের তারিখ চূড়ান্ত না হলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বাজেট চূড়ান্ত করেছে কমিশন, যা ইসির ওয়েবসাইটেও প্রকাশ করা হয়েছে।
ইসির প্রকাশিত বাজেট অনুযায়ী, কেনাকাটায় ১৩২ কোটি ৬৭ লাখ টাকার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় যানবাহন কেনা থেকে শুরু করে ব্যালট বাক্সের তালা কেনা, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সেবা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ইসি সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদের সই করা বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা অনুযায়ী, টেলিযোগাযোগ সরঞ্জাম কেনা ও মেরামতে ১৭ লাখ টাকা, পোশাক খাতে ৮ লাখ, আপ্যায়নে ৪৫ লাখ, ডাক মাশুল ১ লাখ ৫০ হাজার ও টেলিফোন বিলে ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এছাড়া মনিহারি পণ্যে ৩৫ লাখ, অন্যান্য পণ্যে ৪৫ লাখ, প্রিন্টারের কালিতে (টোনার) ৬৭ লাখ, কম্পিউটার সামগ্রীতে ১ কোটি ৮ লাখ, অফিস সরঞ্জাম কেনা ও মেরামতে প্রায় ৫৭ লাখ, আসবাবপত্র কেনা ও মেরামতে ৭৩ লাখ ২০ হাজার, অনাবাসিক ভবন মেরামতে ১ কোটি ৭৫ লাখ, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থাপনায় ১ কোটি ৬০ লাখ, বিভিন্ন অনুষ্ঠানের ব্যয়ে ৫২ লাখ ৫০ হাজার, আউটসোর্সিং জনবলে ২ কোটি এবং নিরাপত্তা সেবা ক্রয়ে ১১ কোটি ৪৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা ধরা হয়েছে।
যানবাহন খাতে ১০টি জিপ, ২টি প্রাইভেটকার, ৪টি মাইক্রোবাস ও ৫০টি মোটরসাইকেলসহ মোট ৬৬টি গাড়ি কিনতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১০ কোটি টাকা। বিদ্যমান গাড়ির যন্ত্রাংশ ও চাকা কেনায় ধরা হয়েছে ৪০ লাখ টাকা।
পরিকল্পনায় আইসিটি খাতে প্রায় ৭ কোটি ৭৫ লাখ টাকা, জনসংযোগে ১০ কোটি ৮ লাখ টাকা এবং এনআইডি অনুবিভাগের কেনাকাটায় ৩ কোটি ৩২ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। এছাড়া প্রকাশনা ও ডকুমেন্টেশনে ১ কোটি ৩৮ লাখ টাকা এবং নির্বাচন সহায়তা খাতে প্রায় ৫৬ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
বাজেট প্রসঙ্গে কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাসউদ বলেন, ‘নির্বাচন যেকোনো সময়ই হতে পারে, তাই আমাদের প্রস্তুতি রাখতে হবে। ইতিমধ্যে আমরা সব প্রস্তুতি প্রায় শেষ করে ফেলেছি।’