Image description

জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর তীব্র ধাক্কা যানবাহনের গতিই শ্লথ করবে না; বরং এর ঢেউ সরাসরি আছড়ে পড়বে রান্নাঘরে। কারণ পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাড়বে প্রতিটি নিত্যপণ্যের দামও। আর কৃষি খাতে ডিজেল ব্যবহার ব্যাপক। এখানেও ধাক্কা দেবে সেচপাম্প এবং কৃষি যন্ত্রপাতি পরিচালনায়। স্বাভাবিকভাবেই ব্যয়ে বেড়ে পাল্টে যাবে ফসলের উৎপাদন খরচ।

যার সরাসরি প্রভাব পড়বে চাল ও অন্যান্য শস্যের খুচরা মূল্যে। সব মিলিয়ে মধ্যবিত্ত পরিবারের মাসিক বাজেট ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রার সমীকরণ পুরোপুরি ওলটপালট হয়ে যাবে— এমন আশঙ্কার কথা জানালেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারের সঞ্চয় কমবে, সেই সঙ্গে বাড়বে ঋণের বোঝা। পাশাপাশি শিল্পের উৎপাদন ও রপ্তানি খাতে বড় ধরনের বিরূপ প্রভাব ফেলবে। সার্বিকভাবে বড় ধরনের চাপে পড়বে দেশের অর্থনীতি।

সম্প্রতি সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নবম পে স্কেল ঘোষণা করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এতে মূল্যস্ফীতি আরও উসকে দেবে। ঠিক দুদিনের মাথায় জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের মধ্যে একধরনের আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় আগামীর সময়কে বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রুড অয়েলের দাম বেড়ে যাওয়ায় এবং বিপিসির ভর্তুকির বোঝা সামলাতে জ্বালানির দাম বাড়ানোর কোনো বিকল্প ছিল না সরকারের।

দীর্ঘদিন সস্তায় বিক্রি করলে ভর্তুকি বা টাকা ছাপিয়ে তা সামলানো সরকারের পক্ষে অসম্ভব এবং ব্যবহারকারীদের সাশ্রয়ী হওয়ার ইনসেনটিভও থাকে না। এ ছাড়া প্রতিবেশী দেশের তুলনায় দাম কম থাকায় চোরাচালান ও মজুদের ঝুঁকি তৈরি হয়। তবে মূল প্রশ্নটি দাম বাড়ানো নিয়ে নয়; বরং পদ্ধতি নিয়ে। দুই বছর ধরে প্রতি মাসের শেষে ফর্মুলা অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয় মূল্য সমন্বয়ের যে নীতি চালু ছিল, তা বাইপাস করে মাঝপথে আমলাতান্ত্রিক স্ববিবেচনায় হুট করে এ ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এর আগে পপুলার হওয়ার জন্য ফর্মুলা থাকলেও দাম বাড়ায়নি সরকার। নীতি ভেঙে এভাবে মাঝপথে সিদ্ধান্ত নেওয়ায় পলিসির ক্রেডিবিলিটি ও জনগণের আস্থা নষ্ট হয় এবং বিষয়টি পলিটিসাইজড হয়। তবে জ্বালানি দাম বাড়ার অজুহাতে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় রোধে সরকারের নজরদারি বাড়াতে হবে— এমন পরামর্শ দিলেন এই অর্থনীতিবিদ।

নির্দিষ্ট ও নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর সংকট: জ্বালানির মূল্য বাড়ার কারণে নিত্যপণ্যের দামও বাড়ে। এতে সবচেয়ে বেশি কষ্টে পড়বে স্বল্প ও নির্দিষ্ট আয় এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। মানুষের আয় বাড়ার হার মূল্যস্ফীতির তুলনায় কম থাকায় তাদের বাস্তব ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে যায়। ফলে পরিবারগুলোকে দৈনন্দিন জীবনযাত্রার খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে প্রতিটি খাদ্যপণ্যের দাম কেজিতে ৪ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। চার সদস্যের একটি পরিবারে যদি প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি একজন হন এবং তার মাসিক আয় নির্দিষ্ট (যেমন: ৩০,০০০ থেকে ৫০,০০০ টাকা) হয়, তবে এই আকস্মিকভাবে ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা অতিরিক্ত ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। এতে ওই পরিবারের সঞ্চয় কমে যাবে অথবা তাদের ঋণের মুখে ঠেলে দেওয়া হবে। ফলে বাধ্য হয়ে পরিবারগুলোকে কাটছাঁট করতে হবে প্রোটিন বা পুষ্টিকর খাবারের পরিমাণ।

এ প্রসঙ্গে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেছেন, জ্বালানি তেলের দাম শিল্প, ব্যবসা, যাতায়াত ও বাসাবাড়ির খরচ বেড়ে যাওয়ায় অতিরিক্ত ব্যয় ভোক্তার পকেট থেকেই কাটা হবে। ফলে নিত্য ভোগপণ্যের দাম আরেক দফা বাড়বে।

দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি খাতের অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধ এবং ছিদ্রগুলো রোধ করলে অনেক বিকল্প পথ বের করা যেত। তা ছাড়া, অতীতে বিপিসি বিপুল পরিমাণ লাভ করে অর্থ মন্ত্রণালয়ে টাকা জমা দিয়েছে এবং অনেক টাকা অলস পড়ে ছিল। এই সংকটকালে সেই লাভের টাকা ব্যবহার করা যেত কি না, তা ভাবা দরকার ছিল। সরকার ব্যয় সংকোচনের কথা বললেও নতুন পে স্কেল ঘোষণার পর ব্যয় ও পণ্যের দাম উভয়ই বেড়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে বিপিসি দাম সমন্বয় করবে ঠিকই, তবে কমলে দাম কমানোর কোনো নজির অতীতে দেখা যায়নি। রবিবার দাম বাড়ানোর ঘোষণার পর গতকালই আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম কমেছে এবং সামনে আরও কমার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই সরকারের এ সিদ্ধান্ত অপরিণামদর্শী, অবিবেচনাপ্রসূত এবং জনবান্ধব হয়নি।

শিল্প ও রপ্তানি খাতের প্রতিযোগিতা হ্রাস: জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে শিল্পকারখানার উৎপাদন, জেনারেটর চালানোর খরচ এবং পণ্য আনা-নেওয়ার (লজিস্টিকস) ব্যয় বৃদ্ধি বলে মনে করছেন শিল্পের উদ্যোক্তারা। তাদের মতে, এমনকি গ্যাসের অভাবে অনেক শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এর সঙ্গ যোগ হচ্ছে জ্বালানি সংকট। ফলে ব্যবসায়ীদের মুনাফা কমছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় রপ্তানিমুখী খাতগুলো দুর্বল হয়ে পড়বে।

 

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে শিল্পায়নের গতি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন শাশা ডেনিমসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামস মাহমুদ। তিনি আগামীর সময়কে বললেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে ব্যবসায়ীদের উৎপাদন ও পরিচালন ব্যয় সরাসরি বেড়ে যাবে। একই সঙ্গে কাঁচামাল ও পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়ায় সামগ্রিক উৎপাদন ব্যয়ও বৃদ্ধি পাবে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের দাম ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।

শামস মাহমুদ আরও বললেন, বর্তমানে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো এমনিতেই নানা ধরনের ব্যয় বৃদ্ধির চাপের মধ্যে রয়েছে। এর সঙ্গে জ্বালানির ব্যয় বাড়লে অনেক প্রতিষ্ঠানকে অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হবে। তার মতে, শিল্পের উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ অবস্থায় জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে শিল্প ও ব্যবসা খাতের ওপর অতিরিক্ত চাপ যাতে না পড়ে, সে বিষয়ে সরকারকে সতর্কতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

মূল্যস্ফীতির শঙ্কা: ২০২২ সালের আগস্টের আগে দেশের মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশের নিচে থাকলেও, ওই মাসে রেকর্ড পরিমাণ জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে এটি এক লাফে ৯ দশমিক ৫২ শতাংশে ওঠে। ফলে পরিবহন খরচ ও নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যায়। পরবর্তী চার বছরে যুদ্ধের কারণে জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের চড়া দাম এবং ডলার সংকটের কারণে মূল্যস্ফীতি আর আগের জায়গায় ফেরেনি। উল্টো ২০২৪ সালের জুলাইয়ে তা ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশে পৌঁছায়, যেখানে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছাড়ায় ১৪ শতাংশ।

এর সঙ্গে অর্থনীতিতে নতুন কিছু চালিকাশক্তি যুক্ত হয়েছে। সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়িত হওয়ায় মানুষের হাতে অর্থের প্রবাহ বাড়বে। পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংকনীতি সুদহার কমানোয় বাজারে ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং বাজারে অর্থের প্রবাহ বাড়ার এই দুই প্রভাবে আগামী দিনে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।