‘জুমারে কেউ জুতাপেটা করলে তাকে পুরস্কৃত করবো’, ‘জুমার বিরুদ্ধে মব করতে আগ্রহীরা ইনবক্স করুন। কানাডা থেকে এক রূপবতী আপা ফান্ডিং করতে রাজি হইছে বলছে, যত টাকা লাগে সে দিবে একটাই কন্ডিশন, ৮০'র দশকে ওর আব্বুর সাথে হওয়া সিন রিক্রিয়েট করতে হবে।’
সম্প্রতি ফেসবুক পোস্টে মন্তব্যগুলো করেছেন লেখক ও উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত রাজু নূরুল। লিংকডইন প্রোফাইলে থাকা তথ্য অনুযায়ী রাজু নূরুল পূর্ব আফ্রিকায় পরিচালিত European Union Technical Capacity Building Project-এ ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে চুক্তিভিত্তিক Senior Technical Advisor হিসেবে এবং ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ডাটা সেন্স (DataSense, Antwerp, Belgium)-এ রিমোট পলিসি অ্যানালিস্ট হিসেবে যুক্ত আছেন।
এছাড়াও ইতিপূর্বে তিনি ইউনিসেফ এর সিনিয়র কনসালটেন্ট, লন্ডন ভিত্তিক শিশুদের নিয়ে কাজ করা ওয়ার্ল্ড ভিশন এর প্রোগ্রাম, পলিসি এবং অ্যাডভোকেসি ডিরেক্টর, দারিদ্রতা নিয়ে কাজ করা Oxfam এর সিনিয়র প্রোগ্রাম অফিসার হিসেবে কাজ করেছেন।
রাজু নূরুল বিডিনিউজ-২৪ এ নিয়মিত কলাম লেখেন। বিডিনিউজে থাকা প্রোফাইল অনুযায়ী রাজু নূরুল পেশায় উন্নয়ন কর্মী, অ্যাক্টিভিস্ট এবং লেখক। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নয়ন অধ্যয়ন বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন। বর্তমানে বেলজিয়ামে উন্নয়ন নীতি ও ইউরোপিয়ান পলিসি নিয়ে পড়ছেন। বাংলাদেশে ইউএসএআইডির প্রকল্পের প্রোগ্রাম ও পলিসি ডিরেক্টর হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন; এখন সোমালিয়া সরকারের বিনিয়োগ, নীতি প্রণয়ন ও অর্থনীতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সিনিয়র টেকনিক্যাল উপদেষ্টা।
বিডিনিউজে সর্বশেষ তিনি কলাম লিখেছেন গত ১৬ সেপ্টেম্বর। সর্বপ্রথম কলামটি লিখেছেন চলতি বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারী। যা ছিলো অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বাণিজ্য চুক্তির সমালোচনা করে। যার শিরোনাম ছিল ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একতরফা বাণিজ্য চুক্তি: যেন দরজা খোলা রেখে ঘরের নিয়ন্ত্রণ হারানো’। গত প্রায় ৭ মাসে বিডিনিউজে ৩৮টি কলাম লিখেছেন রাজু নূরুল। অর্থাৎ প্রতি মাসে রাজু নূরুলের ৫-৬টি মতামত ছাপে বিডিনিউজ-২৪। এছাড়া গত ১৪ সেপ্টেম্বর দৈনিক সমকালেও ছাপা হয়েছে তার কলাম।
গত ২৭ মে বিডিনিউজে রাজু নূরুলের লেখা ‘তাহলে বিচার কি শুধু ভাইরালদের জন্য?’ শিরোনামে একটি কলামের বিষয়বস্তুু ছিল নারী ও শিশু নিপীড়ন।
ওই লেখার এক জায়গায় তিনি লিখেছেন, ‘জনতুষ্টিবাদের চাপে না পড়ে, বেছে বেছে ভাইরাল ঘটনার রেসপন্স না করে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর আওতায়ই প্রতিটি ঘটনার বিচার করা সম্ভব। উল্টো, নারী ও শিশু নির্যাতন, বিশেষ করে কন্যাশিশুদের ওপর সহিংসতা প্রতিরোধের বিষয়টিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত ও বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়নি। ফলে গত বছর আছিয়া হত্যার পর এই আইনে সংশোধনী এনে দ্রুত তদন্ত ও বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন করার বিধান যুক্ত করা হয়। ইতোমধ্যে বর্তমান নির্বাচিত সরকারও সেই সংশোধনী অনুমোদন করেছে।’

এভাবেই সরকারকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমনে করণীয় স্বরণ করিয়ে দেন এই কলামিস্ট। কিন্তু গত ১৪ সেপ্টেম্বর বিকেল ৪টা ৯ মিনিটে দেওয়া একটি পোস্টের কমেন্টে দেখা গেলো রাজু নূরুলের ভিন্ন রূপ। যেখানে তিনি ২টি ঘোষণা দিয়েছেন;
১- ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন বিষয়ক সম্পাদক ফাতেমা তাসনিম জুমাকে কেউ জুতাপেটা করলে তিনি তাকে পুরস্কৃত করবেন।
২- জুমার বিরুদ্ধে মব করতে আগ্রহীরা ইনবক্স করলে তিনি ফান্ডের ব্যবস্থা করবেন।
যদিও এর মাত্র ৪ দিন আগেই গত ১০ সেপ্টেম্বর মবের বিরুদ্ধে তিনি একটি পোস্ট দিয়েছেন। যার শিরোনাম ছিল- “গত দুই বছর আগে দেশে যে মবের রাজত্ব কায়েম হয়েছিল সেটি এখনো থামেনি। দেশের নানা জায়গায় মব করে মানুষকে হয়রানি থেকে হত্যা অব্যাহত আছে।” আর পোস্টটি ছিল ৯ সেপ্টেম্বর ‘ইতালিতে অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনের ওপর আ.লীগের মবের প্রেক্ষাপটে’ বিডিনিউজ-২৪ এ নিজের লেখা কলামের একাংশ।
এদিকে রাজু নূরুল কর্তৃক জুমার বিরুদ্ধে মবের উস্কানী দেওয়ার ঘটনার প্রতিবাদে গত ১৭ সেপ্টেম্বর মানবাধিকার কর্মী ও গায়ক কাজী আহনাফ তাহমিদ এক ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, “যেই ভদ্রলোক (!) জুমার বিরুদ্ধে মব করার হুমকি দিচ্ছেন, এসল্ট করলে পুরষ্কার ঘোষণা করছেন, তিনি কাজ করেন ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সাথে। এর আগে তিনি ইউনিসেফ, ওয়ার্ল্ডভিশন, অক্সফাম ইত্যাদি বড় বড় হিউম্যানিটেরিয়ান অর্গানাইজেশনের সাথে কাজ করেছেন। নিশ্চয়ই তিনি তার কর্মস্থলে "উইমেন সেইফটি, জেন্ডার বেজড ভায়োলেন্স, হিউম্যান রাইটস" এর মতো বড় বড় শব্দ ব্যাবহার করেন। অথচ ফেইসবুক এ তিনি একজন নারীর বিরুদ্ধে মব ডাকছেন। বিভিন্ন পত্রিকায় লিখালিখি করেন তার মধ্যে একটা পেলাম "অনলাইন ভায়োলেন্স" নিয়ে, ব্যাপারটা আইরনিক হয়ে গেলো। এনার বিরুদ্ধে সকল অভিযোগ প্রমাণ সমেত ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন সহ সকল মেজর হিউম্যানিটেরিয়ান অর্গানাইজেশন যেখানে আগে কাজ করে এসেছেন সব যায়গায় পাঠানো হবে। দেখি তারা কি ব্যাবস্থা নেয়। একটু পর দেখা যাবে পোস্ট বা কমেন্ট মুছে ফেলেছে। বাট ইটস টু লেইট। ছবির মেটাডেটা সহ ডকুমেন্টস করা হয়ে গেছে।”
কাজী আহনাফ তাহমিদের পোস্টের পর রাজু নূরুলের মন্তব্য নিয়ে ফেসবুকে সমালোচনা তৈরি হয়। ২১ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ৯টায় সংবাদটি প্রকাশের আগপর্যন্ত বেঙ্গল লেন্স যাচাই করে দেখেছে, রাজু নূরুল ‘জুমার ওপর মব করলে ফান্ড ম্যানেজ করবেন’ বলে করা মন্তব্যটি ডিলিট করলেও ‘জুমারে কেউ জুতাপেটা করলে তাকে পুরস্কৃত করবো’ এই কমেন্টটি ডিলিট করেননি।
জুমার উপর মব করার আহ্বান জানিয়ে করা মন্তব্যের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বেঙ্গল লেন্সকে বলেন, ‘‘এক বছরের মেয়াদকালে তিনি মুক্তিযুদ্ধে ইতিহাস বিকৃতি ছাড়া আর কোন কাজটা করেছেন? সেসব নিয়ে কয়টা রিপোর্ট লিখেছেন ভাই? কয়টা ফ্যাক্টচেক করেছেন? সংগ্রহশালার ছবি বিকৃতি নিয়ে কোনো ফ্যাক্টচেক করেছেন? না নিশ্চয়ই? এ থেকে আপনার উদ্দেশ্যও পরিস্কার। যাই হোক, সেদিন ডাকসুর ঘটনার পর যে তাৎক্ষণিক ছোট একটি পোস্ট আমি দিয়েছি, সেটি একেবারেই ঠিক আছে। তা নিয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই। সেই পোস্টের নিচে যেসব ছোট ছোট কমেন্ট করেছি, সেসব ছিল তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া। একজন প্রো-বাংলাদেশী, একাত্তরকে ধারণ করা বাঙালি ওরকম অবস্থায় ক্ষুব্ধ না হওয়াটাই অস্বাভাবিক। সেই বিক্ষুব্ধ মনোভাবেরই প্রকাশ হলো স্যাটায়ারের সাথে করা ওসব মন্তব্য, যে মন্তব্যের প্রকৃত উদ্দেশ্য কারও সাথে মব নয়। ব্যক্তিগতভাবে আমি মবের বিরুদ্ধ এবং গত কয়েক বছর আমার লেখালেখিতে তার প্রতিফলন ঘটেছে।’
নারীর উপর নিপীড়ন নিয়ে লেখালেখি করা লেখকের একজন নারীর উপর মব করার আহ্বান সাংঘর্ষিক কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আমার লেখার সাথে জুমার নারী হওয়ার কি সম্পর্ক সেটিইতো বোধগম্য নয়, নাকি অপরাধী নারী হলে তিনি জবাবদিহীতার বাইরে চলে যান? আপনি পরিস্কারভাবে এখানে জেন্ডার কার্ড খেলছেন। ব্যক্তি জুমাকে আমি চিনিইনা, সমালোচনা করা হয়েছে ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক জুমার, যিনি নির্বাচিত হওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধকে গায়েব করে দেয়ার জন্য যা যা করা দরকার, সম্ভব সব করেছেন।”
বেঙ্গল লেন্স রাজু নূরুলের বর্তমান কর্মস্থল তথা European Union Technical Capacity Building Project এবং বেলজিয়াম ভিত্তিক DataSense এর কাছে এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের পলিসি এবং প্রদক্ষেপ কী হবে জানতে চেয়ে ১৮ সেপ্টেম্বর ইমেইল করে। তবে এই প্রতিবেদন প্রকাশের আগপর্যন্ত ইমেইলের জবাব পাওয়া যায়নি।