ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার্থী সাহিল ওয়াকোডের মৃত্যুর পর দেওয়া আগের বিবৃতির জন্য ক্ষমা চেয়েছে ভারতের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (আইআইটি) বম্বে কর্তৃপক্ষ। একই ঘটনায় শিক্ষার্থীকে হেনস্তার অভিযোগ ওঠা অধ্যাপক সূর্যনারায়ণ দুল্লাকে বরখাস্ত করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
আজ সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে এসব তথ্য জানায় আইআইটি বম্বে।
পোস্টে কর্তৃপক্ষ বলেছে, ‘সাহিলের দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যুর পরিস্থিতি নিয়ে আমাদের পূর্ববর্তী বিবৃতিতে থাকা সব ধরনের মন্তব্যের জন্য আমরা ক্ষমাপ্রার্থী। সাহিলের মৃত্যু নিয়ে তদন্ত চলছে। তাঁর মৃত্যুর আগে কী ঘটেছিল, সেই ঘটনাবলির বিবরণ প্রকাশ করা উচিত হয়নি।’
সাহিলের মৃত্যুর পর দেওয়া আগের বিবৃতিতে আইআইটি বম্বে কর্তৃপক্ষ দাবি করেছিল, শুক্রবার পরীক্ষার হলে মোবাইল ফোন নিয়ে ঢুকেছিলেন তিনি। সেখানে চ্যাটজিপিটি খুলে পুরো প্রশ্নপত্র আপলোড করে উত্তর সংগ্রহ করে লিখছিলেন সাহিল। এ সময় পরীক্ষার হলে দায়িত্বে থাকা অধ্যাপকের কাছে তিনি ধরা পড়েন। পরে বিভাগীয় প্রধান তাঁর সঙ্গে কথা বলেন।
কর্তৃপক্ষের দাবি ছিল, ওই ঘটনার কারণে সাহিলের একাডেমিক বা পেশাগত ভবিষ্যতে কোনো প্রভাব পড়বে না বলে তাঁকে আশ্বস্ত করেছিলেন অধ্যাপকেরা। তবে পরীক্ষার কয়েক ঘণ্টা পরই হোস্টেলের কক্ষ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এরপর কর্তৃপক্ষের আচরণ ও ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিক্ষোভ শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। টানা আন্দোলনের পর বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে রাজি হয় আইআইটি বম্বে কর্তৃপক্ষ।
সাহিলের মৃত্যুর পর ১৮ দফা দাবি নিয়ে প্রতিষ্ঠানটিতে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। রোববার এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করেন আন্দোলনকারীরা। তাঁদের অন্যতম দাবি ছিল, সাহিলের ‘মানহানি’ করার জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে কর্তৃপক্ষকে। সেই দাবি মেনে নিয়ে সোমবার ক্ষমা চেয়েছে আইআইটি বম্বে।
এদিকে সাহিলের মৃত্যুর ঘটনায় অধ্যাপক সূর্যনারায়ণ দুল্লার নামও সামনে এসেছে। মৃত্যুর দিন পরীক্ষার হলে নজরদারির দায়িত্বে ছিলেন তিনি। তাঁর বিরুদ্ধে জাতিগত পরিচয়কে কেন্দ্র করে সাহিলকে হেনস্তার অভিযোগ তুলেছেন শিক্ষার্থীরা। তাঁর পদত্যাগও দাবি করেছিলেন আন্দোলনকারীরা।
ভারতীয় সংবাদ সংস্থা এএনআইকে আইআইটি বম্বের পরিচালক শিরীষ বি কেদার জানিয়েছেন, সূর্যনারায়ণকে বহিস্কার করা হচ্ছে। রোববার রাতের বৈঠকেও উপস্থিত ছিলেন তিনি। ওই বৈঠকে শিক্ষার্থীদের দাবিসংবলিত সনদে স্বাক্ষর করেন পরিচালক।
শিক্ষার্থীদের আরও দাবি, সাহিলের মৃত্যুর ঘটনা স্বাধীনভাবে তদন্ত করতে হবে। চলতি সেপ্টেম্বরের শেষের মধ্যে তদন্তের অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন এবং ১৫ অক্টোবরের মধ্যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে।
এ ছাড়া অধ্যাপকদের আচরণবিধি তৈরি, মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো, কাউন্সেলিং ব্যবস্থা উন্নত করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে শিক্ষার্থীদের অধিকতর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি টাস্ক ফোর্স গঠনের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। এই টাস্ক ফোর্স শিক্ষার্থীদের মানসিক যন্ত্রণা ও বিভিন্ন সমস্যার কারণ খতিয়ে দেখবে এবং এসব সমস্যা সমাধানে সুপারিশ দেবে।
আইআইটি বম্বের হাসপাতালে সার্বক্ষণিক একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ নিয়োগের দাবিও জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। তাঁদের মতে, কোনো শিক্ষার্থী মানসিক সমস্যায় পড়লে বা তার মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে দ্রুত সহায়তা পাওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
আন্দোলনকারীরা দাবি করেছেন, আগামী ২৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে তাঁদের দাবিগুলো বাস্তবায়নে কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নিয়েছে, তা লিখিতভাবে জানাতে হবে। পাশাপাশি শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে না—এমন নিশ্চয়তাও দিতে হবে।
বিক্ষোভকারীদের দাবি, এক মাসের মধ্যে এসব দাবি বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে আইআইটি বম্বের পরিচালককে পদত্যাগ করতে হবে।
অন্যদিকে, আইআইটি বম্বে কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে জাতিগত বৈষম্যের অভিযোগ তুলেছেন সাহিলের বাবা-মা। এ বিষয়ে থানায় লিখিত অভিযোগও করেছেন তাঁরা। ওই অভিযোগের ভিত্তিতে তফসিলি জাতি ও জনজাতি আইনে এফআইআর করেছে পুলিশ। বর্তমানে মামলাটির তদন্ত করছে মুম্বাই পুলিশের অপরাধ দমন শাখা।