তৌফিক মহিউদ্দীন
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর), এক রাতের প্রজ্ঞাপনে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম লিটারে ২০ টাকা বেড়ে গেল—ডিজেল ১১৫ থেকে ১৩৫, পেট্রল ১৪০ থেকে ১৬০, অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা। জ্বালানি বিভাগ নিজেই স্বীকার করেছে, দেশের ইতিহাসে জ্বালানি তেলের দাম এত বেশি কখনও একবারে বাড়ানো হয়নি। এটি নিছক আরেকটি মূল্য সমন্বয় নয়—এটি পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও খাদ্যপণ্যের দামে একযোগে আঘাত হানা একটি সামষ্টিক ধাক্কা, যার প্রভাব বিচ্ছিন্নভাবে নয়, প্রায় একই সপ্তাহে অনুভূত হবে।
এই মূল্যবৃদ্ধি এমন এক মুহূর্তে এসেছে, যখন একে সামলানোর মতো কোনো সমান্তরাল সুরক্ষা-কাঠামো নেই—না ভাড়া নিয়ন্ত্রণ, না লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি, না মজুরি-সমন্বয় ব্যবস্থা। ফলে আগামী ছয় থেকে ১২ মাসে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবনযাত্রা একযোগে ও দ্রুতগতিতে কঠিন হয়ে উঠবে, বিশেষত যাদের আয়ের কোনো স্বয়ংক্রিয় মূল্যস্ফীতি-সমন্বয় নেই।
এই ধাক্কার ব্যাপ্তি বোঝার জন্য একে খণ্ডে খণ্ডে দেখা দরকার। পরিবহনে—ডিজেলচালিত বাস, ট্রাক ও লঞ্চের পরিচালন ব্যয় তাৎক্ষণিক বাড়বে, এবং যেহেতু দেশের অধিকাংশ পণ্য সড়কপথে পরিবহন হয়, তাই এই বৃদ্ধি সরাসরি পণ্য পরিবহন খরচে যুক্ত হয়ে বাজারে পৌঁছাবে। কৃষিতে—সেচের সিংহভাগ এখনও ডিজেলচালিত পাম্পের ওপর নির্ভরশীল; বোরো মৌসুমের আগে এই মূল্যবৃদ্ধি উৎপাদন খরচ বাড়াবে, যা কৃষক ও ভোক্তা উভয়ের জন্যই চাপ তৈরি করবে—কৃষক দাম বাড়িয়ে পুষিয়ে নিতে না পারলে লোকসানে পড়বেন, পারলে খাদ্যপণ্যের দাম আরও বাড়বে। শিল্পে—জেনারেটর-নির্ভর কারখানা ও ক্ষুদ্র উৎপাদন ইউনিটের বিদ্যুৎ-বিকল্প খরচ বাড়বে, যা পোশাক খাতের মতো রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকেও প্রভাবিত করতে পারে। আর পরিবারের বাজেটে—জ্বালানি-বিভাগের নিজস্ব হিসাব অনুযায়ী বিপিসির লোকসান কমানোই এই সিদ্ধান্তের মূল যুক্তি ছিল, যেখানে বলা হয়েছে বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেলে প্রায় ৮৯ টাকা লোকসান হচ্ছিল, দৈনিক প্রায় ১০৯ কোটি এবং বার্ষিক ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার শঙ্কা ছিল। (সূত্র: প্রদত্ত প্রতিবেদন, বণিক বার্তা)
কিন্তু এই সাশ্রয়ের হিসাব রাষ্ট্রের কোষাগারের জন্য যতটা সহজ, সাধারণ মানুষের মাসিক বাজেটের জন্য ততটাই কঠিন—কারণ তাদের আয়ে কোনো সমতুল্য সমন্বয় প্রক্রিয়া নেই। এর আগে গত ১৮ এপ্রিল ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা করা হয়েছিল, অর্থাৎ পাঁচ মাসের মধ্যে দ্বিতীয় বড় বৃদ্ধি—যা প্রমাণ করে এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, ধারাবাহিক চাপ। অতীতে এ ধরনের আকস্মিক ও বড় মাত্রার জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি (যেমন ২০২২ সালে) পরিবহন ধর্মঘট ও সামাজিক অসন্তোষের জন্ম দিয়েছিল বলে ব্যাপকভাবে জানা যায়—তবে নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান এখানে নিশ্চিতভাবে উল্লেখ করছি না, প্রকাশের আগে যাচাই আবশ্যক।
একটি সংগত পাল্টা-যুক্তি আছে: বিপিসিকে লোকসানে রেখে কৃত্রিমভাবে কম দামে জ্বালানি বিক্রি করাটাও একধরনের অদৃশ্য ভর্তুকি, যার বোঝা শেষ পর্যন্ত করদাতাই বহন করেন, আর কম দামের কারণে প্রতিবেশী দেশে পাচারের ঝুঁকিও বাস্তব সমস্যা। এই যুক্তি ফেলনা নয়—রাজস্ব শৃঙ্খলা রক্ষা করা যেকোনো সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু এই যুক্তির দুর্বলতা হলো সময় ও মাত্রা বেছে নেওয়ায়—একবারে ২০ টাকা (প্রায় ১৭ শতাংশ) বৃদ্ধি এবং কোনো ধাপে-ধাপে বাস্তবায়নের সুযোগ না রাখা প্রমাণ করে যে রাজস্ব সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা যতটা যৌক্তিক, তার বাস্তবায়নের পদ্ধতি ততটাই আকস্মিক ও একমুখী—যেখানে ঝুঁকি শোষণ করার দায়িত্ব পুরোপুরি ভোক্তার ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
এখান থেকে পাঁচটি সুনির্দিষ্ট সুপারিশ থাকছে। প্রথমত, গণপরিবহনের ভাড়া তিন মাসের জন্য একটি অস্থায়ী সিলিং-এর আওতায় আনা হোক, যা বিআরটিএ মনিটরিং করবে, যাতে ভাড়া মূল্যবৃদ্ধির অনুপাতে যান্ত্রিকভাবে না বেড়ে যায়। দ্বিতীয়ত, বোরো মৌসুমের আগে কৃষি সেচের ডিজেলের জন্য একটি নির্দিষ্ট মেয়াদি মূল্য-রিবেট চালু করা হোক কৃষি ভর্তুকি কার্ডের মাধ্যমে, যাতে খাদ্য উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে থাকে। তৃতীয়ত, খোলা বাজারে (ওএমএস) চাল-আটা বিক্রির পরিমাণ ও কেন্দ্রসংখ্যা সাময়িকভাবে বাড়ানো হোক, বিশেষত শহরের নিম্ন আয়ের এলাকায়, যাতে তাৎক্ষণিক খাদ্য-মূল্যস্ফীতির ধাক্কা সরাসরি প্রশমিত হয়। চতুর্থত, বিপিসির সাশ্রয়কৃত অর্থের একটি নির্দিষ্ট অংশ ঘোষণা করে একটি স্বচ্ছ "মূল্যবৃদ্ধি প্রশমন তহবিল" গঠন করা হোক, যার হিসাব জনসমক্ষে ত্রৈমাসিক প্রকাশ করা হবে। পঞ্চমত, ভবিষ্যতে জ্বালানি মূল্য সমন্বয় একবারে না করে একটি পূর্বনির্ধারিত সূত্র অনুযায়ী মাসভিত্তিক ছোট ছোট ধাপে করার নীতি চালু করা হোক, যাতে বাজার ও পরিবার উভয়ই সমন্বয়ের জন্য সময় পায়।
এই মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিকতা অস্বীকারের উপায় নেই—বিপিসির লোকসান, পাচারের ঝুঁকি, রাজস্ব চাপ, সবই বাস্তব। কিন্তু যৌক্তিকতা থাকলেই তার বাস্তবায়নের পদ্ধতি ন্যায্য হয়ে যায় না। যখন একটি সিদ্ধান্ত পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও খাদ্যপণ্য—সবকিছুতে একযোগে চাপ তৈরি করে, অথচ সেই চাপ সামলানোর কোনো সমান্তরাল ব্যবস্থা রাখা হয় না, তখন প্রশ্নটা থেকে যায়—রাষ্ট্রের কোষাগার সুস্থ হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সেই সুস্থতার মূল্য কে দিচ্ছে, আর কতদিন ধরে দেবে।
তৌফিক মহিউদ্দীন, নগর পরিকল্পনাবিদ ও উন্নয়ন নীতি বিশ্লেষক
(মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। স্টার নিউজ কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।)