কী দোষ ছিল নিষ্পাপ ইশিয়াত শাহরিয়ার অপ্রতীমের। কেন নির্মম নিষ্ঠুরভাবে প্রাণ হারাতে হলো ১৩ বছরের এই কিশোরকে। শুক্রবার ছুটির দিন মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হয়েছিল ইশিয়াত শাহরিয়ার অপ্রতীম। বিকালে হাসিমুখে বাড়ি থেকে বের হওয়া সেই কিশোর আর ফিরলো না। রাতভর উৎকণ্ঠা, স্বজনদের ছোটাছুটি আর পুলিশের তল্লাশির পর শনিবার দুপুরে কুমিল্লার কোটবাড়ি-সানন্দা এলাকার একটি নির্জন স্থান থেকে উদ্ধার হলো তার মরদেহ। এই খবর ছড়িয়ে পড়লে নির্বাক হয়ে পড়ে তার পিতামাতা, আত্মীয়-পরিজন। শোক আর হাহাকারে ভরে উঠে সোশ্যাল মিডিয়া।
স্টাফ রিপোর্টার, কুমিল্লা, সদর দক্ষিণ ও কুবি প্রতিনিধি জানান, অপ্রতীম কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। সে ছিল পরিবারের একমাত্র সন্তান। তার মা ড. নাহিদা বেগম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার। কোটবাড়ি-গন্ধমতী এলাকায় পরিবারের সঙ্গে বসবাস করতো অপ্রিতম। শনিবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী লালমাই সানন্দা পাহাড় এলাকার একটি জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তুহিন নামের এক ব্যক্তিকে আটক করেছে পুলিশ। এরপর তার দেয়ার তথ্য মতে ফাহিম আহমেদ ও আনাস নামে ২ জনকে আটক করা হয়। তুহিন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন সানন্দা শাহআলম মেম্বারের ভাতিজা। বাকি ২ জনের বিস্তারিত তাৎক্ষণিক পাওয়া যায়নি। অপ্রতিমের মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে দ্রুত জড়িতদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তারা অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে ১২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি পূরণ না হলে বিশ্ববিদ্যালয় অচল করে দেয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।
শুক্রবার বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে কোটবাড়ির গন্ধমতী এলাকার বাসা থেকে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে মায়ের আইফোন নিয়ে বের হয়েছিল অপ্রতীম। এরপর থেকে তার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়। নিখোঁজের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছেলের সন্ধান চেয়ে আবেদন জানান মা ড. নাহিদা বেগম।
বিচার চাই না জবাব চাই, অপ্রতীমের মা: “আমার ছেলে কী অন্যায় করেছে? আমাকে জবাব দেন, আমার ছেলে কী অন্যায় করেছে? আমি এই কুমিল্লায় চাকরি করতে এসেছি, এটা কী আমার অন্যায়? আমার ছেলে কী অন্যায় করেছে, আমি এটার জবাব চাই?”
ছেলে অপ্রতীমের মরদেহ উদ্ধারের পর এভাবেই বিলাপ করে কথাগুলো বলছিলেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম। ছেলের মৃত্যুর খবর পেয়ে শনিবার অপ্রতীমের বাসায় যান স্থানীয় সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী। এ সময় ছেলেকে হারানোর শোকে ভেঙে পড়েন নাহিদা বেগম।
নাহিদা বেগম বলেন, “আমি কোনো বিচার চাই না, আমাকে এর উত্তর দিতে হবে। আমার ছোট্ট একটা ছেলে, সে কী অন্যায় করেছে। তার কী অন্যায় ছিল, আমি শুধু জানতে চাই। এটা কোন দেশ?” এরপর ছেলেকে হারিয়ে কীভাবে জীবন কাটাবেন, সেই অসহায়ত্বের কথাও বলতে থাকেন তিনি। বিলাপ করতে করতে বলেন, “আমার তো একটাই ছেলে। আমি কেমনে আমার জীবন কাটাবো? আমি আমার জীবন পার করবো কেমনে? আমারে একটু সবাই বলেন, আমি আমার জীবনটা পার করবো কেমনে।” মায়ের এসব কথা শুনে মনিরুল হক চৌধুরীও কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, “এর কোনো জবাব আমার কাছে নেই মা।”
ছেলের শেষ সময়ের কথা বলতে গিয়ে অপ্রতীমের বাবা জানান, শুক্রবার জুমার নামাজ পড়ে এসে ছেলেকে খাওয়ান তিনি। এরপর তাকে বলেছিলেন, বাবা তুমি থাকো, আজ দু’জনে মিলে মুভি দেখি। মুভি শেষে তাকে একটি গিফট দেয়ার কথাও বলেছিলেন। কিন্তু অপ্রতিম বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বাইরে যাওয়ার কথা জানায়। এরপর সে বাইরে চলে যায়। অপ্রতিমের বাবা বলেন, “আমাদের একটাই ছেলে। অন্যায় করলে ওরে মেরে ফেল, অন্যায় করে নাই। ওর ফোন নিয়ে... ফোনটা নেয়ার জন্য ওকে মেরে ফেললো, এটা কী হলো?”
ছেলেকে হারানোর পর কীভাবে তার মুখের দিকে তাকাবেন, সেই কষ্টের কথাও বলেন তিনি। অপ্রতীমের বাবা জানান, ছেলে নিয়মিত নামাজ পড়তো এবং বন্ধুদের সঙ্গে নামাজ পড়তে যেতো।
এ সময় এমপি মনিরুল হক বলেন, “কোনো ভাষা নাই রে বাবা, মাসুম একটা ছেলে।”
এদিকে অপ্রতীমের মরদেহ উদ্ধারের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে কুবি’র শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বিপুলসংখ্যক মানুষ ভিড় করেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থল থেকে বেশকিছু আলামত সংগ্রহ করেছেন।
কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানার ওসি রকিবুল ইসলাম বলেন, “আমরা অনেকটা নিশ্চিত, মোবাইল ফোনের জন্যই এ হত্যার ঘটনা।” এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে তুহিন নামের এক যুবককে আটক করা হয়েছে এবং তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। অপ্রতীমের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এম শরীফুল করীম জানিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে অপ্রতিমের সঙ্গে তুহিন নামের স্থানীয় এক ব্যক্তিকে ঘোরাফেরা করতে দেখা গেছে। তার চলাফেরা সন্দেহজনক মনে হওয়ায় বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো হয়। পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রাথমিক ধারণা, অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা মায়ের আইফোন ছিনিয়ে নেয়ার উদ্দেশ্যে এ ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। তবে এটি এখনো তদন্তে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা আইফোনটিও উদ্ধার হয়নি। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক আবদুল হাকিম বলেন, “ঘটনার পর থেকেই আমরা পুলিশ, ডিবি, স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আমরা ছেলেটিকে আর জীবিত পেলাম না।” কুমিল্লার পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান বলেন,“আমাদের একাধিক টিম মাঠে নেমেছে এবং আমরা কিছু ক্লু পেয়েছি। আমাদের কাছে আছে একজন ব্যক্তি, জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। আমি এখান থেকে যাওয়ার পরে এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি সঠিকভাবে খতিয়ে দেখবো, তদন্ত করবো এবং প্রকৃত হত্যাকারীকে না ধরা পর্যন্ত আমরা ননস্টপ এটা নিয়ে কাজ করবো।”
এদিকে অপ্রতীমের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ ও শোকের সৃষ্টি হয়। হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভে নামেন শিক্ষার্থীরা। বিক্ষোভ থেকে তারা জড়িতদের গ্রেপ্তারে ১২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি পূরণ না হলে বিশ্ববিদ্যালয় অচল করে দেয়ার হুঁশিয়ারি দেন তারা। শিক্ষার্থীরা অপ্রতিম হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত, জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান।