চলতি বছর দেশে ডেঙ্গু ছড়িয়েছে ৬৪ জেলায়। এর মধ্যে ৫২ জেলায় সংক্রমণ বেড়েছে, কমেছে ১২ জেলায়।
গত বছর সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময় দক্ষিণাঞ্চলের বরগুনা ছিল ডেঙ্গুর সবচেয়ে বড় হটস্পট। এবার সেই জায়গা নিয়েছে খুলনা। শুধু দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল নয়, ময়মনসিংহ, পাবনা, গাজীপুর, চট্টগ্রাম এবং উত্তরাঞ্চলের একাধিক জেলায়ও দ্রুত বাড়ছে রোগী।
কোথাও এক বছরে রোগী বেড়েছে ২৩ গুণের বেশি, কোথাও ১০ থেকে ১৪ গুণ। গোপালগঞ্জে গত এক বছরে রোগী বেড়েছে প্রায় ২৩.৪ গুণ। এরপর রয়েছে দিনাজপুর, খুলনা, বাগেরহাট, কুড়িগ্রাম ও রংপুর।
চলতি বছর গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে ৫৯ হাজার ১৪৭ জন ও মৃত্যু ১৭৬ জনের।
পরিস্থিতি বিবেচনায় সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে অক্টোবরের শুরুতে ডেঙ্গুর প্রকোপ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর আশঙ্কা করছে সরকার।
একই সময় অন্তত ১৫ জেলায় সংক্রমণ আরো বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ডেঙ্গুর এই পরিবর্তিত মানচিত্র বলছে—সংক্রমণ এখন কোনো একক শহর বা অঞ্চলের মধ্যে আটকে নেই। এক বছরের ব্যবধানে হটস্পট বদলে যাচ্ছে। এ জন্য নজরদারি, মশক নিয়ন্ত্রণ ও হাসপাতাল প্রস্তুতির কৌশলও বদলানো প্রয়োজন।
কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার কালের কণ্ঠকে বলেন, কোনো এলাকায় যদি এডিস মশার ঘনত্ব ও ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা—দুটিই বেশি থাকে, তাহলে সংক্রমণ দ্রুত বাড়ে। অক্টোবরের সম্ভাব্য বিস্তার ঠেকাতে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ ও তথ্য-প্রমাণভিত্তিক প্রতিরোধব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।
তিনি বলেন, ঢালাও মশক নিধন অভিযান চালিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। কোথায় মশার প্রজনন বেশি হচ্ছে, তা চিহ্নিত করে সুনির্দিষ্টভাবে প্রজননস্থল ধ্বংস করতে হবে।
প্রকোপ বেড়েছে যেসব জেলায় : খুলনায় গত বছর ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রোগী ছিল ৪০১ জন। এক বছর পর তা বেড়ে হয়েছে পাঁচ হাজার ৩৫৩ জন। অর্থাৎ রোগীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১৩.৪ গুণ।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আরো কয়েকটি জেলায় একই চিত্র। বাগেরহাটে ১১৯ থেকে রোগী বেড়ে এক হাজার ৫৫৯ জন, ঝালকাঠিতে ২৮৩ থেকে বেড়ে এক হাজার ৭২৯ জন, পিরোজপুরে ৬৮৬ থেকে বেড়ে দুই হাজার ১৩৪ জন হয়েছে।
গোপালগঞ্জে গত বছর ডেঙ্গু রোগী ছিল মাত্র ২১ জন। এবার সেই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৪৯২ জন।
দিনাজপুরে ১৬ জন থেকে বেড়ে রোগী হয়েছে ২৩৪ জন। কুড়িগ্রামে ১৪ থেকে বেড়ে ১৭২ জন, রংপুরে ৪৮ থেকে ৫৫০ জন, ঠাকুরগাঁওয়ে ১৩ থেকে ১১৬ জন হয়েছে। এর বাইরে কুড়িগ্রামসহ চার জেলায় সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। কুড়িগ্রামে ১৪ জন থেকে বেড়ে হয়েছে ১৭২ জন, যা ১২ গুণ বেশি। রংপুরে ৪৮ জন থেকে বেড়ে ৫৫০ জন, মুন্সীগঞ্জে ১২৫ জন থেকে বেড়ে এক হাজার ৩০ জন হয়েছে। ময়মনসিংহে ৪৫১ জন থেকে দুই হাজার ৩৫১ জন হয়েছে। এ ছাড়া নীলফামারীতে ৫৯ থেকে ২১৮ জন, গাইবান্ধায় ৫৫ থেকে ১৬৭ জন হয়েছে।
ঢাকা মহানগরে গত বছরের এই সময়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত ছিল ১০ হাজার ২৭৯ জন। এ বছর এ পর্যন্ত ১৩ হাজার ৮৮০ জন হয়েছে। গাজীপুরে এক হাজার ৩০০ থেকে বেড়ে হয়েছে দুই হাজার ১৭৫ জন। নারায়ণগঞ্জে ৫৯৪ থেকে এক হাজার ৪২৪ এবং নরসিংদীতে ৪০৫ থেকে ৯৫৬ জনে পৌঁছেছে।
যেসব জেলায় কমেছে : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরের বাইরে ঢাকা জেলাসহ ১২ জেলায় ডেঙ্গু রোগী কমেছে। ঢাকায় গত বছরে একই সময় আক্রান্ত ছিল ১৪৪ জন, এ বছর ৯৯ জন। শরীয়তপুরে ৫০৪ থেকে কমে হয়েছে ২৮৬ জন, কুমিল্লায় এক হাজার ২৬৭ থেকে কমে এক হাজার ৫৭ জন। চাঁদপুরে এক হাজার তিনজন থেকে কমে হয়েছে ৭৮০ জন, লক্ষ্মীপুরে ২৪৩ জন থেকে কমে ১৮৪ জন। মেহেরপুরে ১৮৯ জন থেকে কমে হয়েছে ১২৭ জন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে এক হাজার ৪১২ থেকে হয়েছে এক হাজার ৩৪ জন, বরিশালে দুই হাজার ১০৩ জন থেকে কমে হয়েছে এক হাজার ৫৮৫ জন। পটুয়াখালীতে এক হাজার ৮৪১ জন থেকে কমে হয়েছে এক হাজার ১৯৫ জন। বরগুনায় ছয় হাজার ৫৭৮ জন থেকে কমে হয়েছে এক হাজার ১০২ জন। মাদারীপুরে ৬০৫ জন থেকে কমে হয়েছে ৫৯৯ জন।
ডেনভি-৩-এর দাপট : এ বছর ডেঙ্গুর সংক্রমণে ডেনভি-৩-এর আধিপত্য স্পষ্ট। আইইডিসিআরের নমুনা বিশ্লেষণে ৭১টি নমুনার ৯১.৫ শতাংশে ডেনভি-৩ পাওয়া গেছে। বাকি ৮.৫ শতাংশ নমুনায় ছিল ডেনভি-২।
বাংলাদেশে ডেঙ্গুর চারটি ধরন—ডেনভি-১, ডেনভি-২, ডেনভি-৩ ও ডেনভি-৪ সক্রিয় রয়েছে।
আইইডিসিআরের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশে রেকর্ডসংখ্যক তিন লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন। মৃত্যু এক হাজার ৭০৫ জনের। ওই বছর মৃত্যুহার ছিল ০.৫৩ শতাংশ। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে তা কমে যথাক্রমে ০.৪৯ ও ০.৩৪ শতাংশে নামে। চলতি বছর ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মৃত্যুহার ছিল ০.২৮ শতাংশ। পরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ০.২৯ শতাংশে।
প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত জাতীয় কৌশল : গত ২৫ বছরের অভিজ্ঞতা একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে যে ডেঙ্গুকে আর মৌসুমি রোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। যদি আগামী তিন দশকও ডেঙ্গু বাংলাদেশের বাস্তবতা হয়ে থাকে, তাহলে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের বর্তমান বিচ্ছিন্ন, খণ্ডিত ও প্রকল্পনির্ভর পদ্ধতি দিয়ে এই দীর্ঘমেয়াদি সংকট মোকাবেলা সম্ভব নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত জাতীয় কৌশল।
প্রয়োজন নিয়মিত এডিস জরিপ, ওয়ার্ডভিত্তিক ঝুঁকির মানচিত্র, দক্ষ কীটতত্ত্ববিদ, আধুনিক ল্যাবরেটরি, কীটনাশকের কার্যকারিতা পরীক্ষা, স্বাধীন মূল্যায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনকে বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা।
অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহমেদ বলেন, এই দীর্ঘমেয়াদি ফাঁদ থেকে বের হওয়ার অন্যতম কার্যকর উপায় হতে পারে একটি কার্যকর ডেঙ্গু টিকা। ভারতে বর্তমানে এমন একটি টিকার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। টিকাটি সফল হলে এবং দেশের প্রতিটি মানুষকে তা দেওয়া সম্ভব হলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি বা পরিবর্তন হতে পারে।