পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে ধারদেনা করে ইউরোপের দেশ গ্রিসে পাড়ি জমিয়েছিলেন সখীপুরের ইয়ার মাহমুদ। নানা জটিলতা ও কাগজপত্রের বৈধতা না থাকায় সেখানে ১১ মাস অবস্থানের পর দেশে ফিরে আসেন তিনি। ২০১৫ সাল থেকে জীবিকার তাগিদে অটোভ্যান চালালেও এই পেশার মধ্যেই গড়ে তুলেছেন এক ব্যতিক্রমী মানবিক উদ্যোগ। তার অটোভ্যানে মাদ্রাসাশিক্ষার্থী, আলেম, হাফেজ, মুফতি, ইমাম ও মুয়াজ্জিন যাত্রী হিসেবে উঠলে তাদের কাছ থেকে কোনো ভাড়া নেন না তিনি।
ইয়ার মাহমুদের বাড়ি সখীপুরের কালিয়াপাড়া ঘোনারচালা এলাকায়। তিনি এলাকার হাসান আলীর ছেলে। প্রতিদিন অন্তত ১০ জন মাদ্রাসাশিক্ষার্থী ও ধর্মীয় ব্যক্তিকে বিনা ভাড়ায় তাদের গন্তব্যে পৌঁছে দেন তিনি। সখীপুর-সাগরদিঘী ও কচুয়া-ভালুকা সড়কে অটোভ্যান চালান ইয়ার মাহমুদ।
ভাড়ার পরিবর্তে এসব যাত্রীর কাছে তিনি শুধু মন থেকে দোয়া চান। দীর্ঘদিন ধরে তার এই উদ্যোগ স্থানীয়দের নজর কেড়েছে। এ কারণে নিজ গ্রামের মানুষ, আত্মীয়-স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছেও প্রশংসিত হয়েছেন তিনি। স্থানীয়দের কাছে এখন তিনি একজন মানবিক মানুষ হিসেবে পরিচিত।
ইয়ার মাহমুদের অটোভ্যানের নিয়মিত যাত্রী স্থানীয় ইমাম আইন উদ্দিন বলেন, ইয়ার মাহমুদ ভাই খুব সুন্দর মনের মানুষ। এমন মহৎ কাজ করে তিনি মাদ্রাসাশিক্ষার্থীদের সম্মানিত করেছেন। তার মঙ্গল কামনা করি।
আরেক যাত্রী হাবিবুর রহমান মন্তব্য করেন, আজকাল এমন মানুষ খুব কমই পাওয়া যায়। অনেকেই ১০ টাকার ভাড়া ২০ টাকা নেন। কিন্তু ইয়ার মাহমুদ মাদ্রাসাশিক্ষার্থী, আলেম, হাফেজ, মুফতি, ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের কাছ থেকে কোনো ভাড়া নেন না। বিষয়টি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।
ইয়ার মাহমুদের এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে ব্যক্তিগত একটি প্রতিজ্ঞা। তিনি জানিয়েছেন, তার প্রথম সন্তান জন্মের পর মারা যায়। এরপর তিনি ইচ্ছা করেন- আল্লাহ তাকে আবার সন্তান দিলে তাকে মাদ্রাসায় পড়িয়ে ভালো আলেম হিসেবে গড়ে তুলবেন। তাই মাদ্রাসাশিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোনো ভাড়া নেবেন না।
ইয়ার মাহমুদ উল্লেখ করেন, আমাদের সংসারে আমার সহধর্মিণীর প্রথম সন্তান হয়েছিল। কিন্তু সেই সন্তানটি মারা যায়। সন্তানটি মারা যাওয়ার পর আমি নিয়ত করেছিলাম, আল্লাহ যদি আমাকে আবার সন্তান দেন, তাহলে তাকে মাদ্রাসায় পড়াব এবং একজন ভালো আলেম হিসেবে গড়ে তুলব। পাশাপাশি মাদ্রাসাশিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোনো ভাড়া নেব না।
তিনি আরও বলেন, সেই নিয়ত থেকেই বর্তমানে মাদ্রাসাশিক্ষার্থী, আলেম, হাফেজ, মুফতি, ইমাম ও মুয়াজ্জিন আমার গাড়িতে উঠলে তাদের কাছ থেকে কোনো ভাড়া নিই না। আমার কাছে মনে হয়, যেদিন তাদের কাছ থেকে ভাড়া নিই না, সেদিন আমার রোজি-রোজগার অনেক বেড়ে যায়।
বিদেশ যাওয়ার সময় করা ঋণের বড় একটি অংশ এখনো পরিশোধ করতে পারেননি ইয়ার মাহমুদ। বর্তমানে তার প্রায় চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা ঋণ রয়েছে। অটোভ্যান চালিয়ে সেই ঋণ পরিশোধের চেষ্টা করছেন তিনি। পাশাপাশি পরিবার চালানোর দায়িত্বও পালন করছেন। তার ছেলে ইমন স্থানীয় একটি দাখিল মাদ্রাসায় পড়াশোনা করছে।
অবসর সময়ে শখের বশে ‘Ear Mahmud’ নামে ফেসবুক আইডিতে ভিডিও ও বিভিন্ন কনটেন্ট তৈরি করেন তিনি।
নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে ইয়ার মাহমুদ বলেন, আল্লাহ যতদিন আমাকে দুনিয়ায় বাঁচিয়ে রাখবেন, ততদিন আমি মাদ্রাসাশিক্ষার্থী, আলেম, হাফেজ, মুফতি, ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের সম্মান করব। অটোভ্যান চালিয়ে নিজের ঋণ পরিশোধ করব। মরার আগ পর্যন্ত আমি এই পেশায় থাকব। আমার জীবনে আর কিছু চাওয়ার নেই।