Image description

বিনা মূল্যের পাঠ্যবই ছাপানোর ঠিকাদারি কাজের একটি বড় অংশ ভাগাভাগি করার অভিযোগ উঠেছে। ঠিকাদারেরা সরকারের প্রাক্কলিত দর আগেই জেনে গিয়েছিলেন এবং সে অনুযায়ী তাঁরা কিছুটা কম–বেশি করে দর দাখিল করে কাজ বাগিয়ে নিয়েছেন।

মাঝপথে প্রাক্কলিত দর বাড়ানোর ঘটনাও ঘটেছে। শুরুতে সরকার একটি প্রাক্কলিত দর ঠিক করেছিল, তা ফাঁস হয়ে যায় এবং ফাঁস হওয়া দর দেখে ঠিকাদারেরা তা বৃদ্ধির জন্য চাপ দেন।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) সেটি মেনে নিয়ে প্রাক্কলিত দর বাড়িয়ে দেয়। পরে ঠিকাদারেরা সমঝোতা করে দরপত্র দাখিল করে কাজ ভাগাভাগি করেন।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রাক্কলিত মূল্য বৃদ্ধি ও কাজ ভাগাভাগির ফলে শুধু মাধ্যমিকের বই ছাপাতে বাড়তি ব্যয় হবে ২৫২ কোটি টাকা।

দর ফাঁস হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন এনসিটিবির একজন সদস্য। অন্যদিকে সরকারি খাতে ক্রয়বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাক্কলিত দর ঠিকাদারদের জানার কথা নয়। মাঝপথে দর বাড়ানো নিয়ম অনুযায়ী হয়নি; আর প্রতিযোগিতা কম হলে সরকারের কাজের ব্যয় বেড়ে যায় এবং গুণগত মান খারাপ হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রাক্কলিত মূল্য বৃদ্ধি ও কাজ ভাগাভাগির ফলে শুধু মাধ্যমিকের বই ছাপাতে বাড়তি ব্যয় হবে ২৫২ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ মুদ্রণশিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান প্রথম আলোকে বলেন, এবার অনিয়মের কারণে সরকারের খরচ অনেক বাড়বে। তিনি আরও বলেন, ‘মনে হয়েছে, এবার আমার কাজ করার মতো সুষ্ঠু পরিবেশ নেই, তাই অংশ নিইনি।’

৩১ কোটি বই ছাপানো হবে

সরকার প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের বিনা মূল্যে পাঠ্যবই দেয়। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বই ছাপানোর ক্ষেত্রে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠত। কোনো কোনো বছর বইয়ের মান নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

২০২৭ সালের জন্য ছাপানো হবে প্রায় ৩১ কোটি বই। মাধ্যমিকের বইয়ের সংখ্যা ২২ কোটির বেশি, বাকিগুলো প্রাথমিকের। বই ছাপার এ কাজে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। সরকারের লক্ষ্য, বছরের শুরুতেই সব শিক্ষার্থীর হাতে বই তুলে দেওয়া। এ জন্য নভেম্বরের মধ্যে জেলা ও উপজেলায় বই পাঠানোর চেষ্টা চলছে।

এবার বই ছাপার প্রক্রিয়া শুরু হয় এনসিটিবির সাবেক চেয়ারম্যান মো. মাহবুবুল হক পাটোয়ারীর সময়ে। শুরুতে বাজার যাচাই করে প্রাথমিক স্তরের বইয়ের জন্য প্রতি ফর্মা কাগজের দাপ্তরিক প্রাক্কলিত গড় দর ধরা হয়েছিল ৩ টাকা ২৬ পয়সা। মাধ্যমিক স্তরের জন্য ধরা হয়েছিল ২ টাকা ৮৫ পয়সা।

মনে হয়েছে, এবার আমার কাজ করার মতো সুষ্ঠু পরিবেশ নেই, তাই অংশ নিইনি।
বাংলাদেশ মুদ্রণশিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান

এই দর অনুযায়ী প্রাথমিক স্তরের বই ছাপার দরপত্র ৩ ও ৪ জুন ইলেকট্রনিক দরপত্রব্যবস্থায় (ইজিপি) ‘লাইভ’ (অনলাইনে আবেদনের সুযোগ দেওয়া) করা হয়। ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির বইয়ের দরপত্র ‘লাইভ’ করা হয় ৭ ও ৯ জুন।

এনসিটিবি ও মুদ্রণশিল্পের মালিকদের সূত্রে জানা গেছে, কাগজের যে দর প্রাক্কলন করা হয়েছিল, তা এ পর্যায়ে এসে ফাঁস হয়ে যায়।

প্রাক্কলিত দর ফাঁসের বিষয়টি স্বীকার করেন এনসিটিবির সদস্য আবু নাসের। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বই ছাপার কাজে সাত-আটটি কমিটি রয়েছে। কোনো পর্যায় থেকে তথ্য বাইরে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়ে থাকতে পারে। এটা এনসিটিবির দুর্বলতা বলেও স্বীকার করেন তিনি।

এনসিটিবি ও মুদ্রণশিল্পের মালিকদের সূত্রে জানা গেছে, কাগজের যে দর প্রাক্কলন করা হয়েছিল, তা এ পর্যায়ে এসে ফাঁস হয়ে যায়।

কাগজের প্রাক্কলিত দর ছিল গতবারের কাছাকাছি। ঠিকাদারেরা দেখলেন, এই দরে দরপত্র জমা দিয়ে কাজ পেলে মুনাফা কম হবে; তবে সরকারের সাশ্রয় হবে। এ পর্যায়ে ছাপাখানার মালিকদের একটি অংশ একজোট হয়ে প্রাক্কলিত দর বাড়ানোর জন্য আবেদন করেন।

দেশের সরকারি ক্রয়ে প্রাক্কলিত দর ঠিক করা হয় সংশ্লিষ্ট সংস্থার কমিটির মাধ্যমে। কোনো ঠিকাদার প্রাক্কলিত দরের চেয়ে ১০ শতাংশ বেশি দর দাখিল করলে তিনি প্রতিযোগিতা থেকে বাদ পড়ে যান। এ কারণে প্রাক্কলিত দর জানতে পারা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ঠিকাদারেরা সাধারণত সরকারি কর্মকর্তাদের বড় অঙ্কের ঘুষ দিয়ে প্রাক্কলিত দর জানার ব্যবস্থা করেন।

এনসিটিবির ৪২৩তম বোর্ড সভার নথিতে বলা হয়েছে, মুদ্রণশিল্পের ৭৫ জন মালিক প্রাক্কলিত দর বাড়ানোর আবেদন করেছিলেন। তাঁদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রাক্কলিত দর পুনর্মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নেয় বোর্ড। তবে এই প্রাক্কলিত দর ঠিকাদারদের জানার কথা নয়।

২০২৭ শিক্ষাবর্ষে মাধ্যমিক স্তরের বই ছাপাতে কাগজের পরিমাণ ধরা হয়েছে ২৫ লাখ রিম (এক হাজার ফর্মায় এক রিম)। হিসাব করে দেখা যায়, কাগজের প্রাক্কলিত দর বাড়ানোর ফলে সরকারের প্রায় ২৫০ কোটি টাকার বেশি খরচ বাড়তে পারে।

সূত্রের দাবি, অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে এনসিটিবির চেয়ারম্যান পদে মাহবুবুল হক পাটোয়ারীর জায়গায় গত ৮ জুন নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়। তাঁর নাম মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর দরপত্রের প্রক্রিয়া চলাকালেই প্রাক্কলিত দর পুনর্নির্ধারণ করা হয়।

ফখরুল মাওলা ১১ সেপ্টেম্বর মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, কাগজ, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পরিবহন খরচ বাড়ায় এবার প্রাক্কলিত দর বাড়ানো হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আইন ভঙ্গ হয়নি। তিনি আরও বলেন, সমঝোতা করে দরপত্রে অংশ নিলে প্রতিযোগিতা কমতে পারে। তবে এটি পুরোপুরি এনসিটিবির নিয়ন্ত্রণে নয়।

এনসিটিবির সদস্য আবু নাসেরও দাবি করেন, দরপত্র ‘লাইভ’ হওয়ার পর দর পুনর্নির্ধারণ আইনের লঙ্ঘন নয়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কর্তৃপক্ষ বিষয়টি জানত।

মন্ত্রণালয় আসলেই জানত কি না, তা জানতে শিক্ষাসচিব আবদুল খালেকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। ৮ সেপ্টেম্বর কার্যালয়ে গেলে প্রশ্ন শোনার পর তিনি আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

দরপত্রের প্রক্রিয়ার মধ্যে এভাবে প্রাক্কলিত দর বাড়ানো যায় কি না, জানতে চাইলে সরকারি ক্রয় বিষয়ের বিশেষজ্ঞ ও সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিটের (সিপিটিইউ) সাবেক মহাপরিচালক ফারুক হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, দরপত্র আহ্বানের পর প্রাক্কলিত দর পরিবর্তনের সুযোগ নেই। পরিবর্তন করতে হলে বাতিল করে নতুন দরপত্র ডাকতে হবে।

বাড়তি ব্যয় কত

এনসিটিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের জন্য মাধ্যমিক স্তরের বই ছাপানোর প্রতি ফর্মার গড় কার্যাদেশের দর ছিল ২ টাকা ৩১ পয়সা। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য তা বেড়ে হয়েছে ৩ টাকা ৩২ পয়সা। অর্থাৎ প্রতি ফর্মায় দর বেড়েছে প্রায় ৪৪ শতাংশ।

২০২৭ শিক্ষাবর্ষে মাধ্যমিক স্তরের বই ছাপাতে কাগজের পরিমাণ ধরা হয়েছে ২৫ লাখ রিম (এক হাজার ফর্মায় এক রিম)। হিসাব করে দেখা যায়, কাগজের প্রাক্কলিত দর বাড়ানোর ফলে সরকারের প্রায় ২৫০ কোটি টাকার বেশি খরচ বাড়তে পারে।

প্রাথমিক স্তরেও দর বেড়েছে। ২০২৬ সালে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির বইয়ের প্রতি ফর্মার গড় কার্যাদেশের দর ছিল ৩ টাকা ৪৪ পয়সা। ২০২৭ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৩ টাকা ৫৪ পয়সা। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মূলত মাধ্যমিকের বই থেকেই বাড়তি টাকা নেওয়ার কৌশল সাজানো হয়েছে।

সমঝোতার দরপত্র

বই ছাপার কাজ চলছে ভাগে ভাগে। দরপত্র হয়েছে ৭০০টির বেশি। ৪৮৫টি দরপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২৩১টিতে দরদাতা ছিলেন একজন করে। তিনিই কাজ পেয়েছেন। কোথাও আবার একই মালিকের একাধিক প্রতিষ্ঠান একই দরপত্রে অংশ নিয়েছে।

কোনো কোনো দরপত্রে একাধিক প্রতিষ্ঠান দরপত্র কিনেছে; কিন্তু জমা দিয়েছে একটি প্রতিষ্ঠান। যেমন সপ্তম শ্রেণির ৭১৪ নম্বর দরপত্রে ১৪টি প্রতিষ্ঠান কিনেছিল; কিন্তু শেষ পর্যন্ত দর জমা দেয় একটি প্রতিষ্ঠান, ‘লেটার এন কালার লিমিটেড’। প্রতিষ্ঠানটি কোনো প্রতিযোগিতা ছাড়াই কাজ পেয়েছে।

দরপত্রের নথিতে একই মালিকের একাধিক প্রতিষ্ঠান অংশ নেওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে। যেমন ষষ্ঠ শ্রেণির ৬৬৯ নম্বর দরপত্রে প্রমা প্রিন্টিং, সীমান্ত প্রেস এবং ব্রাইট প্রিন্টিং কাছাকাছি দর জমা দেয়। এই তিন প্রতিষ্ঠান একই মালিকের। অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান এই লটে প্রতিযোগিতা করেনি।

তিনটি প্রতিষ্ঠানের মালিক এস এম মোহসীন প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের আলাদা সত্তা রয়েছে। তাই কাজের মানে সমস্যা হবে না।

দরপত্র জমা দেওয়ার আগের দিন ১৬ জুন মুদ্রণশিল্পের মালিকদের মধ্যে দর নিয়ে আলাপ হয় হোয়াটসঅ্যাপের একটি গ্রুপে। সেই আলাপের স্ক্রিনশট দেখিয়ে একটি সূত্র বলছে, কোন শ্রেণিতে কত দর দিতে হবে, তা আগে বলে দিয়েছেন সমঝোতায় অংশ নেওয়া মালিকেরা।

এনসিটিবির বই ছাপার কাজের একটি বড় অংশ পেয়েছে অগ্রণী প্রিন্টিং প্রেস ও কর্ণফুলী প্রিন্টার্স। অগ্রণী প্রিন্টিং প্রেসের মালিক হাসানুজ্জামান রুবেল। কর্ণফুলী প্রিন্টার্সের মালিক কাউছারুজ্জামান রবিন। তাঁরা আপন ভাই। সূত্রের দাবি, তাঁরাই সমঝোতা করার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছেন।

বিষয়টি নিয়ে বক্তব্য জানতে ৭ সেপ্টেম্বর হাসানুজ্জামানের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়। প্রশ্ন শুনে তিনি ব্যস্ত আছেন বলে ফোন কেটে দেন। পরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এনসিটিবির বই ছাপার দরপত্রে প্রাক্কলিত দর প্রেসের মালিকদের আগে থেকে জানার সুযোগ তৈরি হওয়া বড় ধরনের দুর্বলতা। তথ্য কীভাবে বাইরে গেল, তা অনুসন্ধান করে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে হবে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান

‘জবাবদিহির অভাবে অনিয়ম’

পাঠ্যবই মুদ্রণে অনিয়মের অভিযোগে গতবার সাতটি প্রতিষ্ঠানকে কালোতালিকাভুক্ত করেছিল এনসিটিবি। তবে নতুন চেয়ারম্যান ফখরুল মাওলা দায়িত্ব নেওয়ার পর দরপত্রে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার কথা বলে সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। তার মধ্যে অন্তত দুটি প্রতিষ্ঠান এবার কাজ পেয়েছে বলে জানা গেছে। প্রতিষ্ঠান দুটি হলো বর্ণমালা প্রেস এবং সোহাগী প্রিন্টিং প্রেস। এদের বিরুদ্ধে নিম্নমানের বই সরবরাহের অভিযোগ রয়েছে।

জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, এনসিটিবির বই ছাপার দরপত্রে প্রাক্কলিত দর প্রেসের মালিকদের আগে থেকে জানার সুযোগ তৈরি হওয়া বড় ধরনের দুর্বলতা। তথ্য কীভাবে বাইরে গেল, তা অনুসন্ধান করে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে হবে।

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এ ধরনের ঘটনা দীর্ঘদিনের ‘ওপেন সিক্রেট’। কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় অনিয়ম বন্ধ হচ্ছে না।