Image description
২০৩২ সালে যাত্রা শুরু

কর্মব্যস্ত নাগরিক জীবনের গতি বাড়াতে ‘জাদুর ঝাঁপি’ হয়ে দেখা দিয়েছে মেট্রোরেল। বর্তমানে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ২০ কিলোমিটারের মেট্রোরেল সচল রয়েছে। এটিই দেশের প্রথম মেট্রোরেল। তবে ৩০৫ বর্গকিলোমিটারের বিশাল এলাকাজুড়ে বিস্তৃত রাজধানীর বুকে মাত্র একটা মেট্রোরেল দিয়ে ব্যস্ত নাগরিক জীবনকে সত্যিকার অর্থে গতিময় করা যাবে না। এজন্য বড় ব্যয়ের বোঝা মনে হলেও সরকার জনস্বার্থে আধুনিক রাজধানী গড়ার প্রশ্নে ঢাকাবাসীর জন্য আরও তিনটি মেট্রো উপহার দিতে যাচ্ছে। যার যাত্রা ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে, শেষ হবে ২০৩৩ সালে। তবে আশার কথা, এর আগেই ২০৩২-এ আরও একটি মেট্রোরেলের দেখা পাবে রাজধানীবাসী। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সংগত কারণে এভাবে একসময় মেট্রোময় হয়ে উঠবে আমাদের প্রাণের ঢাকা।

বুধবার একনেক বৈঠকে তিনটি মেট্রোরেল অনুমোদন করেছে সরকার। এগুলো হলো, এমআরটি-১, এমআরটি-৫ (উত্তর) ও এমআরটি-৫ (দক্ষিণ)। এমআরটি লাইন-১ এবং লাইন-৫ উত্তর রুটের সম্মিলিত সংশোধিত ব্যয় ২ লাখ ৪ হাজার ২৪৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা। মূল অনুমোদনের তুলনায় দুই প্রকল্পে ব্যয় বেড়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ৪৪৩ কোটি ২৭ লাখ টাকা। অন্যদিকে, লাইন-৫ দক্ষিণ রুটের ব্যয় অনুমোদন করা হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। এটি সম্পূর্ণ নতুন প্রকল্প। তিন প্রকল্পে মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪৯ হাজার ৭৪৭ কোটি ২ লাখ টাকা।

তবে নগরায়ণের ক্রমবর্ধমান চাহিদা বিবেচনায় সরকার শুধু এই তিনটি বা ঢাকাকেন্দ্রিক মেট্রোতেই থেমে থাকবে না। ঢাকা ও ঢাকার বাহিরে আরও মেট্রোরেল নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জানান পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, নগরায়ণ দ্রুত বাড়ছে এবং আধুনিক গণ-পরিবহণের চাহিদাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। গণ-পরিবহণের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ ও নগর চলাচল ব্যবস্থা আরও উন্নত করতে ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় আরও মেট্রোরেল নির্মাণ করা হবে।

এমআরটি লাইন-১ : দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেল এমআরটি লাইন-১ বিমানবন্দর থেকে কামালাপুর। প্রকল্পটি ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে ২০১৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে বাস্তবায়নের জন্য ২০১৯ সালের ১৫ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পায়। তবে নানা জটিলতায় নির্ধারিত সময়ে তা আর হয়ে ওঠেনি। এখন এটি শেষ করার জন্য সম্ভাব্য সময় ধরা হয়েছে ২০৩৩ সাল। প্রকল্পের ব্যয় মূল প্রাক্কলনের তুলনায় ১১৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ বেড়েছে। এখন প্রকল্পটির মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে এক লাখ ১৪ হাজার ৩৯৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) ঋণ ৮৩ হাজার ৮৪২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। বাকি টাকা সরকার দেবে। প্রকল্পটিতে ২০১৯ সালে বাংলাদেশ ০.৬ শতাংশ থেকে ০. শতাংশ সুদে ঋণ চুক্তি করে। প্রতিদিন গড়ে ৮ লাখ যাত্রী যাতায়াত করবে বলে প্রাথমিক প্রাক্কলন করা হয়েছে। মোট ২১টি স্টেশন করা হবে। এর মধ্যে ১২টি হবে পাতাল, বাকি ৭টি হলো উড়াল। নির্মাণকাজের সময় যানজট নিয়ন্ত্রণে প্রায় ২০ কিলোমিটার বিকল্প সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনাও প্রকল্পে যুক্ত করা হয়েছে।

এমআরটি-৫ (উত্তর) : ঢাকার হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার এমআরটি লাইন-৫ উত্তর রুটের মূল ব্যয় ছিল ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। সংশোধিত ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৮৯ হাজার ৮৪৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ বেড়েছে ৪৮ হাজার ৬০৯ কোটি ৮১ লাখ টাকা বা ১১৭ দশমিক ৮৭ শতাংশ। এর মধ্যে জাপানের ঋণ ৬৭ হাজার ৫১৮ কোটি ২৫ লাখ টাকা এবং সরকারের অর্থ ২২ হাজার ৩৩০ কোটি ১১ লাখ টাকা।

এ রুটের ১৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার হবে পাতাল এবং ৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার উড়ালপথ। মোট ১৪টি স্টেশনের মধ্যে ৯টি পাতাল ও ৫টি উড়াল। প্রকল্পটি ২০২৮ সালে শেষ করার লক্ষ্য থাকলেও সংশোধিত পরিকল্পনায় তা পিছিয়ে ২০৩২ সালের ডিসেম্বর করা হয়েছে। প্রকল্পটিতে এমআরটি-১ এর মতো ঋণের সুদের হার ০.৬ শতাংশ থেকে ০.৯ শতাংশে নমনীয় ঋণ নেওয়া হয়েছে। তবে নতুন চুক্তিতে এই হার বাড়তে পারে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কিছু জানানো হয়নি। প্রতিদিন গড়ে এই রুটে ১২ লাখ ৩০ হাজার যাত্রী যাতায়াত করবে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

এমআরটি-৫ (দক্ষিণ) : গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত ১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার এমআরটি লাইন-৫ (দক্ষিণ) রুটের ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। সম্পূর্ণ নতুন এই প্রকল্পের মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকারের অর্থ ১৫ হাজার ১৯৭ কোটি ৬৬ লাখ এবং এডিবি ও দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থায়ন ৩০ হাজার ৩০৬ কোটি ১০ লাখ টাকা।

এ রুটের ১৩ দশমিক ১০ কিলোমিটার হবে পাতাল এবং ৪ দশমিক ১৫ কিলোমিটার উড়ালপথ। মোট ১৫টি স্টেশনের মধ্যে ১১টি পাতাল ও ৪টি উড়াল। প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় ধরা হয়েছে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০৩৩ সালের আগস্ট পর্যন্ত। প্রতিদিন গড়ে এ রুটে ৯ লাখ ২৪ হাজার যাত্রী যাতায়াত করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

যোগাযোগব্যবস্থার পরিবর্তন আনতে মেট্রোরেলের বিকল্প না থাকলেও প্রকল্প বাস্তবায়নে নির্দিষ্ট দেশের কাছে বন্দি হয়ে যাচ্ছি কিনা সেটা নিয়েও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে দেখা দিয়েছে প্রশ্ন। এ বিষয়ে বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, মেট্রোরেলের দরপত্র প্রক্রিয়া ক্রমেই সীমিত টেন্ডারিংয়ের দিকে চলে যাচ্ছে। কারণ প্রকল্পের ডিজাইন এমনভাবে করা হচ্ছে এবং নির্মাণের ক্ষেত্রে ঠিকাদারদের নির্দিষ্ট ধরনের কনস্ট্রাকশন পদ্ধতি অনুসরণ করতে বলা হচ্ছে, যা মূলত জাপানি পেটেন্ট বা বিশেষায়িত প্রযুক্তিনির্ভর। ফলে এ ধরনের পদ্ধতিতে কাজ করার সক্ষমতা জাপানি ঠিকাদারদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। তিনি বলেন, ঢাকায় বিভিন্ন অর্থায়ন চুক্তির অধীনে বাস্তবায়নাধীন মেট্রোরেল প্রকল্পগুলোর ব্যয় ও ঠিকাদার নির্বাচন প্রক্রিয়ার মধ্যে তুলনা করা জরুরি।

তিনি বলেন, শুধু নির্মাণকাজের মাধ্যমেই এই বিশাল আর্থিক বোঝার শেষ হবে না। পাতাল মেট্রোরেল চালু হলে এর পরিচালন ব্যয় অত্যন্ত বেশি হবে। কারণ পাতাল রেলব্যবস্থায় সার্বক্ষণিক কৃত্রিম আলো, বায়ু চলাচল ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিকব্যবস্থা চালু রাখতে হয়।

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সরকারের একজন অতিরিক্ত সচিব বলেন, সব কাজেরই সমালোচনা থাকবে। তাই বলে কাজ করা যাবে না এমনটি নয়, জনগণের জন্য উন্নয়নমূলক কাজ করতে হবে। আমাদের নগরীর পরিবহণব্যবস্থায় মেট্রোর বিকল্প কিছু হতে পারে না। আন্ডারগ্রাউন্ডে মেট্রো নির্মাণ হলে মেনটেইন্যান্স করতে হবে এটা স্বাভাবিক। এজন্য খরচও হবে, কিন্তু আমাদের দেখতে হবে এর অর্থনৈতিক গুরুত্বও। শুধু আমরা নই, প্রতিবেশী ভারতে অনেক আগেই মেট্রো আস্তার জায়গা তৈরি করেছে। জাপানে মেট্রোতে ধাক্কাধাক্কি করে উঠার ভিডিও তো আমরা প্রায় সময়ই দেখি। আমাদের সব রুটে মেট্রোরেল চালু হলে আমরাও এমন ‘আনন্দদায়ক ধাক্কাধাক্কি’ এনজয় করতে পারব।