Image description

সম্প্রতি সংস্কার করা হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সংগ্রহশালা। এ সংস্কার প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন ব্যক্তিদের ছবি রাখা ও বাদ দেওয়া নিয়ে বিতর্ক ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যেই ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে সংগ্রহশালায় জামায়াতে ইসলামীর সাবেক ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতা আব্দুল মালেকের একটি ছবি।

ছবিটির নিচে ডাকসুর দেওয়া ক্যাপশনে লেখা হয়েছে—"শিক্ষা সেমিনারে বক্তব্য দেওয়া শেষে ফেরার পথে বিরোধীদের হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন এবং পরবর্তীতে মৃত্যুবরণ করেন।"

তবে ‘দ্য ডিসেন্ট’-এর যাচাইয়ে দেখা গেছে, এই দাবিটি অসত্য।

ঐ সময়ের সংবাদপত্র এবং সেদিনের প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ১৯৬৯ সালের ১২ আগস্ট ডাকসু আয়োজিত ওই সেমিনারে আব্দুল মালেক কোনো বক্তব্যই রাখেননি। সংবাদপত্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সভার প্রথম বক্তা ছিলেন ছাত্রনেতা সামসুদ্দোহা। তার বক্তব্য চলাকালেই ছাত্রসংঘের একদল কর্মী প্রতিবাদ ও হট্টগোল শুরু করলে মূলত সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়।

অর্থাৎ, মালেক নিজে বক্তব্য দিয়েছিলেন এবং 'বক্তব্য দেওয়া শেষে ফেরার পথে' তাঁর ওপর হামলা হয়েছিল— ডাকসুর ক্যাপশনে থাকা এই দাবির কোনো ঐতিহাসিক দালিলিক ভিত্তি নেই।

ডাকসু সংগ্রহশালার ছবিতে দেওয়া এই ক্যাপশনের সঙ্গে আব্দুল মালেকের মৃত্যুকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত কিছু অসত্য বয়ানের মিল রয়েছে। গত কয়েক দশকে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের বিভিন্ন প্রকাশনা, ওয়েবসাইট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আব্দুল মালেকের মৃত্যুর ঘটনাকে ঘিরে এসব বয়ান ধারাবাহিকভাবে প্রচার করা হয়েছে।

বিশেষ করে, গত জুন মাসে আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদের মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন নিবন্ধে এসব দাবি নতুন করে আলোচনায় আসে।

 

তোফায়েল আহমেদের মৃত্যু ঘিরে নতুন করে প্রচার হয় অসত্য বয়ানগুলো

বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পূর্ব সময়ে ইসলামী ছাত্রসংঘ ছিল জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন। ৬৯ সালের ১২ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সেমিনার আয়োজন উপলক্ষে ছাত্রসংঘ এবং ছাত্রলীগ ও অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের মধ্যে এক সংঘর্ষের ঘটনায় আব্দুল মালেক গুরুতর আহত হন। এরপর চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৫ আগস্ট তিনি মারা যান।

আব্দুল মালেকের হত্যকাণ্ডের জন্য জামায়াতে ইসলামী ও এর অঙ্গ সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে যাদেরকে দায়ী করা হয় তাদের মধ্যে প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা অন্যতম। দলীয় বিভিন্ন প্রকাশনা, ওয়েবসাইট, মতামত নিবন্ধ, ইউটিউব ভিডিও এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও দীর্ঘদিন ধরে এই বয়ান প্রচারিত হয়ে আসছে।

জামায়াত ও শিবির সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রকাশনা ঘেঁটে আব্দুল মালেকের হত্যায় সরাসরি তোফায়েল আহমদকে দায়ী করে প্রচারিত বয়ানের সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু দাবি চিহ্নিত করে সেগুলো যাচাই করে দেখার চেষ্টা করেছে দ্য ডিসেন্ট। এই বয়ানের পক্ষে যেসব দাবিকে ‘তথ্য’ আকারে তুলে ধরা হয় সেরকম ৪টি কথিত তথ্য হল:

১। তোফায়েল আহমেদ মালেক হত্যা মামলার আসামি ও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন।

২। ঘটনার পরদিন জাতীয় পত্রিকায় তোফায়েল আহমেদের হাতে হকিস্টিক বা ক্রিকেট ব্যাটসহ ছবি প্রকাশিত হয়েছিল।

৩। আব্দুল মালেক ১২ আগস্টের টিএসসি সেমিনারের প্রধান বক্তা ছিলেন

৪। আহত মালেককে চিকিৎসার জন্য পশ্চিম পাকিস্তানে পাঠানো হয়েছিল

তবে এই দাবিগুলো তোফায়েলের মৃত্যুর পর নতুন করে সামাজিক মাধ্যমের আলোচনায় উঠে এলেও এগুলো সাম্প্রতিক নয়। বহু দশক ধরে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের বিভিন্ন প্রকাশনায় মালেক হত্যার জন্য তোফায়েল আহমেদকে দায়ী করে এসব দাবি প্রচার করা হয়।

তবে দ্য ডিসেন্ট যাচাই করে এই ৪টি দাবিকে অসত্য এবং বিভ্রান্তিকর বলে প্রমাণ পেয়েছে।

 

মালেক হত্যা: জামায়াত-শিবিরের প্রকাশনায় বহু বছর ধরে প্রচলিত অসত্য বয়ান

দ্য ডিসেন্টের পর্যালোচনায় দেখা যায়, আব্দুল মালেক হত্যাকাণ্ড নিয়ে বিভিন্ন প্রকাশনা, ভিডিও, ওয়েবসাইট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উপরে উল্লিখিত ৪টি দাবি বহু বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে প্রচার করা হয়েছে। বিভিন্ন সূত্রে ভাষা ও বর্ণনায় কিছু পার্থক্য থাকলেও মূল বক্তব্য প্রায় একই।

দাবি ১: তোফায়েল আহমেদ মালেক হত্যা মামলার আসামি ও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইসলামী ছাত্রশিবির কর্তৃক ২০০২ সালে প্রকাশিত ‘প্রেরণার বাতিঘর’ শীর্ষক শহীদ আব্দুল মালেক স্মরণিকায় এক সাক্ষাৎকারে মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম দাবি করেন, ১২ আগস্টের টিএসসি অনুষ্ঠানে ছাত্রসংঘপন্থীদের বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি এবং পরে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

সাক্ষাৎকারে নুরুল ইসলাম দাবি করেন, ১৯৬৯ সালে তৎকালীন নূর খান শিক্ষা কমিশনের প্রস্তাবিত শিক্ষানীতি নিয়ে আলোচনার জন্য গঠিত তিন সদস্যের বিশেষ ছাত্র প্রতিনিধি দলের তিনি সদস্য ছিলেন। প্রতিনিধি দলের অন্য দুই সদস্য ছিলেন শহীদ আবদুল মালেক ও মাসুদ আলী।

তিনি আরও দাবি করেন, ১৯৬৫ সালে শহীদ আবদুল মালেকের সঙ্গে একই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন।

ওই স্মরণিকায় উল্লেখ করা হয়েছে তিনি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট (EVP) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

 

সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, টিএসসির মঞ্চে “তোফায়েল আহমেদ, আবদুর রাজ্জাক, শামসুদ্দোহা ও মোস্তফা কামাল হায়দার” উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, “এরা সবাই শহীদ মালেক হত্যা মামলার আসামী।”

ছাত্রসংঘ নেতা আব্দুল মালেকের হত্যাকারী হিসেবে তোফায়েল আহমেদকে দাবি করে বাঁশেরকেল্লার এক্স অ্যাকাউন্টে ২০১৯ সালের ১৫ আগস্ট প্রকাশিত একটি পোস্টে লেখা হয়, ১৯৬৯ সালের ১২ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তব্য দেওয়ার পর বামপন্থী নেতাদের হামলায় আব্দুল মালেক নিহত হন।

পোস্টটির সঙ্গে সংঘর্ষের একটি পুরোনো সংবাদপত্রের ছবিও যুক্ত করা হয়। সেখানে ছবিতে থাকা কয়েকজন ব্যক্তিকে তোফায়েল আহমেদ, রাশেদ খান মেনন ও হাসানুল হক ইনু হিসেবে নাম হিসেবে উল্লেখ করে চিহ্নিত করা হয়েছে।

২০২৫ সালের ৫ অক্টোবর কিশোরকণ্ঠ ২.০ নামের একটি এক্স অ্যাকাউন্টের পোস্টেও দাবি করা হয়, ১৯৬৯ সালে রেসকোর্স ময়দানে তোফায়েল আহমেদ আব্দুল মালেককে হত্যা করেন।

২ জুন অনলাইন সংবাদমাধ্যম বাংলা এডিশনে প্রকাশিত ‘খুনি তোফায়েল আহমেদের মৃত্যু: ইতিহাসের দায়মোচন’ শীর্ষক একটি মতামত নিবন্ধে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের সাবেক গবেষক মো. রেযাউল করিম দাবি করেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র ও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতা আব্দুল মালেককে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যার পৈশাচিক ঘটনায় তোফায়েল আহমেদ এবং হাসানুল হক ইনুর সরাসরি অংশগ্রহণের কথা আজ আর কারও অজানা নয়।”

 

লেখকের ভাষ্যমতে, সেমিনার শেষে তোফায়েল আহমেদ, হাসানুল হক ইনু ও রাশেদ খান মেননসহ তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতারা তাকে একা পেয়ে হামলা করেন। সেই হামলার ফলেই তার মৃত্যু ঘটে।

২০২৫ সালের ১৬ আগস্ট ইসলামী ছাত্রশিবিরের ইউটিউব চ্যানেলে “শহীদ আবদুল মালেক ভাইয়ের শাহাদাতের প্রেক্ষাপট ও ঘটনাপ্রবাহ জানতে ডকুমেন্টারিটি দেখে নিতে পারেন” শিরোনামে একটি ভিডিওতে তোফায়েল আহমেদসহ আরো কয়েকজনকে আবদুল মালেকের 'খুনি' হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভিডিওতে বলা হয়, "এটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত সংগঠিত আর পরিচালিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন বামপন্থী এবং ধর্মনিরপেক্ষ ছাত্রনেতাদের হাতে। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, ছাত্রলীগ আর ছাত্র ইউনিয়নের ক্যাডাররা যৌথভাবে ফাঁদ পেতেছিল মালেকের জন্য। এই হামলার নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালীন ডাকসুর ভিপি সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক তোফায়েল আহমেদ"

 

ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সেক্রেটারি এস এম ফারহাদ ২০২৫ সালের ৫ অক্টোবর একটি ফেসবুক পোস্টে আব্দুল মালেককে "পরিকল্পিত শিক্ষার্থী হত্যাকাণ্ডের" শিকার বলে উল্লেখ করেন।

সর্বশেষ ইসলামী ছাত্রশিবির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মহিউদ্দিন খান তার ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডি থেকেও তোফায়েল আহমেদের মৃত্যুর পর স্ট্যাটাসে লেখেন, "তোফায়েল হইলো শহীদ আব্দুল মালেকের খুনি এবং আওয়ামী ফ্যাসিজমের ফ্রন্টলাইনার। আল্লাহ তাকে তার কাজের প্রতিদান বুঝিয়ে দিন।”

তোফায়েল আহমেদের মৃত্যুর পর দেওয়া ওই পোস্টে তিনি দাবি করেন,তোফায়েল আহমেদ ও হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বে সংঘটিত "পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডে" আব্দুল মালেক নিহত হন। তিনি ঘটনাটিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে "প্রথম সন্ত্রাসী ও পরিকল্পিত শিক্ষার্থী হত্যাকাণ্ড" বলেও উল্লেখ করেন।

এর বাইরে ওয়াজ মাহফিলেও আব্দুল মালেকের হত্যাকারী হিসেবে তোফায়েল আহমেদের নাম উল্লেখ করেন ড. এনায়েত উল্লাহ আব্বাসী।

জামায়াত-শিবির-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রকাশনা, ভিডিও, মতামত নিবন্ধ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে তোফায়েল আহমেদকে আব্দুল মালেক হত্যা মামলার আসামি ও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

তবে দ্য ডিসেন্টের পর্যালোচনায় দেখা যায়, আব্দুল মালেকের আহত হওয়া থেকে মৃত্যুর পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত সমসাময়িক সংবাদপত্রগুলোতে তোফায়েল আহমেদকে হামলাকারী বা হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি।

 

সে সময়ের দৈনিক আজাদ, পাকিস্তান অবজার্ভার এবং মর্নিং নিউজ-এ প্রকাশিত ১৩ আগস্টের প্রতিবেদনে তোফায়েল আহমেদকে ডাকসুর সহ-সভাপতি ও ওই দিনের সভার সভাপতি হিসেবে উল্লেখ করা হলেও কোথাও তাকে হামলাকারী বা হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি।

দৈনিক আজাদ-এর ১৩ আগস্টের প্রতিবেদনে পুরো ঘটনার একটি দীর্ঘ বর্ণনা পাওয়া যায়। কিন্তু তোফায়েল আহমেদ এই হামলার সাথে সংশ্লিষ্ট এমন কোনো বর্ণনা পাওয়া যায়না। এমনকি সেখানে বলা হয়, রেসকোর্সের দিকে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার পর প্রতিবাদকারী শিক্ষার্থীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলে "জনাব তোফায়েল আহমদের সভাপতিত্বে আবার আলোচনা সভা শুরু হয়।"

 

মর্নিং নিউজ-এর ১৩ আগস্টের প্রতিবেদনে ঘটনার সংক্ষিপ্ত ইংরেজি বর্ণনা পাওয়া যায়। ধাওয়া পাল্টা এবং সংঘর্ষের ঘটনার কথা থাকলেও তোফায়েল আহমেদ সেখানে হামলায় অংশ নিয়েছেন এমন কিছু নেই।

এছাড়া একই খবরে তৎকালীন ছাত্রসংঘ সভাপতি মতিউর রহমান নিজামীর একটি বিবৃতির কথাও উল্লেখ করা হয় এবং সেখানে তিনি হামলার জন্যে ইপসু বা বামপন্থী সংগঠন ইস্ট পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের 'সন্ত্রাসীদের' দায়ী করেন।

উল্লেখ্য, তৎকালীন ডাকসুর সহসভাপতি তোফায়েল আহমেদ ১৯৬৯-১৯৭০ সালে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন, সাধারণ সম্পাদক ছিলেন আ স ম আব্দুর রব।

 

একইভাবে Pakistan Observer-এর ১৩ আগস্টের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সংঘর্ষের পর শিক্ষার্থীরা আবার হলরুমে ফিরে এসে সেমিনারের কার্যক্রম চালিয়ে যায়। প্রতিবেদনে শিক্ষকেদের উপস্থিতি এবং তোফায়েল আহমেদের বক্তব্যও উদ্ধৃত করা হয়। তবে সেখানেও তাকে হামলাকারী বা আব্দুল মালেক হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি।

শুধু ১৩ আগস্টের প্রতিবেদনই নয়, ১৩ থেকে ২৬ আগস্ট পর্যন্ত দৈনিক আজাদ-এ প্রকাশিত ধারাবাহিক সংবাদ, উপসম্পাদকীয় ও প্রতিক্রিয়াগুলো পর্যালোচনা করেও তোফায়েল আহমেদকে আব্দুল মালেক হত্যাকাণ্ডের জন্য ব্যক্তিগতভাবে দায়ী করা হয়েছে এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

এ ছাড়া ১৯৬৯ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর দৈনিক আজাদ-এ প্রকাশিত মালেক হত্যা মামলার গ্রেপ্তারসংক্রান্ত প্রেসনোটে খোন্দকার মোহাম্মদ কামাল, সৈয়দ মোরশেদ কামাল এবং এ এস এম মাহবুবুল হকের নাম থাকলেও তোফায়েল আহমেদের নাম পাওয়া যায়নি।

 

 

সেদিনের দুজন প্রত্যক্ষদর্শী ছাত্রনেতার ভাষ্য

সে সময়ে ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতা হিসেবে ১২ আগস্ট টিএসসিতে ছিলেন চৌধুরী মঈনুদ্দীন। সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে তাকে মালেক হত্যায় তোফায়েল যুক্ত থাকার ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি সরাসরি বলেন, "না, তোফায়েল হত্যাকারী নয়।"

তার বর্ণনা অনুযায়ী, সংঘর্ষের প্রথম পর্যায়ে প্রতিপক্ষ পিছু হটলেও পরে রেসকোর্স এলাকায় ছাত্রসংঘপন্থীদের ওপর পাল্টা হামলা হয়। সেখানেই আব্দুল মালেক গুরুতর আহত হন এবং পরে হাসপাতালে মারা যান।

 

ঘটনার দিন টিএসসিতে উপস্থিত থাকা ছাত্রনেতা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্য ডিসেন্ট। ঘটনার পরদিন ছাত্রসংঘের বিবৃতির প্রতিবাদ জানিয়ে তোফায়েল আহমেদের সাথে যে যৌথ বিবৃতিটি দেওয়া হয়েছিল, তাতে স্বাক্ষরকারী অন্যতম নেতা ছিলেন তিনি। খবর অনুযায়ী, ছাত্রসংঘ তাদের বিবৃতিতে উক্ত সেমিনারে বক্তব্য দিতে দাবি করায় তাদের উপর আক্রমণ হয়েছে বলা হয়েছে।

 

 

আব্দুল মালেক হত্যাকাণ্ডে তোফায়েল আহমেদের যুক্ত থাকার দাবিটি সরাসরি নাকচ করে দিয়ে অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বলেন, "তোফায়েলের সঙ্গে আমার আদর্শিক ও মতাদর্শগত অনেক পার্থক্য আছে। রক্ষীবাহিনীর রাজনৈতিক প্রধান হিসেবে তার ভূমিকা নিয়েও আমার প্রশ্ন আছে। কিন্তু এই ব্যাপারে আমি কোনো অসত্য কথা বলব না। ওই দিন তোফায়েল আহমেদ বা আমাদের মতো কেন্দ্রীয় নেতারা কেউই মারধরের ওই ঘটনায় অংশ নিতে রেসকোর্সে যাননি।"

ঘটনার সূত্রপাত সম্পর্কে এই প্রত্যক্ষদর্শী জানান, সেদিন টিএসসিতে ইসলামী ছাত্রসংঘের কর্মীরাই প্রথম সাইকেলের চেইন ও চেয়ার দিয়ে অতর্কিত হামলা চালিয়েছিল, যা তাদের কল্পনারও বাইরে ছিল। এর প্রতিক্রিয়ায় সাধারণ ছাত্ররা উত্তেজিত হয়ে তাদের রেসকোর্স ময়দানের (রমনা কালী মন্দিরের পাশে) দিকে ধাওয়া করে।

মাহবুব উল্লাহ আরও স্পষ্ট করেন যে, ওই ঘটনাটি কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যক্তিকে টার্গেট করে হয়নি। তিনি বলেন, "আমরা তো মালেককে চিনতামই না, তার নামও জানতাম না। পরে তার পরিবারের কাছ থেকে নাম জানতে পারি। আর পরদিন পত্রিকায় যে ছবি ছাপা হয়েছিল, সেটা দেখেও আমরা শনাক্ত করতে পারিনি যে রমনা মন্দিরের পাশে আসলে কারা ওই ঘটনা ঘটিয়েছিল। সাধারণ ছাত্ররাই উত্তেজিত হয়ে ওই কাজ করেছিল।"

 

পরিবার বলছে: মামলার নথি থাকার সম্ভাবনা কম

বর্তমানে মানারাত ইন্টারন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার হিসেবে কর্মরত আব্দুল মালেকের ভাতিজা আলমগীর হোসাইনের সঙ্গেও কথা বলেছে দ্য ডিসেন্ট। তিনি জানান, ১৯৬৯ সালের ঘটনার কোনো মামলা বা তদন্ত-সংক্রান্ত নথি বর্তমানে পরিবারের কাছে সংরক্ষিত আছে বলে তার জানা নেই।

দ্য ডিসেন্টকে তিনি বলেন, “এটা তো ১৯৬৯ সালের ঘটনা। মালেক চাচা ছিলেন সবার ছোট। ১৯৬৯ সালে তাকে হত্যার পর পরিবারে দীর্ঘদিন ভীতি কাজ করেছে। শুনেছি, সেই আতঙ্কে আমার দাদিও একসময় বলেছিলেন, পরিবারের কাউকে আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো উচিত হবে না। এই পরিস্থিতিতে অনেক নথিপত্রও সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি।

তিনি জানান, আব্দুল মালেকের পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে এখন আর কেউ বেঁচে নেই। পরিবারের জীবিত সদস্যদের মধ্যে কেবল একজন বোন রয়েছেন, যার বয়সও অনেক বেশি। ফলে ঘটনার প্রত্যক্ষ তথ্য জানাতে পারেন এমন পরিবারের সদস্য বর্তমানে প্রায় নেই বললেই চলে।

তিনি আরও বলেন, পরিবারের পক্ষ থেকে মামলার নথি উদ্ধার করার চেষ্টা করা হবে। তবে এত দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ায় সেগুলো পাওয়া যাবে কি না, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন।

 

দাবি ২: ঘটনার পরদিন জাতীয় দৈনিকে তোফায়েল আহমেদ ও আ স ম আবদুর রবের হাতে হকিস্টিক বা ক্রিকেট ব্যাটসহ ছবি প্রকাশিত হয়েছিল

২০২৫ সালের ১৪ আগস্ট নয়া দিগন্ত-এ আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু বকর রফিক ‘শহীদ আব্দুল মালেকের শেষ দিনগুলো’ শিরোনামের কলামে দাবি করেন, আব্দুল মালেকের বক্তব্যের জবাব দিতে না পেরে তোফায়েল আহমেদ ও তার সহযোগীরা আগে থেকেই হকিস্টিক ও ক্রিকেট ব্যাট নিয়ে টিএসসিতে অবস্থান নেন।

তিনি আরও লেখেন, ঘটনার পরদিন জাতীয় দৈনিকগুলোতে তোফায়েল আহমেদ ও আ স ম আবদুর রবের হাতে হকিস্টিক ও ক্রিকেট ব্যাটসহ ছবি প্রকাশিত হয়েছিল।

জামায়াত-সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্ম বাঁশেরকেল্লা-র এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টে ২০১৯ সালের ১৫ আগস্ট প্রকাশিত একটি পোস্টেও একটি পুরোনো সংবাদপত্রের ছবি ব্যবহার করে দাবি করা হয়, ছবিতে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে তোফায়েল আহমেদ, রাশেদ খান মেনন ও হাসানুল হক ইনুকে দেখা যাচ্ছে এবং তারা আব্দুল মালেকের ওপর হামলার সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

 

পরবর্তী সময়ে একই ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন পোস্টে তোফায়েল আহমেদ ও আ স ম আবদুর রবের হাতে হকিস্টিক বা ক্রিকেট ব্যাট থাকার প্রমাণ হিসেবে প্রচার করা হয়।

দ্য ডিসেন্টের পর্যালোচনায় দেখা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে ছবিটি প্রচার করা হচ্ছে, তার ক্যাপশন সমসাময়িক সংবাদপত্রে প্রকাশিত মূল ক্যাপশনের সঙ্গে মেলে না।

একই সঙ্গে ছবিতে থাকা ব্যক্তিদের তোফায়েল আহমেদ বা আ স ম আবদুর রব হিসেবে শনাক্ত করার মতো নির্ভরযোগ্য সমসাময়িক প্রমাণও পাওয়া যায়নি।

 

বরং ১৩ আগস্ট ১৯৬৯ সালে প্রকাশিত দৈনিক আজাদের মূল ছবি, ক্যাপশন এবং একই দিনের অন্যান্য ছবির সঙ্গে তুলনা করলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত দাবির সঙ্গে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অমিল পাওয়া যায়।

ঘটনার পরদিন ১৩ আগস্ট দৈনিক আজাদ-এর প্রথম পাতায় এ সংক্রান্ত একাধিক ছবি প্রকাশিত হয়েছিল। ছবিটির ক্যাপশন ছিল, "ডাকসুর উদ্যোগে আয়োজিত নয়া শিক্ষানীতির উপর সেমিনারে এক শ্রেণীর ছাত্র চেয়ার লইয়া সভা পণ্ড করিতে অগ্রসর হইতেছে।" একই দিনের চতুর্থ পাতায় এ ঘটনার আরো দুটি ছবি ছাপানো হয়।

যার একটির ক্যাপশন ছিল, "শিক্ষানীতি সম্পর্কিত সেমিনারে সংঘর্ষের সময় জনৈক প্রহৃত ছাত্রকে শায়িত দেখা যাইতেছে।" আরেকটি ছবির ক্যাপশন ছিল, "ডাকসুর উদ্যোগে আয়োজিত নয়া শিক্ষানীতির উপর সেমিনারে গোলযোগের এক পর্যায়ে একদল ছাত্র রেসকোর্স মাঠের মধ্য দিয়া ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটিতেছে।"

কোথাও ছবিতে থাকা ব্যক্তিদের পরিচয় উল্লেখ করা হয়নি কিংবা তাদের মধ্যে তোফায়েল আহমেদ বা আ স ম আবদুর রব রয়েছেন এমন কোনো তথ্যও দেওয়া হয়নি।

 

সেদিন হাফ হাতা শার্ট পরেছিলেন তোফায়েল

একই দিনের দৈনিক আজাদ-এর ষষ্ঠ পাতায় প্রকাশিত আরেকটি ছবিতে ডাকসুর সহ-সভাপতি তোফায়েল আহমেদকে আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্য দিতে দেখা যায়। ছবির ক্যাপশনে তার পরিচয় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই ছবিতে তোফায়েল আহমেদকে হাফ হাতা শার্ট পরা অবস্থায় দেখা যায়।

অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে সংঘর্ষের ছবিটি প্রচার করা হয়, সেখানে যাকে তোফায়েল আহমেদ বলে দাবি করা হচ্ছে, তাকে ফুল হাতা পোশাক পরিহিত অবস্থায় দেখা যায়।

 

 

শুধু পোশাকের এই পার্থক্যই নয়, সমসাময়িক কোনো সংবাদপত্রের ক্যাপশন বা প্রতিবেদনে ওই ব্যক্তির পরিচয় তোফায়েল আহমেদ হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি।

এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যেম প্রকাশিত ছবি এবং হামলাকারীদের যেভাবে চিহ্নিত করা হচ্ছে, সেটিরও পক্ষে কোনো সূত্রের উল্লেখ সেখানে নেই।

 

দাবি ৩: ১২ আগস্টের টিএসসি সেমিনারে আব্দুল মালেক প্রধান বক্তা ছিলেন

ইসলামী ছাত্রশিবিরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঘোষিত দিবসসমূহ’ অংশে একটি পাতায় ১৫ আগস্টকে ‘ইসলামী শিক্ষা দিবস’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

সেখানে দাবি করা হয়, ১৯৬৯ সালের ১২ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় ছাত্রসংঘ নেতা আব্দুল মালেকের বক্তব্যের পর তোফায়েল আহমদ, রাশেদ খান মেননসহ কয়েকজনের নেতৃত্বে তার ওপর হামলা চালানো হয়।

২০২৫ সালের ১৪ আগস্ট নয়া দিগন্তে আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু বকর রফিক ‘শহীদ আব্দুল মালেকের শেষ দিনগুলো’ শিরোনামের কলামে লিখেন,“১৯৬৯ সালের ১২ আগস্ট নূর খান শিক্ষা কমিশন নিয়ে আয়োজিত একটি বিতর্ক অনুষ্ঠানে আব্দুল মালেক ছিলেন পক্ষে প্রধান বক্তা এবং তোফায়েল আহমেদ ও আ স ম আবদুর রব ছিলেন বিপক্ষের বক্তা।

এর বাইরে বাংলা টিভির একটি ভিডিও এবং বাঁশেরকেল্লাসহ কয়েকটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে দাবি করা হয়েছে, ১২ আগস্টের টিএসসি সেমিনারে আব্দুল মালেক প্রধান বক্তা ছিলেন এবং তার বক্তব্য চলাকালে বা বক্তব্যের পর তার ওপর হামলা চালানো হয়।

দ্য ডিসেন্টের পর্যালোচনায় দেখা যায়, সমসাময়িক কোনো সংবাদপত্রে ১২ আগস্টের টিএসসি সেমিনারে আব্দুল মালেককে প্রধান বক্তা হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। বরং পত্রিকা মারফত বক্তা হিসেবে সামসুদ্দোহার কথাই জানা যায় এবং সেখানে তোফায়েল আহমেদ সভাপতি ছিলেন, বিপক্ষের বক্তা নন।

১৩ আগস্ট প্রকাশিত দৈনিক আজাদ-এ বলা হয়, ডাকসুর ওই আলোচনা সভার প্রথম বক্তা ছিলেন শামসুদ্দোহা। তার বক্তব্য চলাকালেই একদল শিক্ষার্থীর প্রতিবাদ থেকে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়।

একই তথ্য পাওয়া যায় Pakistan Observer ও Morning News-এর ১৩ আগস্টের প্রতিবেদনে। দুটি পত্রিকাতেও বলা হয়, শামসুদ্দোহার বক্তব্য চলাকালেই গোলযোগ শুরু হয়। সমসাময়িক সংবাদপত্রের কোনোটিতেই আব্দুল মালেককে ওই দিনের প্রধান বক্তা হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি।

পূর্বে উল্লেখিত ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতা চৌধুরী মুঈনউদ্দিনের সাম্প্রতিক বক্তব্যেও একই ধরনের তথ্য পাওয়া যায়।

ঘটনার সময় ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতা ছিলেন চৌধুরী মুঈনউদ্দীন। সাম্প্রতিক সে সাক্ষাৎকারে তোফায়েল আহমেদ আব্দুল মালেক হত্যাকারী নন এই বক্তব্যেরর পাশাপাশি পুরো ঘটনার সংক্ষিপ্ত পূর্বাপর তুলে ধরেন তিনি।

সেখানে তিনি বলেন, মালেকের যে বক্তৃতার কথা বিভিন্ন লেখায় উল্লেখ করা হয়, সেটি ১২ আগস্টের টিএসসি সেমিনারের নয়; বরং প্রায় এক সপ্তাহ আগে National Institute of Public Administration (NIPA)-এ নূর খান শিক্ষা কমিশন নিয়ে আয়োজিত একটি বিতর্কের। তার ভাষ্যমতে, ওই বিতর্কে আব্দুল মালেক বক্তব্য দেন।

সে বিতর্কে আব্দুল মালেকের ভাষণ বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায় চৌধুরী মুঈনউদ্দিনের আত্মজীবনীমূলক বই “পৃথিবী গোলাবের বুকে"।

বইয়ের ১৯৫ পৃষ্ঠায় তিনি লিখেন, "এরপর শুরু হলো এই শিক্ষানীতির ওপর জনমত যাচাই। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আয়োজন করা হলো সেমিনার ও বিতর্কের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকেও আগস্টের ২ তারিখে এমন এক বিতর্কসভার আয়োজন করা হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের 'ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন' (NIPA) ভবনে। ইসলামী ছাত্রসংঘের পক্ষ থেকে বিতর্কে অংশগ্রহণ করার জন্য ঢাকা শহর ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি আব্দুল মালেকের নাম দেওয়া হলো। সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরিহিত নিতান্ত সাদাসিধে মফস্বল শহর থেকে আসা আব্দুল মালেক যেকোনো উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারবেন, এটা প্রতিপক্ষরা ধারণাও করতে পারেনি। অন্য বক্তাদের শেষে আব্দুল মালেক যখন দাঁড়ালেন, তখন সভায় বসে থাকা বিভিন্ন ছাত্রদলের নেতারা নিশ্চয়ই নাক সিঁটকাচ্ছিলেন। কিন্তু আব্দুল মালেক শুরু করতেই শ্রোতাদের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। নূর খানের শিক্ষা রিপোর্টের প্রধান বিষয় ছিল দেশের সংহতি রক্ষা করে এক জাতি গঠন করতে হলে শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি হতে হবে একটা কমন সেট অব ভ্যালুজ । কিন্তু বিপক্ষের বক্তারা যাদের মাথায় ইতোমধ্যেই বিচ্ছিন্নতার বিষ দানা বেঁধে বসেছিল, তারা এটাকে বুঝলেন, 'সিঙ্গেল সেট অব ভ্যালুজ ' হিসেবে। ফলে প্রায় সব কজন বক্তাই এর চুটিয়ে বিরোধিতা করলেন। বললেন, পরে ১২ আগস্ট ডাকসুর টিএসসি সেমিনারে শামসুদ্দোহার বক্তব্য চলাকালে গোলযোগ শুরু হয় এবং পরবর্তী সংঘর্ষে রেসকোর্স এলাকায় আব্দুল মালেক আহত হন।"

 

নয়া দিগন্তে কলাম লেখা আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু বকর রফিকের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলেছে দ্য ডিসেন্ট। নিজের লেখায় তোফায়েল আহমেদকে দায়ী করার তথ্যসূত্র সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি স্বীকার করেন যে, ঘটনার দিন তিনি উপস্থিত ছিলেন না এবং তথ্যগুলো মূলত লোকমুখে শোনা ও দলীয় কর্মীদের থেকে প্রাপ্ত।

তিনি দ্য ডিসেন্টকে বলেন, "আমি ওই প্রোগ্রামে ছিলাম না। আমি দেশের বাড়িতে ছিলাম। আমি পত্র-পত্রিকা থেকে যা দেখেছি এবং সংগঠনের সম্পর্কিত ভাইদের থেকে যা শুনেছি, তার ভিত্তিতেই লিখেছি।"

১৯৬৯ সালের সমসাময়িক পত্রিকায় প্রকাশিত মালেক হত্যা মামলায় গ্রেফতারকৃত আসামিদের (খোন্দকার মোহাম্মদ কামাল, সৈয়দ মোরশেদ কামাল এবং এ এস এম মাহবুবুল হক) তালিকায় তোফায়েল আহমেদের নাম না থাকার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ড. রফিক বলেন, "মামলায় তার নাম ছিল কি না বা তাকে আটক করা হয়েছে কি না, তা আমার জানা নেই। কিন্তু এটা একেবারে 'টক অব দ্য টাউন' ছিল যে কারা মারছে। কারা এতে ইনভলভ ছিল, তা নিয়ে আলোচনা ছিল।"

ভাইরাল হওয়া ছবিতে তোফায়েল আহমেদের হাফ হাতা শার্ট পরা থাকার বিপরীতে হামলাকারীর ফুল হাতা শার্ট পরা থাকার অসংগতির বিষয়েও তার কাছে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছিল না। তিনি বারবার এটিকে সে সময়কার 'টক অব দ্য টাউন' বা লোকমুখে প্রচলিত আলোচনা হিসেবেই উল্লেখ করেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ঘটনায় ডেইলি স্টারের বর্তমান সম্পাদক মাহফুজ আনামের জড়িত থাকার যে দাবি করা হয়, সে প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ড. রফিক জানান, এ বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। ঘটনার আরও সঠিক তথ্যের জন্য তিনি সে সময়কার ছাত্র ইউনিয়ন নেতা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।

 

দাবি ৪: আহত আব্দুল মালেককে উন্নত চিকিৎসার জন্য পশ্চিম পাকিস্তানে পাঠানো হয়েছিল

২০২৫ সালের ৩১ মে 'বাংলা টিভি' (Bangla TV) নামের একটি ইউটিউব চ্যানেলে "মৃ-ত্যু শয্যায় আজ কি সেই আব্দুল মালেকের কথা মনে পরে তোফায়েল আহমেদের?" শিরোনামে একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়।

ভিডিওটিতে দাবি করা হয়, ১৯৬৯ সালের ১২ আগস্টের সেমিনারে যুক্তিতর্কে হেরে গিয়ে তোফায়েল আহমেদ, হাসানুল হক ইনু ও রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বে আব্দুল মালেকের ওপর রেসকোর্স ময়দানে হামলা চালানো হয়। লাঠি, হকিস্টিক ও ইট দিয়ে তার মাথায় আঘাত করা হয়।

ভিডিওটির ১ মিনিট ৪৫ সেকেন্ডের পর দাবি করা হয়, আহত আব্দুল মালেককে উন্নত চিকিৎসার জন্য তৎকালীন 'পশ্চিম পাকিস্তানে' পাঠানো হয়েছিল। সেখানে তিনি শাহাদাত বরণ করেন।

তবে দ্য ডিসেন্টের পর্যালোচনায় দেখা যায়, সমসাময়িক সংবাদপত্রে এই দাবির কোনো সমর্থন পাওয়া যায়নি। বরং ১৯৬৯ সালের সমসাময়িক জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত ধারাবাহিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, সংঘর্ষে আহত হওয়ার পর আব্দুল মালেকের চিকিৎসা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই চলছিল এবং সেখানেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

১৯৬৯ সালের ১৬ আগস্ট প্রকাশিত ইংরেজি দৈনিক Morning News-এর "Malek Expires" শিরোনামের প্রতিবেদনে বলা হয়, সংঘর্ষে গুরুতর আহত আব্দুল মালেক ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান।

এছাড়াও দৈনিক আজাদ, Pakistan Observer তিনটি সমসাময়িক জাতীয় সংবাদপত্রের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, আব্দুল মালেকের চিকিৎসা ঢাকাতেই চলেছিল।

ফলে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য পশ্চিম পাকিস্তানে পাঠানো হয়েছিল এমন দাবির পক্ষে সমসাময়িক কোনো দালিলিক সমর্থন পাওয়া যায়নি। বরং সমসাময়িক সংবাদপত্রের তথ্যের সঙ্গে এই দাবি সাংঘর্ষিক।

 

আদালত-থানায় খুঁজেও মেলেনি নথি

মামলার নথি সংগ্রহের জন্য দ্য ডিসেন্ট ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের মহাফেজখানা, মহানগর দায়রা আদালত, শাহবাগ থানা এবং রমনা থানায় যোগাযোগ করে। তবে কোনো প্রতিষ্ঠান থেকেই মামলার নথি পাওয়া যায়নি।

থানায় কর্মরত ডিউটি অফিসার ও মুন্সি জানান, এত পুরোনো মামলার নথি থানায় সংরক্ষণ করা হয় না।

অন্যদিকে, আদালতের মহাফেজখানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীরা জানান, এত পুরোনো মামলার নথি সাধারণত আদালতেও সংরক্ষিত থাকে না। তবে মামলাটি কোন আদালতে বিচারাধীন ছিল, সেই তথ্য জানা গেলে নথি অনুসন্ধানের চেষ্টা করা যেতে পারে। এ বিষয়ে তারা ভুক্তভোগীর পরিবারের সদস্য অথবা ঘটনার সময় সংশ্লিষ্ট থানায় দায়িত্বে থাকা কোনো কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।