অল্প পুঁজিতে ও কম পরিশ্রমে বেশি লাভ হওয়ায় দিনাজপুরে বাড়ছে কলা চাষ। জেলার ১৩ উপজেলাতেই কমবেশি কলার চাষ হয়। তবে মেহের সাগর কলা চাষে নীরব বিপ্লব ঘটেছে জেলার বীরগঞ্জ ও কাহারোল উপজেলায়। অনুকূল মাটি, আবহাওয়া আর লাভের কারণে স্থানীয় কৃষকদের মাঝে এই আবাদে আগ্রহ বাড়ছে।
তবে হিমাঘার অভাবে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ কলা নষ্ট হচ্ছে, যা এই সম্ভাবনাময় খাতের বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া গেলে জাতীয় ও স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এই অঞ্চলের কলা- এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে বাড়ায় প্রান্তিক কৃষকরা কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
জেলার কাহারোল উপজেলার দশমাইল মোড়ে প্রতিবছরের জুলাইয়ে বসে উত্তরাঞ্চলের দ্বিতীয় বৃহত্তম কলার হাট, যা চলে অক্টোবর মাস পর্যন্ত। এ হাটে প্রতিদিন কোটি টাকার কলা বিক্রি হয়।
সরেজমিন সেখানে গিয়ে দেখা যায়, ভোর ৫টা থেকে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও কৃষকদের হাঁকডাকে সরগরম হয়ে ওঠে কলার হাট। কৃষকরা ভ্যান, নসিমন, ইজিবাইক, পিকআপে করে এই হাটে বিক্রির জন্য কলা আনেন। সকাল ১০টার মধ্যে কলা কেনার কাজ শেষ করেন ব্যবসায়ীরা। তার পর ট্রাকে কলা লোড হয়ে চলে যায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। এই হাটে সবথেকে বেশি বিক্রি হয় মেহের সাগর কলা। এর পাশাপাশি মালভোগ ও চিনি চাম্পাসহ বিভিন্ন জাতের কলার দেখা মেলে।
জেলার কাহারোল উপজেলার ৫ নম্বর সুন্দরপুর ইউনিয়নের কৃষক সুমন আলী আগামীর সময়কে জানান, এ বছর ২ বিঘা (৫০ শতকে বিঘা) জমিতে সাগর কলার চাষ করেছি। এক বিঘা জমিতে ৬০০ গাছ লাগিয়েছিলাম। তবে রোগ-বালাই বাদ দিয়ে ৫৫০ গাছে কলার বাম্পার ফলন হয়েছে। এক বিঘা জমিতে আমার খরচ হয়েছে ১ লাখ ১৭ হাজার টাকা। আমি এবছর এক বিঘা জমিতে কলা বিক্রি করেছি ২ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। এক বিঘা জমিতে আমার লাভ হয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার টাকা।
কলার ফলন ও দাম জমির ওপর নির্ভর করে। সঠিক পরিচর্যা করতে পারলে কলায় খরচের দ্বিগুণ লাভ করা সম্ভব ভাষ্য এই কৃষকের।
দশমাইল কলার হাটের ইজারাদার মো. মিজান আগামীর সময়কে জানালেন, এখন প্রতিদিন হাটে কোটি টাকার কলার ব্যবসা হচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে ১৬-২০টি ট্রাক লোড হয়। একটি বড় ট্রাকে সর্বনিম্ন ৭০০ কাঁদি কলা ধরে। ছোট ট্রাকে ৪৫০ কাঁদি কলা ধরে। মৌসুমে এ হাটে লোড আনলোডের কাজ করেন অন্তত ১০০ শ্রমিক। এ ছাড়া কিছু ব্যবসায়ী সরাসরি ক্ষেত থেকে কলা কিনে ট্রাকে করে নিয়ে যান।
বীরগঞ্জ ও কাহারোল কৃষি সম্প্রসারণ অফিস সূত্রে জানা গেছে, বীরগঞ্জ উপজেলায় এবছর ৩১৫ হেক্টর জমিতে কলার আবাদ হয়েছে। আর কাহারোল উপজেলায় হয়েছে ৩২৫ হেক্টর জমিতে। আর জেলায় কলার আবাদ হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে।
কাহারোল উপজেলার দশমাইল কলার হাটের স্থানীয় ব্যবসায়ী রমজান আলীর (৬৫) ভাষ্য, ৩০ বছর ধরে এই হাটে কলার বেচাকেনা হচ্ছে। প্রতিবছর এই সময়ে ঢাকা, ফেনী, কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা এখানে আসেন। এ বছর জেলায় কলার আবাদ বাড়লেও দাম কমেনি। কৃষকরা কলা বিক্রি করে খুশির কথা জানাচ্ছেন।
ঢাকা থেকে আসা কলা ব্যবসায়ী আকবর আলী জানান, ভালো মানের কলার দামও বেশি। তিনি প্রতিদিন তিন ট্রাক করে কাঁচা কলা কিনে ঢাকায় পাঠাচ্ছেন। গত বছর যে কলার কাঁদি ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকায় কিনেছেন; সেই কাঁদি এবার ৬০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে।’
কাহারোল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. জাহিদুর রহমান আগামীর সময়কে জানান, কাহারোলে কলা চাষে আগ্রহ বাড়ছে কৃষকদের৷ কারণ অন্যান্য ফসলের চেয়ে কলা চাষে কৃষকরা বেশি লাভবান হচ্ছেন। আমাদের অফিস থেকে কৃষকদের পরামর্শ দিয়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হয়।
দিনাজপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. আফজাল হোসেন জানান, ‘কলা একটি লাভজনক ফসল। এ অঞ্চলের কৃষকদের উন্নত জাতের কলা চাষের জন্য সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে কলার ভালো ফলন পাওয়ার জন্য পরামর্শ দিয়েও সহযোগিতা করা হচ্ছে। ফলে কৃষকেরা কলার ভালো উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছেন। এবার কলার ফলন ও দামে কৃষক খুশি।’