বছরের শুরুতে বাংলাদেশে নতুন সরকার আসার পর ঢাতা-দিল্লি সম্পর্কে বরফ গলার আভাস দেখা গেলেও গত এক মাসে আবার শীতলতার লক্ষণ ফুটে ওঠে। তার মধ্যেই ইলিশ ও ডিজেল রপ্তানি করেছে ভারত, যা নয়া দিল্লির নতুন বার্তা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
এতদিন বাংলাদেশ থেকে ইলিশ রপ্তানি হলেও এবার গত দুই মাসে উল্টো ভারত প্রায় ৫০০ মেট্রিক টন ইলিশ পাঠিয়েছে। আবার ভারতের পাইপলাইনে বাংলাদেশে পৌঁছেছে প্রায় ৪ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল।
দুটি ঘটনাই ঘটেছে এমন সময়, যখন বাংলাদেশের নদীতে ইলিশ কম মেলার পাশাপাশি জ্বালানি সংকটে খাবি খেতে হচ্ছে।
ডিজেল রপ্তানি
গত ১২ সেপ্টেম্বর থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর রাতের মধ্যে ‘ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন’ এর মাধ্যমে ৪ হাজার মেট্রিক টন বা ৪৭ লাখ লিটার ডিজেল বাংলাদেশে পাঠানো হয় বলে ভারতীয় সূত্রে জানা যায়। পাইপলাইনের ৭২তম চালানের অংশ হিসেবে এই ডিজেল আমদানি করে বাংলাদেশ।
দিনাজপুরের পার্বতীপুর রেল ডিপোর অপারেশন ম্যানেজার মো. রবিউল আলম বাসসকে জানান, গত রোববার সকাল ৯টায় ডিজেল হস্তান্তরের এই প্রক্রিয়া শুরু হয়। শেষ হয় মঙ্গলবার বিকেলে।
২০১৮ সালের দ্বিপক্ষীয় চুক্তির পর ২০২৩ সালের মার্চ মাসে পাইপলাইনে ভারত থেকে ডিজেল আমদানি শুরু হয়। এখন অবধি এসেছে ৩ লাখ ৩০ হাজার ৮৭ টন।
পাইপলাইনের বাংলাদেশ অংশটি ১২৬ দশমিক ৫৭ কিলোমিটার দীর্ঘ। এটি পঞ্চগড়, নীলফামারী ও দিনাজপুরের বিভিন্ন এলাকার ওপর দিয়ে পার্বতীপুর ডিপোতে পৌঁছেছে। নিরাপত্তার জন্য পাইপলাইনটি মাটির প্রায় পাঁচ থেকে আট ফুট নিচে বসানো হয়।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল কিছুদিন আগেই জানিয়েছিলেন, মৈত্রী পাইপলাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশে নিয়মিত ডিজেল সরবরাহ করছে নয়া দিল্লি।
ইলিশে বদলেছে বাণিজ্যের চিত্র
জ্বালানির পাশাপাশি ইলিশের বাণিজ্যও দুই দেশের সম্পর্কের সাম্প্রতিক আলোচনায় জায়গা করে নিয়েছে। গত দুই মাসে বাংলাদেশে প্রায় ৫০০ মেট্রিক টন ইলিশ গেছে।
ভারত থেকে বাংলাদেশে ইলিশ রপ্তানি সাম্প্রতিক বাণিজ্যে একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা। কারণ সাধারণত দুর্গাপূজার সময় বাংলাদেশ থেকেই ভারতে ইলিশ আসে।
গুজরাটে ইলিশের উৎপাদন বাড়ায় মূলত ডিমওয়ালা ইলিশের একটি অংশ বাংলাদেশে পাঠানো হচ্ছে বলে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের সূত্রে জানা গেছে। সূত্র জানাচ্ছে, আরও প্রায় ১৫০ মেট্রিক টন ইলিশ বাংলাদেশে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বরফ কাটবে?
জুলাই অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার আমলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক তলানিতে ঠেকেছিল। কিন্তু গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে নির্বােনের মধ্য দিয়ে নতুন সরকার আসার পর সম্পর্ক পুনর্গঠনের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছিল।
কিন্তু গত এক মাসে সম্পর্কের আকাশে আবার মেঘ দেখা যাচ্ছে। সেই লক্ষণ দেখা যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ব্রিকস সম্মেলনে না যাওয়া এবং কোনো প্রতিনিধি না পাঠানো।
গত ফেব্রুয়ারিতে তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরপরই তাকে সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এরপর সদ্য সমাপ্ত ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নিতে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়।
কিন্তু এরমধ্যে শেখ হাসিনার তৎপরর্য় শুরু হয় কূটনৈতিক টানাপড়েন। ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া শেখ হাসিনার গত আগস্টের সংবাদ সম্মেলনে উষ্মা প্রকাশ করে ঢাকা। এটা যে দুই দেশের সম্পর্কে প্রভাব ফেলবে, সেই সতর্কবার্তা দেওয়া হয় দিল্লিকে।
এরপর ব্রিকস সম্মেলনে অংশ না নেওয়ার বিষয়ে ঢাকার পক্ষ থেকে বলা হয়, এক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে যথাযথভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।
এই ফাঁকে বাংলাদেশে বিএনপি নেতাদের মধ্য থেকে ভারতকে নিয়ে বক্তব্য এসেছে। দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বুধবারই এক সমাবেশে বলেছেন, ভারত গভীর ষড়যন্ত্র করছে বলে তার সন্দেহ হচ্ছে।
সব কিছুর পরও ইলিশ থেকে জ্বালানি- দুই ক্ষেত্রেই সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা ঢাকা-দিল্লির অর্থনৈতিক যোগাযোগের ধারাবাহিকতা নতুন করে সামনে এনেছে। রাজনৈতিক স্তরে মতপার্থক্য থাকলেও জ্বালানি ক্ষেত্র, বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক যোগাযোগের মতো স্বার্থের ক্ষেত্রে সহযোগিতার দরজা খোলা রাখার ইঙ্গিত মিলছে দিল্লি থেকে।