এবার কুড়িগ্রামের চর রাজিবপুর উপজেলায় ডিলারের গুদাম থেকে জোর করে সারের বস্তা নিয়ে গেছেন বিক্ষুব্ধ কৃষকরা। বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) সকালে রাজিবপুর উপজেলা শহরের রাজিবপুর বাজারে ‘সফি এন্টারপ্রাইজ’ নামে ডিলার পয়েন্টে এ ঘটনা ঘটে। ডিলার তার বাড়িতে বসে কিছু কৃষককে সারের স্লিপ দেওয়ার ঘটনায় গুদামের সামনে সারের জন্য অপেক্ষায় থাকা কৃষকরা সার না পাওয়ার শঙ্কা থেকে এই ঘটনা ঘটান বলে জানা গেছে।
তবে চর রাজিবপুর উপজেলার ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সায়েকুল হাসান খান গুদাম থেকে জোর করে সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনা অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, কিছু কৃষক গোলমাল করার চেষ্টা করেছেন। প্রশাসন ও পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। সুষ্ঠুভাবে সার বিতরণের দাবি করেন ইউএনও।
তবে বুধবার দুপুর ১টায় শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত রাজিবপুর বাজারে ডিলারের শাস্তি ও নিবন্ধন বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ করছিলেন কৃষকরা। তারা মিছিল নিয়ে উপজেলা প্রশাসন চত্বরে যান।
ডিলার সফি এন্টারপ্রাইজের মালিকের নাম সফি আলম। তিনি উপজেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি এবং বর্তমান উপজেলা আহ্বায়ক কমিটির সদস্য। বিশৃঙ্খলার জন্য তিনি তৃতীয় পক্ষের ইন্ধনকে দায়ী করেছেন।
ডিলারের গুদামের সামনে থাকা কৃষকরা জানান, বুধবার সকালে রাজিবপুর বাজারে থাকা সফি আলমের ডিলার পয়েন্ট থেকে সার বিতরণ করার কথা ছিল। ইউনিয়নের ২, ৩ ও ৪নং ওয়ার্ডের কৃষকদের এই সার বরাদ্দ ছিল। কৃষকরা ভোর থেকে ডিলার পয়েন্টের সামনে অপেক্ষা করতে থাকেন। সকালে নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে গেলেও ডিলার সার বিতরণ শুরু করেননি। এর মধ্যে কিছু লোকজন ডিলারের বাড়ি থেকে স্লিপ নিয়ে এসে সার নেওয়া শুরু করেন। অপেক্ষায় থাকা কৃষকরা জানতে পারেন, ডিলার বাড়িতে থেকে সারের স্লিপ দিচ্ছেন। সেই স্লিপধারীরাই সার পাবেন। এ খবর পাওয়ার পর গুদামের সামনে অপেক্ষায় থাকা কৃষকরা ক্ষুদ্ধ হয়ে ওঠেন। তারা সার পাবেন না, এমন আশঙ্কায় গুদামে ঢুকে বেশ কিছু বস্তা সার নিয়ে যান।
ডিলারের গুদামের পাশে থাকা প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন দোকানদার জানান, ডিলার তার বাড়িতে বসে কৃষকদের সারের স্লিপ দিচ্ছিলেন। সেই স্লিপ নিয়ে গুদামে এসে কৃষকরা সার নেওয়া শুরু করে। এতে গুদামের সামনে সারের জন্য অপেক্ষায় থাকা কৃষকরা ক্ষুদ্ধ হয়ে ওঠেন। তারা ডিলারের গুদামে ঢুকে সারের বস্তা নিয়ে যেতে থাকেন। ঠিক কত বস্তা সার নিয়ে গেছে তার সঠিক হিসাব ডিলার দিতে পারবেন। তবে যারা সারের বস্তা নিয়ে গেছেন তাদের মধ্যে স্লিপধারী কৃষকও থাকতে পারেন বলে ধারণা প্রত্যক্ষদর্শীদের।
ডিলার সফি আলম বলেন, ‘আজ বিতরণের জন্য গুদামে ৫০০ বস্তা ইউরিয়া ছিল। কিন্তু তার চেয়ে কয়েকশো বেশি মানুষ সারের জন্য গুদামের সামনে ভিড় করছিল। পাশেই আমার বাড়ি। ভিড় সামলাতে এবং বিতরণের সুবিধার্থে বাড়ি থেকে কৃষকদের স্লিপ দিচ্ছিলাম। বিষয়টি উপজেলা প্রশাসন এবং কৃষি বিভাগকে জানিয়েছিলাম। কিন্তু কৃষক নামধারী কিছু ব্যক্তি স্লিপধারী কৃষকদের গুদাম থেকে সার নিতে বাধা দেয়। তাদেরকে সার না দিলে স্লিপধারী কৃষকদের সার নিতে দেবে না বলে জানায়। গুদামে হামলা চালায়। বেশ কিছু বস্তা সার নিয়ে যায়। এর মধ্যে কিছু বস্তা ফেরত পাওয়া গেছে। বাকিটা হিসাব করে জানা যাবে।’
বিশৃঙ্খলার জন্য আওয়ামী লীগের লোকজনের ইন্ধনকে দায়ী করে ডিলার বলেন, ‘উসকানিদাতাদের মধ্যে আওয়ামী লীগের কিছু চিহ্নিত ব্যক্তি ছিল। তাদের আবাদি জমি না থাকলেও সারের জন্য ভিড়ের মধ্যে ঢুকেছিল। তারাই কিছু বস্তা লুট করেছে। আমি ওসি সাহেবকে তাদের নাম বলেছি।’
তবে ডিলারের দাবির সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসনের দাবির বেশ পার্থক্য পাওয়া গেছে। ডিলার তার নিজ গুদাম থেকে সারের বস্তা লুটের কথা স্বীকার করলেও স্থানীয় প্রশাসনের দাবি, ‘সারের বস্তা নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেনি। কিছু কৃষক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করলে পুলিশ ও প্রশাসন তা নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে সুষ্ঠুভাবে সার বিতরণ সম্পন্ন হয়েছে।’
রাজিবপুর ইউএনও সায়েকুল হাসান খান বলেন, ‘সার লুটের ঘটনা ঘটেনি। কিছু কৃষক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করেছিল। খবর পেয়ে আমরা দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনি। পরে সুষ্ঠুভাবে সার বিতরণ হয়েছে।’
ডিলারের বিরুদ্ধে কৃষকদের অনিয়মের অভিযোগ প্রশ্নে ইউএনও বলেন, ‘তদন্ত করে অনিয়ম পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
রাজিবপুর থানার ওসি শাহীনুর আলম বলেন, ‘সার লুটের চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু আমাদের প্রচেষ্টায় সেটা করতে পারেনি। পরে সুষ্ঠুভাবে সার বিতরণ করা হয়েছে।’
প্রসঙ্গত, এবার আমন মৌসুমে কুড়িগ্রামের কয়েকটি উপজেলায় সারের দাবিতে কৃষকরা বারবার বিক্ষোভ করছেন। এর আগে জেলার ভূরুঙ্গামারী ও রৌমারী উপজেলায় ডিলারের গুদাম ভেঙে সার নিয়ে যান কৃষকরা। এ ছাড়াও নাগেশ্বরী উপজেলাতেও সারের দাবিতে একাধিকবার শোরগোল হয়েছে।
তবে কৃষি বিভাগের দাবি, প্রয়োজন অনুযায়ী বরাদ্দ ও সার সরবরাহ করা হয়েছে। জেলায় সারের সংকট নেই। বরং গত বছরের তুলনায় বরাদ্দ বেশি। এর বাইরে সেপ্টেম্বর মাসে নিয়মিত বরাদ্দের অতিরিক্ত আরও ৫০০ টন ইউরিয়া বরাদ্দ পাওয়া গেছে।