টাঙ্গাইলের অরক্ষিত রেল ক্রসিংয়ে ট্রেন আসার আগেই পথচারীদের সতর্ক করছে একটি স্বয়ংক্রিয় ডিভাইস। ট্রেন ক্রসিংয়ের কাছাকাছি আসার আগেই যন্ত্রটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেজে উঠে বলে, ‘ট্রেন আসছে, ট্রেন আসছে’। মো. হামিদুর রহমানের উদ্ভাবিত এই অটো সিগন্যাল স্থাপনের পর কালিহাতীর হাতিয়া এলাকার একটি রেল ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা কমেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের পাশ দিয়ে চলে গেছে রেললাইন। মহাসড়কের যানবাহনের শব্দ ও ট্রেনের শব্দ একাকার হয়ে যাওয়ায় ব্যস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ লেভেল ক্রসিংয়ে অনেক সময় ট্রেন আসার বিষয়টি বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে পথচারীদের আগাম সতর্ক করতে হাতিয়া এলাকার একটি অরক্ষিত রেল ক্রসিংয়ে এই স্বয়ংক্রিয় ডিভাইস স্থাপন করা হয়েছে।
উদ্ভাবক মো. হামিদুর রহমান জানিয়েছেন, ট্রেন প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে থাকতেই ডিভাইসটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংকেত দিতে শুরু করে। এর শব্দ প্রায় ৫০০ মিটার দূর থেকেও শোনা যায়। ফলে ক্রসিং দিয়ে চলাচলকারী পথচারী ও যানবাহনের চালকেরা আগেই সতর্ক হওয়ার সুযোগ পান।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, যমুনা সেতুর ইব্রাহিমাবাদ রেলস্টেশন থেকে টাঙ্গাইলের ঘারিন্দা রেলস্টেশন পর্যন্ত বেশ কয়েকটি অরক্ষিত রেল ক্রসিং রয়েছে। এসব ক্রসিংয়ে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। হাতিয়া এলাকায় অটো সিগন্যাল স্থাপনের পর দুর্ঘটনা অনেকটা কমে এসেছে বলে তাদের দাবি।
স্থানীয় বাসিন্দা রবিন তালুকদার জানিয়েছেন, অরক্ষিত রেল ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা কমাতে হামিদুর রহমানের উদ্ভাবিত যন্ত্রটি অন্য ক্রসিংয়েও স্থাপন করা প্রয়োজন। ট্রেন আসার আগেই সংকেতের মাধ্যমে পথচারীদের জানিয়ে দেওয়ায় তারা সতর্ক হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
মোহেরা রেলস্টেশনের স্টেশনমাস্টার রকিবুল হাসান জানান, জনসচেতনতার জন্য এটি ভালো একটি উদ্যোগ। স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রটি স্থাপনের পর হাতিয়া এলাকায় দুর্ঘটনার সংখ্যাও কমেছে। রক্ষিত ও অরক্ষিত সব রেল ক্রসিংয়ে লাইনম্যানের পাশাপাশি এ ধরনের সংকেতযন্ত্র স্থাপন করা গেলে জনসচেতনতা আরও বাড়বে।
হামিদুর রহমান টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার হাসরা গ্রামের আব্দুর রহিম শিকদারের ছেলে। তিনি করটিয়ার সরকারি সাদত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা বিভাগে স্নাতক (সম্মান) সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে কালিহাতীতে পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।
হামিদুর রহমান জানিয়েছেন, পত্রিকা ও টেলিভিশনে সড়ক ও রেল দুর্ঘটনার খবর দেখে কীভাবে দুর্ঘটনা এড়ানো যায়, তা নিয়ে ভাবতেন তিনি। প্রযুক্তি বা ইলেকট্রিক্যাল বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা না থাকলেও ছোটবেলা থেকেই হাতে-কলমে প্রযুক্তির সঙ্গে তার পরিচয় ছিল। নিজ বাড়ির রাইস মিল ও ফিড মিলে ব্যবহৃত বিভিন্ন প্রযুক্তি তাকে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র তৈরিতে আগ্রহী করে তোলে।
সেই আগ্রহ থেকেই তিনি প্রথমে অটো সিগন্যালের একটি ডেমো তৈরি করেন। ২০১৮ সালে কালিহাতী উপজেলা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলায় ডেমোটি প্রদর্শন করে জেলা পর্যায়ে প্রথম স্থান অর্জন করেন।
এরপর রেলপথ মন্ত্রণালয়ে রেললাইনে যন্ত্রটি পরীক্ষামূলকভাবে স্থাপনের অনুমতি চেয়ে আবেদন করেন তিনি। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২২ সালে কালিহাতীর হাতিয়া এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে ডিভাইসটি স্থাপনের সুযোগ পান। পরে ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে হাতিয়া অরক্ষিত রেল ক্রসিংয়ে এটি স্থাপন করেন।
হামিদুর রহমান জানিয়েছেন, সারা দেশে প্রায় সাড়ে তিন হাজার রেল ক্রসিং রয়েছে। অরক্ষিত রেল ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা কমাতে তার উদ্ভাবিত ডিভাইস দেশের বিভিন্ন রেল ক্রসিংয়ে স্থাপন করতে চান তিনি। এজন্য সরকারের সহযোগিতাও প্রত্যাশা করছেন।