Image description

কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামে ইয়াবা পাচারে শিশু-কিশোরদের ব্যবহার করছে মাদক কারবারিরা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়াতে এক্ষেত্রে নেওয়া হচ্ছে নানান কৌশল।

মূলত দরিদ্র ও অসহায় পরিবারের শিশুদের টার্গেট করে মাসে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে মাদক পাচারে যুক্ত করা হচ্ছে।

সম্প্রতি চট্টগ্রামে দুই শিশুর পাকস্থলীতে ইয়াবার প্যাকেট ঢুকিয়ে পাচারের ঘটনা ধরা পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করেছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।

৯ ও ১২ বছর বয়সী ওই দুই শিশুর পাকস্থলী থেকে মলত্যাগের মাধ্যমে ১৩৩টি প্যাকেট বের করা হয়। এসব প্যাকেটে পাওয়া যায় ৬ হাজার ৬১৫টি ইয়াবা।

র‌্যাব সূত্রে জানা গেছে, শিশুদের ব্যবহার করে কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামে ইয়াবা পাচার করা হচ্ছে-এমন তথ্যের ভিত্তিতে গত ৬ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের আনোয়ারা থানার সরকারহাটের তৈলার দ্বীপ এলাকা থেকে একটি সিএনজি অটোরিকশা থেকে শারমিন আকতার ইসমত আরাকে (৪০) গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় ৯ ও ১২ বছর বয়সী দুই শিশুকে হেফাজতে নেয় র‌্যাব।

পরে শারমিন আকতার ও শিশু দুটিকে জিজ্ঞাসাবাদ করে র‌্যাব জানতে পারে, তাদের পাকস্থলীতে ইয়াবা রয়েছে। এরপর স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য শিশু দুটিকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে এক্স-রে পরীক্ষায় তাদের পাকস্থলীতে ইয়াবা ট্যাবলেটসদৃশ বস্তু দেখা যায়। চিকিৎসার একপর্যায়ে মলত্যাগের মাধ্যমে দুই শিশুর পাকস্থলী থেকে ১৩৩টি ইয়াবার প্যাকেট বের করা হয়। এর মধ্যে ৯ বছর বয়সী শিশুটির পেট থেকে ৬৭টি এবং ১২ বছর বয়সী শিশুটির পেট থেকে ৬৬টি প্যাকেট পাওয়া যায়।

র‌্যাব কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইয়াবাগুলো স্বচ্ছ পলিপ্যাকে মোড়ানোর পর কালো স্কচটেপ দিয়ে পেঁচিয়ে জামসদৃশ আকার দেওয়া হয়েছিল। এসব প্যাকেটে মোট ৬ হাজার ৬১৫টি ইয়াবা পাওয়া যায়। মাসে ৮ হাজার টাকা ভাতা ও পরিবারের বাজার খরচ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে অসহায় ও হতদরিদ্র শিশুদের ইয়াবা পাচারে ব্যবহার করা হতো। শিশুদের পাকস্থলীতে ইয়াবার প্যাকেট ঢুকিয়ে কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামে আনা হতো। চক্রটির অন্যতম হোতা শারমিন আকতার ইসমত আরা। কক্সবাজারের টেকনাফে আরও একজন ব্যক্তি শিশুদের ইয়াবা পাচারের কাজে ব্যবহার করছিল বলেও তথ্য পেয়েছে র‌্যাব।

র‌্যাব কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ওই দুই শিশুকে বান্দরবানের আলীকদম থেকে কক্সবাজারের কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কৌশলে পলিথিনে মোড়ানো ইয়াবার ছোট ছোট প্যাকেট তাদের খাওয়ানো হয়। পরে পাচারের উদ্দেশ্যে তাদের চট্টগ্রামের দিকে পাঠানো হয়। এর আগে এই শিশুদের ব্যবহার করে আরও দুইবার চট্টগ্রামে ইয়াবা পাচার করেছিল চক্রটি।

র‌্যাব কর্মকর্তারা বলছেন, পাকস্থলীতে ইয়াবা বহন করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এভাবে মাদক বহনের কারণে কোনো শিশু তাৎক্ষণিক কোনো লক্ষণ প্রকাশ না করেও মারা যেতে পারে। পেটে থাকা প্যাকেটগুলোর কোনো একটি ছিদ্র বা লিক হলে শিশুর শরীরে মারাত্মক বিষক্রিয়া হতে পারে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সাবেক সভাপতি ও সহকারী অধ্যাপক মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, দরিদ্র ও পড়ালেখার বাইরে থাকা শিশুরা নানা ধরনের প্রলোভনে পড়ে মাদকপাচারে জড়িয়ে যাচ্ছে। মাদকপাচারের মূল হোতারা শিশুদের অর্থসহ বিভিন্ন ধরনের লোভ দেখিয়ে এ কাজে ব্যবহার করছে। তাই প্রথমে মূল হোতাদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করতে হবে। পাশাপাশি সন্তানদের গতিবিধির বিষয়ে অভিভাবকদের আরও সতর্ক থাকতে হবে।

শিশু ও মানবাধিকার কর্মী এবং সাউথ এশিয়ান ভয়েস ফর চিলড্রেনের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, দরিদ্র, অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে মাদক পাচারে ব্যবহার করছে চক্রগুলো। প্রাপ্তবয়স্ক মাদক বাহকদের তুলনায় শিশুদের কম টাকায় কাজে নামানো যায়। অনেক ক্ষেত্রে ৪ থেকে ৮ হাজার টাকা কিংবা সামান্য মজুরির বিনিময়ে তাদের ব্যবহার করা হচ্ছে। আবার শিশু ধরা পড়লে প্রাপ্তবয়স্কদের মতো কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি কম-এমন ধারণাও পাচারকারীদের মধ্যে রয়েছে। তাই শিশুদের নিরাপদ আশ্রয়, মানসম্মত শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি স্কুল ও কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। সরকারি-বেসরকারি সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগে শিশুদের মাদক পাচার থেকে দূরে রাখতে হবে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে মানুষের পাকস্থলীর ভেতর ইয়াবা বহনের ঘটনা আগের তুলনায় আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এর আগে পেঁয়াজ, কাঁচা মরিচ, গাড়ির টায়ার, টিফিন বক্স, জুতা, সিলিন্ডার কিংবা মোবাইলের ব্যাটারির ভেতরেও ইয়াবা পাচার করা হতো। তবে এসব পদ্ধতিতে পাচারকারীরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়ছিল। এর প্রেক্ষিতে তারা ঝুঁকিপূর্ণ পথটি বেছে নেয়। এই পদ্ধতিতে ইয়াবা স্কচটেপ দিয়ে পেঁচিয়ে লম্বা করে কালো জামের মতো বানানো হয়। কলা বা জুসজাতীয় পানীয় দিয়ে এই প্যাকেট গিলে খায় বাহক। শারীরিক ঝুঁকি নিয়ে এভাবে ইয়াবা পাচার করতে গিয়ে গত কয়েক বছরে রোহিঙ্গাসহ স্থানীয় কয়েকজন মারা গেছেন।

র‌্যাব-৭ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, হতদরিদ্র শিশুদের প্রলোভন দেখিয়ে ইয়াবা পাচারে ব্যবহার করছিল একটি চক্র। কক্সবাজারের উখিয়া থেকে ইয়াবা সংগ্রহ করে কৌশলে শিশুদের খাওয়ানো হতো। পরে তাদের শরীরের ভেতর ইয়াবা বহন করিয়ে কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম নগরে এনে বিক্রি করা হতো। শিশুদের টাকা দেওয়ার পাশাপাশি পরিবারের বাজার খরচ বহনের কথা বলে তাদের প্রলুব্ধ করা হয়। চক্রগুলোর মূল হোতাদের শনাক্ত করা হচ্ছে। তারা কক্সবাজার থেকে এ কার্যক্রম পরিচালনা করছিল। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। এ ঘটনায় অন্য কেউ জড়িত থাকলে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক মো. জাহিদ হোসেন মোল্লা বলেন, শিশুদের সঙ্গে নিয়ে নারীরা বেশি ইয়াবা পাচার করে থাকে। এ ছাড়া পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন সময় শিশুদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ইয়াবা পাচারের সময় গ্রেপ্তার হয়েছেন। নারী-পুরুষের পাকস্থলীতে করে ইয়াবা পাচারের ঘটনাও বিভিন্ন সময় ধরা পড়েছে। তবে শিশুদের পাকস্থলীর ভেতরে করে ইয়াবা পাচারের ঘটনা এবারই প্রথম ধরা পড়েছে।