পবিত্র মক্কা নগরীর দিকে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতিদের ছোড়া একটি ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে রিয়াদ। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি জানিয়েছেন, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষা বাহিনী মক্কার নিষিদ্ধ আকাশসীমায় প্রবেশের আগেই ড্রোনটি শনাক্ত করে ধ্বংস করেছে।
সৌদি কর্তৃপক্ষের দাবি, ড্রোনটি মক্কার দক্ষিণে ভূপাতিত করা হয়েছে। আল-মালিকি বলেছেন, পবিত্র শহর ও সেখানে থাকা মুসল্লি, বাসিন্দা ও হজযাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে কোনো ঝুঁকি মেনে নেওয়া হবে না।
তিনি বলেছেন, দুই পবিত্র মসজিদ ও হজযাত্রীদের নিরাপত্তা ‘লাল রেখা’। হুতিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও সতর্কতা দিয়েছেন তিনি।
তবে মক্কাকে লক্ষ্য করার অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে হুতিরা। ইয়েমেনের সরকারি সংবাদ সংস্থা সাবাকে দেওয়া এক বিবৃতিতে হুতি সামরিক সূত্র বলেছে, মক্কা বা অন্য কোনো ইসলামি পবিত্র স্থানের বিরুদ্ধে ইয়েমেন থেকে কোনো হুমকি নেই। এ ধরনের অভিযোগকে ‘ভুল তথ্য’ হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছে তারা।
ঘটনার আগে মঙ্গলবার মক্কায় সম্ভাব্য বিপদের সতর্কতা জারি করেছিল সৌদি আরব। কয়েক মিনিটের মধ্যেই সতর্কতা তুলে নেওয়া হয়। একই ধরনের সতর্কতা জারি করা হয়েছিল জেদ্দা ও তাইফেও।
মক্কায় এ ধরনের সতর্কতা জারির ঘটনা প্রায় এক দশকের মধ্যে প্রথম বলে সৌদি ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
মক্কায় সতর্কতা জারির বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শহরটিতে রয়েছে কাবা শরিফ, যা ইসলামের সবচেয়ে পবিত্র স্থান। বিশ্বের প্রায় ২০০ কোটি মুসলমান প্রতিদিনের নামাজে কাবার দিকে মুখ করেন।
প্রতি বছর লাখ লাখ মুসলমান হজ ও ওমরাহ পালনের জন্য মক্কায় যান। চলতি বছরের মে মাসের শেষ দিকে হজে সৌদি আরব প্রায় ১৭ লাখ মুসল্লিকে স্বাগত জানিয়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মিলিয়ে ১১ দশমিক ৭ মিলিয়নের বেশি মানুষ ওমরাহ পালন করতে মক্কায় গিয়েছিলেন।
হজ ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি। সামর্থ্য থাকলে জীবনে অন্তত একবার হজ পালন করা মুসলমানদের জন্য আবশ্যক। সারা বছরই ওমরাহ পালনের জন্য মক্কায় মুসল্লিদের যাতায়াত থাকে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় ২০২০ সালে বিদেশি মুসল্লিদের হজে আসা বন্ধ করা হয়েছিল। এরপর আবার স্বাভাবিকভাবে হজ ও ওমরাহ পালনের সুযোগ চালু হয়।
সৌদি আরবের ওপর সাম্প্রতিক হুতি হামলার কারণে এবার মক্কায় তীর্থযাত্রা কোনোভাবে প্রভাবিত হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
মক্কাকে ঘিরে সর্বশেষ ঘটনাটি সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে কয়েক বছর ধরে চলা সংঘাতের নতুন উত্তেজনা তৈরি করেছে। ২০১৪ সালে ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করে হুতিরা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর সৌদি আরব ইয়েমেনে সামরিক হস্তক্ষেপ করে।
২০২২ সালের এপ্রিলে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর সৌদি ভূখণ্ডে হুতিদের হামলা অনেকটাই কমে যায়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আবার সংঘাত বেড়েছে। জুলাইয়ে সৌদি জাহাজ চলাচলের ওপর অবরোধ ঘোষণার পর হুতিরা লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি এলাকায় নিয়ন্ত্রণ জোরদার করেছে।
সেপ্টেম্বরের শুরুতে সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় হুতিরা। সৌদি আরবের অভিযোগ, এসব হামলায় বেসামরিক ও অর্থনৈতিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করা হয়েছে।
মঙ্গলবার সৌদি শহর খামিস মুশাইত, আবহা ও তাইফে হুতি হামলায় ১৩ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। তাদের দাবি, হামলায় সাতটি বাড়ি ও দুটি যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জোট জানিয়েছে, সৌদি ভূখণ্ডের শহরাঞ্চলে হুতিদের হামলার জবাব ‘দৃঢ়ভাবে’ দেওয়া হবে।
হুতিরা অবশ্য এসব হামলাকে সৌদি হামলার জবাব হিসেবে দেখিয়েছে। তাদের দাবি, খামিস মুশাইতের একটি সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে তারা অভিযান চালিয়েছে। সামরিক ঘাঁটির বিমান রাখার স্থান, রাডার ব্যবস্থা, রানওয়ে ও গোলাবারুদের গুদামকে লক্ষ্যবস্তু করার কথা জানিয়েছে তারা।
মক্কার ঘটনা ২০১৭ সালের একটি ঘটনার কথাও মনে করিয়ে দিয়েছে। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের দাবি, ওই বছরের ২৭ জুলাই হুতিরা মক্কার দিকে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল। সৌদি আরব সেটি প্রতিহত করার কথা জানিয়েছিল। এবারের ড্রোন ঘটনাকে মক্কাকে লক্ষ্য করে হুতিদের দ্বিতীয় প্রচেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করেছেন আল-মালিকি।
তবে হুতিরা ২০১৭ সালের মতো এবারও মক্কাকে লক্ষ্য করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের বক্তব্য, তারা পবিত্র স্থানগুলোকে লক্ষ্য করে না।
ঘটনাটি নিয়ে নিন্দা জানিয়েছে ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা বা ওআইসি। সংস্থাটির মহাসচিবের দপ্তর মক্কা ও মদিনা অঞ্চলে হুতিদের হামলার নিন্দা জানিয়েছে এবং সৌদি আরবের প্রতি পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করেছে।
ওআইসি বলেছে, পবিত্র স্থান, মসজিদ ও বেসামরিক স্থাপনায় হামলা ইসলামি মূল্যবোধ এবং আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতির পরিপন্থী। সংস্থাটি পবিত্র স্থানগুলোর নিরাপত্তা এবং বেসামরিক মানুষের সুরক্ষায় সৌদি আরবের নেওয়া পদক্ষেপের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।
মক্কার দিকে ড্রোন যাওয়ার দাবি এবং হুতিদের অস্বীকার— দুই পক্ষের বক্তব্যের মধ্যে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ঘটনাটি সৌদি আরব ও হুতিদের সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করছে কি না। বিশেষ করে লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দাব ও সৌদি উপকূলীয় অঞ্চলে সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনার মধ্যে মক্কার আকাশসীমায় এই ঘটনার প্রভাব নিয়ে নজর থাকবে।
সূত্র : আল জাজিরা