মাথার ওপর দিয়ে বিদ্যুতের তার চলে গেলেও তার ঘরে নেই বিদ্যুতের সংযোগ। মুঠোফোনের আলোয় শিশুর মুখটি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে চার বছর শিশু পমি তংচঙ্গ্যার। মাথা উপরে মোবাইল, অন্য হাতে ভাতের লোকমা। মায়ের হাত থেকে খাবার মুখে তুলে নিচ্ছে চার বছরের শিশু। ঘরের বাইরে তাকালে দেখা যায়, মাথার ওপর দিয়ে চলে গেছে বিদ্যুতের তার। অথচ সেই তারের আলো পৌঁছায়নি ঘরের ভেতর। এভাবেই প্রতিদিনের অন্ধকারের সঙ্গে লড়াই করছেন সঞ্জিতা তংচঙ্গ্যা।
সঞ্জিতা তংচঙ্গ্যা বলেন, ‘গ্রামে বিদ্যুতের খুটি আর কারেন্ট এসেছে। কিন্তু বিদ্যুতের লোকজন ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা দাবি করাই লাইন আনতে পারেননি। গরীব মানুষ টাকা নাই, পয়সা নাই এত টাকা কোথায় থেকে দিব আমি। তার কারণে মোবাইল লাইট দিয়ে থাকতে হচ্ছে।’
বিদ্যুতের খাম্বার লাইন থেকে ১০০ গজ দূরে অংচিংনু তংচঙ্গ্যা দোকান। সোলারে আলোতে ছোট্ট দোকান নিয়ে দুই বছর ধরে ক্ষুদ্র ব্যবসায় করছেন তিনি। সামনে খুঁটি আর বিদ্যুতের আলো দেখতে পেলেও শাখা-প্রশাখা লাইন না দেয়ায় এখনো সোলারে আলোতে ব্যবসা করছেন তিনি। শুধু তাই নয়, বিদ্যুতের লাইন নিতে টাকা দাবি করায় এখনো আসেনি বিদ্যুতের আলো।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী অংচিংনু তংচঙ্গ্যা বলেন, ‘আমার দোকানে ১০০ গজ দূরে বিদ্যুতের খুঁটি আর আলো দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এখানে বিদ্যুতের লাইন বা খুঁটি দেয়নি। বিদ্যুৎ খুঁটি আনতে টাকা দাবি করছে বিদ্যুৎ বিভাগে কর্মচারীরা।’
সবুজের পাহাড়ঘেরা আলীকদম নয়াপাড়া ইউনিয়নের যোগেন্দ্র পাড়া। এলাকাতে যোগেন্দ্র কারবারী পাড়া, বসুদেব পাড়া, সাইয়ে ম্রো পাড়া, রোহিনীমোহন কারবারী পাড়াসহ পাঁচটি গ্রামে শতাধিক পরিবারের বসবাস। চারপাশে সবুজ পাহাড়, দূরে জুমের খেত। ভোর হলেই কেউ বেরিয়ে পড়েন পাহাড়ের ঢালে, কেউ ব্যস্ত হয়ে পড়েন ঘরের কাজে। এখানকার অধিকাংশ মানুষের জীবিকা জুমচাষ নির্ভর। দিনভর পাহাড়ে শ্রম দেয়ার পর সন্ধ্যায় যখন ঘরে ফেরেন তারা, তখন শুরু হয় আরেক সংগ্রাম। ঘরে আলো জ্বালানোর সংগ্রাম।
২০২৪ সালে ৬০ হাজার টাকা বিনিময়ে গ্রামের বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুতের খুঁটি স্থাপন করা হয়েছে। মূল বিদ্যুতের লাইনও চলে গেছে এলাকার ওপর দিয়ে। কিন্তু সেই লাইন থেকে বাড়িঘরে পৌঁছায়নি শাখা-প্রশাখা সংযোগ। ফলে বিদ্যুতের অবকাঠামো চোখে পড়লেও এর সুফল পাচ্ছেন না অধিকাংশ বাসিন্দা। হাতে গোনা কয়েকটি বাড়িতে বিদ্যুৎ পৌঁছালেও বাকি পরিবার গুলোর ভরসা সোলার প্যানেল, ব্যাটারি আর কখনো মোবাইলের টর্চ। চারটি বাড়িতে আলো জ্বলে উঠলেও বিদ্যুতের অপেক্ষায় দিন কাটছে বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার নয়াপাড়া ইউনিয়নের শত বছরের পুরোনো পাঁচগ্রামে তিন শতাধিক পরিবারের।
শহর থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরে যোগেন্দ্র পাড়া, বসুদেব পাড়াসহ পাঁচটি গ্রাম। সেখানে প্রায় তিন শতাধিক চাকমা, ম্রো ত্রিপুড়া মানুষের শতাধিক পরিবার। গ্রামের মাথা উপর দিয়ে মূল বিদ্যুতের লাইন পৌঁছালেও দেয়া হয়নি শাখা-প্রশাখা তার। অধিক এই গ্রামে বিদ্যুতের আলো জ্বলছে মাত্র চার পরিবার ঘরে। অনান্য পরিবারের এখনো জ্বলেনি বিদ্যুৎ আলো। অধিকাংশ ঘরে সোলার আলোতে পড়ালেখা করছেন আবার কারো বাড়িতে চেরাগ আলোতে ঘরে কাজ করছেন। বিদ্যুতের খুঁটি দিকে তাকিয়ে সামান্য এই আলোতে জীবনের সংগ্রাম চালাচ্ছেন এই গ্রামের মানুষ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দুই বছর আগে বিদ্যুৎ আনতে লামা বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মচারীদের প্রায় ৬০ হাজার টাকা দেয়ার পর খুঁটি আসে। কিন্তু বিদ্যুতের মূল লাইন স্থাপন করা হলেও বাড়িঘরে সংযোগ দেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় শাখা লাইন স্থাপন করা হয়নি। শাখা লাইন স্থাপনের জন্য লামা বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মচারীরা আবারো অর্থ দাবি করছে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। অর্থের সামর্থ্য না থাকায় অনেক পরিবার সংযোগ নিতে পারছে না বলে দাবি তাদের।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ২০০টি বাড়িঘর মধ্যে বিদ্যুৎ আলো জ্বলছে মাত্র চার ঘরে। বাকি ঘরে এখনো সোলার ও চেরাগের আলো। শিক্ষার্থীরা পড়ালেখা করছে সোলারে আলো নীচে। বিদ্যুৎ খুটি দেখা পেলেও পুরো এলাকা জুড়ে অন্ধকার আর নিরবচ্ছিন্ন।
যোগেন্দ্র কারবারি পাড়া চিংচাহ্লা তংচঙ্গ্যা বলেন, ‘গ্রামে বিদ্যুৎ আনতে ৬০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে কর্মচারীদের। এরপর বিদ্যুৎ আসলেও শাখা প্রশাখা দেয়নি। আর শাখা প্রশাখা লাইন দিতে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা দাবি করছে বিদ্যুৎ বিভাগে লোকজন। যার কারণে অনেক গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছাইনি।’
রঞ্জন তংচঙ্গ্যা বলেন, ‘বিদ্যুৎ মিটার আর শাখা প্রশাখা নিতে গেলে ২০ থেকে ৩০ টাকা দিতে হবে। এখানে সবাই গরীব দিনে এনে দিনে খায়। এত টাকা কিভাবে দিবে। মাত্র চার বাড়ি বিদ্যু জ্বলে অনান্য গ্রাম ও মানুষের বাড়িতে বিদ্যুৎ দুরের কথা সে আগের যুগের মতন সোলার আর চেরাগ আলোতে দিনপার করতে হচ্ছে।’
নয়াপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কফিল উদ্দিন বলেন, ‘২০২৪ সালে যোগেন্দ্র পাড়াতে বিদ্যুতের তার গেছে। কিন্তু শাখা প্রশাখা না থাকাতেই অনেকেই বিদ্যুৎ নিতে পারছে নাহ। আর মিটার নিতে বিদ্যুৎতের লোকজন টাকা চাইছে বলে অভিযোগ করেছে।’
অভিযোগ বিষয়ে লামা বিদ্যুৎ বিভাগের আবাসিক প্রকৌশলী জাকির হোসাইন বলেন, ‘কেউ টাকা চাইলে আমার অফিসে এসে যোগাযোগ করলে তারপর আমি ব্যবস্থা গ্রহন করব। কিন্তু পাড়াবাসী ত অফিসে আসে নাহ। তাছাড়া আমি ওই এলাকার নাম শুনেছি একবারও যাওয়া হয়নি। যদি বিদ্যুৎ লাইন বা শাখা প্রশাখা দেয়ার প্রয়োজন হয় তাহলে সেসব ব্যবস্থা করে দেয়া হবে।’ আর কোনো কর্মচারী টাকা চাইলে সরাসরি অফিসে এসে অভিযোগ করলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।