Image description

এক বছরের দায়িত্ব পালন শেষে ২০২৫ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদের সমাপনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে ডাকসুর কোষাধ্যক্ষ, কেন্দ্রীয় সংসদের নেতৃবৃন্দ এবং জগন্নাথ হল ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাকি হল সংসদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। আজ সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে এ সম্মেলন শুরু হয়। পরে সাড়ে ৯টায় শেষ হয় এ সম্মেলন। 

অনুষ্ঠানে হল প্রতিনিধিরা দায়িত্ব পালনকালে নিজেদের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা, প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতা এবং শিক্ষার্থীদের কল্যাণে নেওয়া উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে বক্তাদের বক্তব্যে উঠে আসে পরবর্তী ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন দ্রুত আয়োজনের দাবি। তবে সমাপনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও অনুপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও ডাকসুর সভাপতি অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম। 

আয়োজকদের বক্তব্য অনুযায়ী, উপাচার্যের সিদ্ধান্ত ও নির্ধারণ করা সময় অনুযায়ী অনুষ্ঠান আয়োজন করা হলেও তিনি সেখানে উপস্থিত হননি। পরবর্তীতে তার সঙ্গে যোগাযোগের জন্য ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি বলে জানানো হয়। এ ঘটনায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ডাকসু নেতৃবৃন্দের বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষের বিষয়টি উঠে আসে।

সমাপনী অনুষ্ঠানে ডাকসুর সহ-সভাপতি (ভিপি) সাদিক কায়েম বলেন, ডাকসু ও হল সংসদের বিভিন্ন অর্জন সম্ভব হয়েছে কেন্দ্রীয় ও হল সংসদের সদস্যদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা এবং টিম হিসেবে কাজ করার কারণে। তবে ব্যর্থতার দায় নিজের ওপর নিয়ে তিনি বলেন, ব্যর্থতার কথা বললে সেটি তার একান্ত ব্যর্থতা এবং তার ‘সীমাহীন অযোগ্যতা’ বলেও বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে দায়িত্ব পালনে আন্তরিকতা ও ভালোবাসার কোনো ঘাটতি ছিল না বলে উল্লেখ করেন তিনি।

ক্যাম্পাসে ইতিবাচক পরিবর্তনের ধারা অব্যাহত রাখতে দ্রুত ডাকসু নির্বাচন আয়োজনের ওপর জোর দেন সাদিক কায়েম। তিনি বলেন, এ বিষয়ে কোনো ধরনের আপস করা যাবে না। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে দ্রুত সময়ের মধ্যে ডাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আহ্বান জানান তিনি। ক্যাম্পাসে দখলদারিত্ব, গণরুম ও গেস্টরুম সংস্কৃতি ফিরে না আসার বিষয়েও সতর্ক করেন তিনি। শিক্ষার্থীদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আচরণ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন ডাকসু ভিপি। তার অভিযোগ, দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রশাসনের অসহযোগিতা ও প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাদের।

সাদিক কায়েম আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বর বন্ধ করার উদ্দেশ্যে তদন্ত কমিটি গঠনের মাধ্যমে ভয় বা আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করা যাবে না। শাহবাগ থানায় ডাকসু প্রতিনিধির ওপর হামলা, সাংবাদিকদের ওপর হামলা এবং এফএইচ হলের এক শিক্ষার্থীকে নির্যাতনের অভিযোগের বিচারও দাবি করেন তিনি। পাশাপাশি ডাকসু ভবনে সাম্প্রতিক ‘মব’ তৈরির ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

তিনি বলেন, জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখতে হবে এবং শিক্ষার্থীদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতেই ক্যাম্পাসের নেতৃত্ব থাকা উচিত। প্রয়োজনে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে উপাচার্যের কার্যালয়ে অবস্থান কর্মসূচি পালনের প্রস্তুতির কথাও জানান তিনি।

‘নির্বাচনের পর হল দখলের ধারাবাহিকতা এবার ভেঙেছে’
ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফরহাদ বলেন, এক বছর আগে ডাকসু নির্বাচন হবে, শিক্ষার্থীরা তাদের নির্বাচিত করবে এবং কাজ করার সুযোগ পাবেন এমনটি তিনি কল্পনাও করেননি। দায়িত্ব পালনের সুযোগ পাওয়াকে তিনি শিক্ষার্থীদের অবদান হিসেবে উল্লেখ করেন।

দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ক্যাম্পাসে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের হল দখল, সংঘাত ও আধিপত্য বিস্তারের যে ধারাবাহিকতা ছিল, এবারের ডাকসু নির্বাচনের পর তা ভেঙেছে বলে দাবি করেন ফরহাদ। তিনি বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পরও কোনো ছাত্র সংগঠন হল দখলের চিন্তা বা সাহস করেনি এটি শিক্ষার্থীদের ভোটের বড় অর্জন। দায়িত্ব পালনকালে ডাকসুর একাধিক প্রতিনিধি হামলা ও নানা বাধার শিকার হয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব প্রতিকূলতার মধ্যেও হল বা শিক্ষার্থীদের আবাসন দখল হতে দেওয়া হয়নি।

পরবর্তী ডাকসুর প্রতি প্রত্যাশা জানিয়ে ফরহাদ বলেন, তাদের স্বপ্ন হলো পরবর্তী নেতৃত্ব এসে যেন বলতে পারে, ‘সাদিক-ফরহাদরা যা করে যেতে পারেনি, আমরা তা করে দিয়েছি।’ তাদের চেয়ে পরবর্তী ডাকসু আরও বেশি কাজ করলে সেটিই হবে বর্তমান নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় সাফল্য বলে উল্লেখ করেন তিনি।

‘আবাসন সংকট আবারও ফিরে আসছে’
ডাকসুর এজিএস মহিউদ্দিন খান নলেন বলেন, হল সংসদের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কল্যাণে ডাকসুর বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয়েছে। এ কাজে হল সংসদের প্রতিনিধিরা সর্বোচ্চ সহযোগিতা করেছেন।

তবে বর্তমানে হলগুলোর আবাসন সংকট আবারও ফিরে আসছে বলে সতর্ক করেন তিনি। শিক্ষাজীবন শেষ করা শিক্ষার্থীদের নিয়মতান্ত্রিকভাবে হল ছাড়ার কথা থাকলেও অনেকে তা না করায় নতুন শিক্ষার্থীদের জন্য আসন সংকট তৈরি হচ্ছে বলে জানান তিনি।তার দাবি, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের তুলনায় ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের জন্য কম সংখ্যক আসন দেওয়া সম্ভব হয়েছে। ফলে কৃত্রিম আবাসন সংকট তৈরি হয়ে ভবিষ্যতে গণরুম ও গেস্টরুম সংস্কৃতি ফিরে আসার আশঙ্কা রয়েছে।

এ বিষয়ে হল প্রশাসনকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কোনোভাবেই অছাত্রদের হলে অবস্থানের সুযোগ দেওয়া যাবে না। শিক্ষার্থীদের নির্বাচিত হল প্রতিনিধিদেরও এ বিষয়ে প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে।

‘ডাকসু নির্বাচন কবে প্রশাসনের কাছেই নেই উত্তর’
পরবর্তী ডাকসু নির্বাচন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সুস্পষ্ট কোনো রূপরেখা না থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন এজিএস মহিউদ্দিন খান নলেন। তিনি বলেন, ডাকসুর মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পরবর্তী নির্বাচন নিয়ে একটি ন্যূনতম রূপরেখা দেওয়ার প্রয়োজন ছিল। সর্বশেষ কার্যনির্বাহী সভাতেও বিষয়টি উত্থাপন করা হলেও ডাকসুর সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পক্ষ থেকে কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। এমনকি ডাকসু পরিচালনার জন্য বাজেট নেই বলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। 

তার প্রশ্ন, বিভিন্ন নিয়ম-কানুন ও অধ্যাদেশের ভিত্তিতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও সংবিধিবদ্ধ ছাত্র সংসদের নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে কেন সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত নেই।তিনি বলেন, গত এক বছরে ক্যাম্পাসে যে ইতিবাচক কাজ হয়েছে, তাতে ডাকসু ও হল সংসদের বিশেষ ভূমিকা ছিল। এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন আয়োজন করতে হবে।

‘বর্তমান ডাকসু শিক্ষার্থীবান্ধব কাজে ব্যতিক্রম’
সমাপনী অনুষ্ঠানে ডাকসুর কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. এইচ. এম. মোশারফ হোসেন বর্তমান কমিটির কার্যক্রমের প্রশংসা করেন। অতীতের ক্যাম্পাসের পরিবেশের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করে তিনি বলেন, আগে শিক্ষার্থীদের আবাসন, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক আধিপত্যসহ নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।নিজের ছাত্রজীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি জানান, হলে সিট পাওয়ার পর প্রথম দিনই অস্ত্রের মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা তার হয়েছিল। অন্যদিকে, এক শিক্ষার্থীকে বইপত্র ও জামাকাপড় নিয়ে বড় ব্যাগসহ ক্যাম্পাসে দিন কাটাতে দেখেছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

কোষাধ্যক্ষের মতে, ডাকসু নির্বাচনের পর ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা, শান্তি ও শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। অতীতের ডাকসুগুলোর সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, আগের বিভিন্ন সময়ে ছাত্র নেতৃত্বের সঙ্গে মাস্তানি, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও আধিপত্যের সংস্কৃতি জড়িয়ে থাকলেও বর্তমান ডাকসুর ক্ষেত্রে তিনি তার ব্যতিক্রম দেখেছেন।

ডাকসু ও হল সংসদের নেতৃবৃন্দকে ‘সেবক ও কর্মী’ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তারা অহংকার বা নেতৃত্ব জাহির করার পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কাজ করার চেষ্টা করেছেন। নিজেদের সময়, শ্রম ও বিভিন্ন উৎস থেকে সহায়তা সংগ্রহ করে শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করায় তাদের ধন্যবাদ জানান তিনি।

সম্প্রতি ডাকসু ও হল সংসদের কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত বা আইনি জটিলতার প্রসঙ্গেও দুঃখ প্রকাশ করেন কোষাধ্যক্ষ। তার দাবি, এসব কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের ক্ষতি না হয়ে বরং তাদের কল্যাণই হয়েছে।সবশেষে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও কল্যাণের স্বার্থে দ্রুত ডাকসু নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানান তিনি।

সমাপনী অনুষ্ঠানে বক্তাদের বক্তব্যে একদিকে গত এক বছরের কার্যক্রমের সাফল্য-ব্যর্থতার মূল্যায়ন, অন্যদিকে হল সংসদগুলোর সীমাবদ্ধতা ও প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতার চিত্র উঠে আসে। একই সঙ্গে বক্তাদের প্রায় অভিন্ন দাবিতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও শিক্ষার্থীবান্ধব কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে দ্রুত ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন আয়োজন এখন সময়ের দাবি।