Image description

অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ওঠা ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ গত জানুয়ারি মাস থেকেই আওয়ামী প্রোপাগান্ডা পেজ থেকে ছড়াচ্ছিল, যেগুলো মূলত এআই দিয়ে লেখা ভুয়া ও সূত্রবিহীন প্রতিবেদন। সাত মাস আগে এআই দিয়ে তৈরি প্রতিবেদনে দেওয়া একই হিসাব পরে দুদকের অভিযোগে তুলে ধরা হয়েছে বলে ডিজিটাল অনুসন্ধানী মিডিয়া ‘রিউমর স্ক্যানার’-এর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

 

বিজ্ঞাপন

রিউমর স্ক্যানার বলেছে, পাচারের এই অভিযোগটি গত জানুয়ারি মাস থেকেই আওয়ামী প্রোপাগান্ডা পেজ থেকে ছড়াচ্ছিল, যেগুলো মূলত এআই দিয়ে লেখা ভুয়া ও সূত্রবিহীন প্রতিবেদন।

 

 

ছবি: রিউমর স্ক্যানার
ছবি: রিউমর স্ক্যানার

 

 

রিউমর স্ক্যানার তাদের প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করেছে, গত ৩০ জানুয়ারি ‘ড. ইউনুসের আশকারায় সাবেক স্থানীয় সরকার ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূইয়ার বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ। ক্রীড়াঙ্গনে অস্থিরতা, ক্রিকেটে বিপর্যয় ও ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের বিস্তার’ দীর্ঘ শিরোনাম দিয়ে ডেস্ক রিপোর্ট হিসেবে কথিত একটি প্রতিবেদন ‘দৈনিক আজকের কন্ঠ’ নামের একটি ফেসবুক পেজে প্রকাশ করা হয়। পোস্টটিতে দাবি করা হয়, বিভিন্ন নথি, সংশ্লিষ্ট সূত্র এবং ক্রীড়া ও অবকাঠামো খাতের একাধিক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির তথ্যমতে, ড. মুহাম্মদ ইউনুসের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ আশকারা ও রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়ন, স্টেডিয়াম সংস্কার, যুব ক্রীড়া প্রকল্প এবং স্থানীয় সরকারভিত্তিক উন্নয়ন প্রকল্পের নামে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হচ্ছে।

 

দীর্ঘ এই প্রতিবেদনের কোনো অংশে সুনির্দিষ্টভাবে সংশ্লিষ্ট কারো নাম উল্লেখ করে বক্তব্য, প্রমাণ বা তথ্য উপস্থাপন করা হয়নি৷ চ্যাটজিপিটি আলোচিত প্রতিবেদনটি বিশ্লেষণ করে জানায়, এটিতে এআই-জেনারেটেড বা এআই-সহায়তায় লেখা হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি। কারণ লেখাটিতে অত্যন্ত গুরুতর ও নির্দিষ্ট অভিযোগ করা হলেও অধিকাংশ তথ্যের উৎস অস্পষ্ট—বারবার “সূত্রগুলোর দাবি”, “সংশ্লিষ্টরা বলছেন” বা “অভিযোগ রয়েছে” বলা হয়েছে, কিন্তু কোনো নথি, তদন্ত, ব্যক্তি বা যাচাইযোগ্য সূত্র নেই। পাশাপাশি বিভিন্ন খাতের অসংখ্য অভিযোগ, প্রকল্পের পরিসংখ্যান, অর্থপাচার, অফশোর কোম্পানি ও বিদেশে বিনিয়োগের মতো তথ্য একসঙ্গে সাজানো হয়েছে, যা এআই দিয়ে তৈরি অভিযোগভিত্তিক লেখার সাধারণ বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মেলে। একাধিক এআই টুলও এই লেখাকে এআই জেনারেটেড হিসেবে অভিহিত করেছে।

 

 

ছবি: রিউমর স্ক্যানার
ছবি: রিউমর স্ক্যানার

 

 

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগের দিন, ১১ ফেব্রুয়ারি একই পেজ থেকে অর্থ পাচার সংক্রান্ত একই দাবিটি পুনরায় আরো বিস্তৃত পরিসরে প্রচার করা হয়৷ গোয়েন্দা সূত্র ও আন্তর্জাতিক ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্সের নথিপত্রের বরাত দিয়ে এবার দাবি করা হয়, পাচারের ১১ হাজার কোটি টাকার মধ্যে প্রায় ৪,৫০০ কোটি টাকা দুবাইতে (সংযুক্ত আরব আমিরাত), প্রায় ৩,০০০ কোটি টাকা সিঙ্গাপুরে, ২,০০০ কোটি টাকা অস্ট্রেলিয়ায় এবং ১,৫০০ কোটি টাকা সুইজারল্যান্ডে বিনিয়োগ করা হয়েছে। একই পোস্টে আরো বলা হয়, “অভিযোগ আছে, শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পে ১২০০ কোটি টাকা ব্যয় বাড়ানোর একক কারিগর ছিলেন আসিফ মাহমুদ।”

 

এই প্রতিবেদনটিও চ্যাটজিপিটি বিশ্লেষণ করে জানায়, এটিতেও এআই-জেনারেটেড বা এআই-সহায়তায় তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি। কারণ অত্যন্ত নির্দিষ্ট ও গুরুতর অভিযোগের সঙ্গে বিপুল অঙ্কের টাকা, বিদেশি সম্পত্তি, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও ব্যক্তিদের নাম উল্লেখ করা হলেও কোনো যাচাইযোগ্য নথি, গোয়েন্দা প্রতিবেদন, ব্যাংক রেকর্ড বা নির্দিষ্ট সূত্র দেওয়া হয়নি। লেখাটিতে অতিনাটকীয় ভাষা, যেমন “মানিলন্ডারিং বোমা”, “অফশোর সাম্রাজ্য”, “দুবাই সিন্ডিকেট” এবং সাজানো অভিযোগের তালিকাও এআই-ধাঁচের লেখার সঙ্গে মেলে। বিশেষ করে একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধমূলক অভিযোগকে প্রমাণিত তথ্যের মতো উপস্থাপন করা হয়েছে, যা ভুয়া বা মনগড়া তথ্য তৈরির সম্ভাবনাও নির্দেশ করে।

 

আজকের কণ্ঠ আওয়ামী পন্থীদের পরিচালিত একটি প্ল্যাটফর্ম। একাধিক ফেসবুক পেজের মাধ্যমে অন্তত গত বছরের মধ্যবর্তী সময় থেকে নিয়মিত অপতথ্য ছড়ানোর ইতিহাস রয়েছে প্ল্যাটফর্মটির বিরুদ্ধে। রিউমর স্ক্যানারসহ দেশের একাধিক ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান বিগত সময়ে একাধিক বার প্ল্যাটফর্মটির ছড়ানো অপতথ্য যাচাই করে ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। 

ডিজিটালম্যাপ দেখুন

 

 

আলোচিত পোস্টে উল্লিখিত একই টাকার অংকগুলো সাত মাস পর দুদকের গতকালের অভিযোগেও পাওয়া যায়। অভিযোগে বলা হয়, আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া দুবাইয়ে ৪,৫০০ কোটি, সিঙ্গাপুরে ৩,০০০ কোটি, অস্ট্রেলিয়ায় ২,০০০ কোটি এবং সুইজারল্যান্ডে ১,৫০০ কোটি টাকা পাচার করে সেখানে বিলাসবহুল ভিলা ক্রয় ও বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন। একইসাথে, শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পে ১২০০ কোটি টাকা ব্যয় বাড়ানোর বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে একই অভিযোগে।

 

 

ছবি: রিউমর স্ক্যানার
ছবি: রিউমর স্ক্যানার

 

 

এ বিষয়ে জানতে দুদকের জনসংযোগ বিভাগের উপপরিচালক মো. আকতারুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি রিউমর স্ক্যানারকে জানান, “অভিযোগের বিষয়টা তো একদমই গোপনীয় জিনিস এটা কখনোই জানার সুযোগ নেই। আর জনসংযোগ এ বিষয়ে তেমন কিছুই জানেনা। আমাদের হাতে লেখাটি দিয়ে সংবাদ সম্মেলন করতে বলা হয়েছে আমরা সেটা করেছি।” 

ই-পেপারসাবস্ক্রাইব করুন

 

 

ছবি: রিউমর স্ক্যানার
ছবি: রিউমর স্ক্যানার

দুদক বিষয়টিকে অভিযোগ হিসেবে জানালেও কিছু গণমাধ্যম বিষয়টিকে সিদ্ধান্তমূলক হিসেবে উপস্থাপন করেছে। একাত্তর টিভি ফেসবুকে এ সংক্রান্ত খবরের ফটোকার্ডের শিরোনাম দিয়েছে, “১১ হাজার কোটি টাকা পাচার আসিফের, টাকা আছে সুইস ব্যাংকেও: দুদক”। গণমাধ্যমটির ক্রীড়া পেজ ‘খেলাযোগ’ও একই শিরোনামে ফটোকার্ড প্রকাশ করেছে৷ ইংরেজি দৈনিক ডেইলি সান এর বাংলা সংস্করণের ফেসবুক পেজে দুদকের সংবাদ সম্মেলনের ভিডিওতেই একই থাম্বনেইল ও ক্যাপশন দেওয়া হয়েছে। ‘আসিফ মাহমুদের টাকা আছে সুইস ব্যাংকেও: দুদক’, এমন শিরোনামে ফটোকার্ড প্রচার করেছে জাতীয় দৈনিক কালের কণ্ঠ। স্টার নিউজের ফেসবুক পেজের ক্যাপশনেও একই তথ্য ‘সুইস ব্যাংকসহ ৪ দেশে আছে আসিফ মাহমুদের টাকা’ এভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

শুধু গণমাধ্যমই নয়, গতকাল দুদকের সংবাদ সম্মেলনের পর বিষয়টিকে সিদ্ধান্তমূলক হিসেবে দেখানোর এই তালিকায় শামিল ছিলেন সাংবাদিক, এক্টিভিস্টরাও। 

ডিজিটালম্যাপ দেখুন

 

 

আলেচিত এই অভিযোগকে ঘিরে অপতথ্যও ডালপালা মেলেছে। দুদক এখনও বিষয়টিকে অভিযোগ হিসেবে সামনে আনলেও ফেসবুকে কিছু পোস্টে (১, ২) দাবি করা হয়েছে, “পীর সাহেব আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচার ও সুইস ব্যাংকে একাউন্টের সত্যতা পেয়েছে দুদক।”

 

 

ছবি: রিউমর স্ক্যানার
ছবি: রিউমর স্ক্যানার 
ই-পেপারসাবস্ক্রাইব করুন

আবার কতিপয় পোস্টে এমনও দাবি করা হয়েছে যে আসিফকে এই অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

 

যদিও ফটোকার্ডে থাকা ছবিটি এআই দিয়ে বানানো এবং আসিফকে গ্রেপ্তারের দাবিটিও মিথ্যা। Naznin Sultana নামের ভুয়া এই পেজটি থেকে নিয়মিতই এমন কল্পিত তথ্য সংবলিত ফটোকার্ড বানিয়ে প্রচারের প্রমাণ মিলেছে।

 

এছাড়া, “১১ হাজার কোটি টাকার মানি লন্ডারিংয়ের কারণে আসিফ মাহমুদকে খোঁজছে পুলিশ, সেই ভয়ে বাথরুমে লুকিয়ে আছে।” ক্যাপশনে একটি ভিডিও গত রাত থেকে ছড়িয়েছে ফেসবুকে। তবে রিউমর স্ক্যানার যাচাই করে দেখেছে, ভিডিওটি ২০২২ সালের।

 

সবমিলিয়ে, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগটি দুদকের সংবাদ সম্মেলনের প্রায় সাত মাস আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত কথিত এআই-নির্ভর প্রতিবেদনে দুবাইয়ে ৪,৫০০ কোটি, সিঙ্গাপুরে ৩,০০০ কোটি, অস্ট্রেলিয়ায় ২,০০০ কোটি ও সুইজারল্যান্ডে ১,৫০০ কোটি টাকা পাচারের দাবি করা হয়। একই সঙ্গে শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পের ব্যয় ১,২০০ কোটি টাকা বাড়ানোর অভিযোগও করা হয়েছিল-যে হিসাবগুলো পরবর্তীতে দুদকের উত্থাপিত অভিযোগের সঙ্গে মিলে যায়। দুদকের অভিযোগকে কেন্দ্র করে নতুন করে একাধিক অপতথ্য ছড়ায়। কোথাও অভিযোগটিকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করে বলা হয়, আসিফ মাহমুদের টাকা সুইস ব্যাংকে রয়েছে; কোথাও দাবি করা হয় দুদক এসব অর্থের সত্যতা পেয়েছে। এমনকি আসিফ মাহমুদকে এ অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে-এমন দাবিও ছড়ানো হয়, যার সঙ্গে ব্যবহৃত গ্রেপ্তারের ছবিটিও ছিল এআই-নির্মিত।

 

 

ছবি: রিউমর স্ক্যানার
ছবি: রিউমর স্ক্যানার

 

 

সার্বিক বিষয়ে জানতে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি রিউমর স্ক্যানারকে জানান, নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী সংগঠন ছাত্রলীগের এক নেতার অনলাইন পোর্টাল আজকের কণ্ঠের মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর রিপোর্ট ধরে হুবহু চালিয়ে দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এটি নিশ্চিতভাবেই বলা যায় উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। পতিত আওয়ামী ফ্যাসিবাদের দোসরদের ছড়ানো গুজব ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে রচিত প্রোপাগান্ডাকে ভিত্তি করে দুদকের মতো একটি রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে ব্যবহার করা প্রমাণ করে যে, বিএনপি সরকার অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দুদককে দলীয়করণ করেছে। এটা আওয়ামী লীগের আমলেও করা হতো, এখনো হচ্ছে।

 

সূত্র: রিউমর স্ক্যানার