Image description

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় করা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আজ সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) আদালতে দাখিলের কথা রয়েছে। প্রায় এক দশক ধরে তদন্ত চললেও এখনো প্রতিবেদন দিতে পারেনি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। নির্ধারিত সময়ে প্রতিবেদন দাখিল করতে না পারায় এরই মধ্যে ৯৭তম বারের মতো সময় পেয়েছে সংস্থাটি।

২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব থেকে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরির ঘটনায় করা এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আজ জমা হবে কি না তা নিয়ে চলছে আলোচনা।

এর আগে গত ৯ আগস্ট ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সেফাতুল্লাহর আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য ছিল। সেদিন সিআইডি প্রতিবেদন জমা দিতে না পারায় শুনানি শেষে আদালত নতুন করে ১৪ সেপ্টেম্বর তারিখ নির্ধারণ করেন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) প্রসিকিউশন বিভাগের উপ-পরিদর্শক (এসআই) রুকনুজ্জামান জাগো নিউজকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

 

২০১৬ সালে মামলা, তদন্তভার সিআইডিতে

২০১৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি সাইবার হামলার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব থেকে ৮ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার চুরি হয়। তদন্তসংশ্লিষ্টদের ধারণা, দেশের ভেতরের একটি চক্রের সহায়তায় এ অর্থ চুরি ও পরে পাচার করা হয়েছিল।

ঘটনার পর একই বছরের ১৫ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগের তৎকালীন উপ-পরিচালক জোবায়ের বিন হুদা মতিঝিল থানায় মামলা করেন। মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে করা ওই মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করা হয়।

পরদিন ১৬ মার্চ মামলাটির তদন্তভার সিআইডিকে দেওয়া হয়। এরপর প্রায় এক দশক ধরে মামলাটির তদন্ত করছে সংস্থাটি। তবে এত দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা সম্ভব হয়নি।

 

আজ কি মিলবে তদন্ত প্রতিবেদন?

দেশে করা মূল মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আজ সোমবার দিন নির্ধারিত রয়েছে। এর আগে ৯ আগস্ট প্রতিবেদন দাখিল করতে না পারায় আদালত ১৪ সেপ্টেম্বর নতুন তারিখ দেন। এতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ ৯৭তমবারের মতো পিছিয়ে যায়।

তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুতের ক্ষেত্রে বর্তমানে তদন্ত সংস্থা সিআইডি কোন পর্যায়ে রয়েছে, তা জানতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তবে তাৎক্ষণিকভাবে কেউ এই বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।

যেভাবে সরানো হয় ১০১ মিলিয়ন ডলার

তদন্তসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ৪ ও ৫ ফেব্রুয়ারি নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব থেকে প্রায় ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়। এর আগে অর্থ সরাতে ৩৫টি ভুয়া সুইফট বার্তা পাঠানো হয়েছিল।

এসবের মধ্যে পাঁচটি নির্দেশনা কার্যকর হয়। এর মাধ্যমে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনের (আরসিবিসি) চারটি হিসাবে এবং ২ কোটি ডলার শ্রীলঙ্কায় পাঠানো হয়।

শ্রীলঙ্কায় পাঠানো অর্থের লেনদেনে নামের বানান ভুল থাকায় সেটি আটকে যায়। পরে পুরো ২ কোটি ডলারই বাংলাদেশে ফেরত আসে।

অন্যদিকে ফিলিপাইনে যাওয়া ৮ কোটি ১০ লাখ ডলারের বড় অংশ বিভিন্ন ক্যাসিনোর মাধ্যমে দ্রুত সরিয়ে ফেলা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ফিলিপাইন থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। ফলে চুরি যাওয়া অর্থের প্রায় ৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার এখনো উদ্ধারের বাইরে রয়েছে।

তদন্ত নিয়ে সিআইডির অবস্থান

রিজার্ভ চুরি মামলার তদন্ত ও সম্ভাব্য অভিযোগপত্র নিয়ে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে নানা তথ্য প্রকাশিত হলেও এসব তথ্যের বিষয়ে সতর্ক অবস্থান জানিয়েছে সিআইডি।

চলতি বছরের ১৯ জুন সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান জানান, রিজার্ভ চুরি মামলার তদন্ত ও খসড়া অভিযোগপত্র নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যকে সিআইডির আনুষ্ঠানিক বক্তব্য হিসেবে গণ্য না করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।

মামলার তদন্ত শেষ না হলেও চুরি যাওয়া অর্থ উদ্ধারে দেশি-বিদেশি পর্যায়ে আইনি ও আর্থিক তৎপরতা চলছে। বাংলাদেশ ব্যাংক একদিকে ফিলিপাইনের আরসিবিসির সঙ্গে সালিশ প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে চলমান মামলাও এগিয়ে নিচ্ছে।

এর আগে কয়েকটি গণমাধ্যমে মামলার খসড়া অভিযোগপত্র প্রস্তুত এবং এতে ৬৪ ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করার খবর প্রকাশিত হয়। তবে সিআইডি ওই তথ্য সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান ও নাকচ করে দেয়। সংস্থাটি জানায়, প্রতিবেদন তৈরির তথ্য ভিত্তিহীন এবং মামলাটির তদন্ত তখনও চলমান ছিল।

জসীম উদ্দিন খান বলেন, বিভিন্ন গণমাধ্যমে রিজার্ভ চুরি মামলার তদন্ত ও খসড়া চার্জশিট সংক্রান্ত যে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে, সেখানে সিআইডির কর্মকর্তাদের বরাতে যে তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে, তা সিআইডির কোনো কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে দেননি।

তিনি বলেন, এসব বক্তব্যকে সিআইডির আনুষ্ঠানিক অবস্থান হিসেবে বিবেচনা না করার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে। মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্তের স্বার্থে এ মুহূর্তে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব নয়।

তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন দাখিলের পর সিআইডি প্রেস ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে হালনাগাদ তথ্য জানাবে বলেও জানিয়েছিলেন তিনি।

একই সঙ্গে রিজার্ভ চুরি মামলার বিষয়ে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে সিআইডির আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি অথবা মুখপাত্রের বক্তব্য অনুসরণ করার জন্য গণমাধ্যমকে অনুরোধ জানানো হয়।

সিআইডির পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, পেশাদারত্ব ও আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে মামলার তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হবে।

অর্থ উদ্ধারে বাংলাদেশ ব্যাংকের আইনি তৎপরতা

মামলার তদন্ত শেষ না হলেও চুরি যাওয়া অর্থ উদ্ধারে দেশি-বিদেশি পর্যায়ে আইনি ও আর্থিক তৎপরতা চলছে। বাংলাদেশ ব্যাংক একদিকে ফিলিপাইনের আরসিবিসির সঙ্গে সালিশ প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে চলমান মামলাও এগিয়ে নিচ্ছে। ২০২৫ সালের ৬ অক্টোবর সংশ্লিষ্ট এক বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছিলেন।

ওই কর্মকর্তা জানান, আরসিবিসির কাছে চুরি যাওয়া মূল অর্থের পাশাপাশি সুদ ও আইনি খরচও দাবি করা হয়েছে। এ বিষয়ে সিঙ্গাপুরে আরসিবির সঙ্গে বৈঠকও হয়েছিল বলে তিনি জানান।

নিউইয়র্কে মামলা, ২০২০ সালে নতুন আইনি লড়াই

চুরি যাওয়া ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার উদ্ধারের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক যুক্তরাষ্ট্রের আদালতেও আইনি পদক্ষেপ নেয়। ২০১৯ সালের ৩১ জানুয়ারি নিউইয়র্কের ফেডারেল আদালতে অর্থ উদ্ধারের মামলা করা হয়। পরে ২০২০ সালের ২৭ মে নিউইয়র্কের সুপ্রিম কোর্টে আরসিবিসিসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি নিউইয়র্ক সুপ্রিম কোর্ট মামলার তিনটি অভিযোগ—কনভার্সন, কনভার্সনে সহায়তা এবং কনভার্সনের ষড়যন্ত্র—খারিজ করে। তবে মামলার অন্য অভিযোগগুলো নিয়ে আইনি প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে।

১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫: ৮১ মিলিয়ন ডলার বাজেয়াপ্তের আদেশ

অর্থ উদ্ধারের প্রচেষ্টার মধ্যে ঢাকার একটি সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত ২০২৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ফিলিপাইনের আরসিবির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৮ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার বাজেয়াপ্তের আদেশ দেন।

সিআইডির পক্ষ থেকে জানানো হয়, আদালতের আদেশের অনুলিপি ফিলিপাইনে আরসিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছেও পাঠানো হয়েছে।

সিআইডির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ১৭(২)(৭) ধারার আওতায় এ আদেশ দেওয়া হয় বলে সংস্থাটির পক্ষ থেকে জানানো হয়। আদালতের নির্দেশনায় বাজেয়াপ্ত অর্থ বাংলাদেশ সরকারের কোষাগারে ফেরত আনার কথাও উল্লেখ করা হয়।

সিআইডির তৎকালীন প্রধান মো. ছিবগাত উল্লাহর ভাষ্য অনুযায়ী, তদন্তে আরসিবিসির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা লরেঞ্জো টান, জুপিটার শাখার ব্যবস্থাপক মায়া সান্তোস দেগুইতোসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকার তথ্য পাওয়া গেছে।

তাদের বিরুদ্ধে ভুয়া হিসাব খোলা এবং চুরি করা অর্থ স্থানান্তরের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগের কথা সিআইডি জানিয়েছে।

সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে অর্থ স্থানান্তর বন্ধ করার বার্তা পাঠানো হলেও সংশ্লিষ্টরা অর্থ বিতরণে ভূমিকা রাখেন। ফিলিপাইনের আদালতে আরসিবিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দণ্ডিত হওয়ার তথ্যও সিআইডির পক্ষ থেকে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরসিবিসিকে বড় অঙ্কের জরিমানা করেছিল।

সিআইডি আরও জানিয়েছে, ২০১৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি আরসিবিসি বাংলাদেশ ব্যাংককে ৬৮ হাজার ডলার ফেরত দিয়েছিল। সংস্থাটির তদন্তে আরসিবিসিকে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ২৭ ধারার আওতায় করপোরেট সত্তা হিসেবে অর্থ পাচারের ঘটনায় দায়ী করা হয়েছে বলেও জানানো হয়।

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসিম উদ্দিন খান তখন জানিয়েছিলেন, ঢাকার আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন এবং চুরি যাওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।