Image description

 

ভাষার অধিকার, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখন নানা সংকটে জর্জরিত। শতবর্ষ পেরোনো এ প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৬৫ ভাগ নারী শিক্ষার্থীর আবাসনের ব্যবস্থা নেই। কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে আসন সীমিত। গবেষণায় ঘাটতি। আবার গবেষণায় বরাদ্দের বড় একটা অংশই থেকে যায় অব্যবহৃত। নির্ধারিত সময়ে হয় না ফলাফল প্রকাশ। ৬০ শতাংশ ভবনে নেই পর্যাপ্ত অগ্নিনিরাপত্তা। নারী শিক্ষার্থীদের হয়রানি, অনুসরণ, অশালীন আচরণ ও হামলার ঘটনা সামনে আসছে। হলের ক্যান্টিনের খাবারে পোকামাকড়, ব্লেড ও কেঁচো পাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। শিক্ষক মূল্যায়ন ও চিকিৎসা নিয়েও অভিযোগের শেষ নেই।

১৯২১ সালে তিনটি অনুষদ, ১২টি বিভাগ, ৬০ জন শিক্ষক ও ৮৭৭ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি এখন ১৩টি অনুষদ, ৮৪টি বিভাগ, ১২টি ইনস্টিটিউট, ১৯টি আবাসিক হল, তিনটি হোস্টেল ও অর্ধশতাধিক গবেষণাকেন্দ্রে বিস্তৃত। শিক্ষার্থী প্রায় ৪৩ হাজার, শিক্ষক প্রায় ২ হাজার। কালের পরিক্রমায় বিশ্ববিদ্যালয়টির পরিসর, শিক্ষার্থী ও বিভাগের সংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে বাড়েনি আবাসন, শ্রেণিকক্ষ, গবেষণা-সুবিধা, প্রশাসনিক সক্ষমতা, নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন সুযোগসুবিধা।

অক্সফোর্ডআবাসনেই সবচেয়ে বড় চাপ : বিশ্ববিদ্যালয়ের অনলাইন ভর্তি কমিটির তথ্য অনুযায়ী, মোট শিক্ষার্থী ৪২ হাজার ৮৮১ জন। এর মধ্যে নারী ২০ হাজার ৭২৯ জন। নারী শিক্ষার্থীদের জন্য হলে আসন রয়েছে প্রায় ৭ হাজার ২১০টি। এক্ষেত্রে প্রায় ৬৫ শতাংশ নারী শিক্ষার্থী হলের বাইরে থাকেন।

সংকট নিরসনে ২ হাজার ৮৪১ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এতে চারটি নারী ও পাঁচটি পুরুষ হল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে সংকটের তাৎক্ষণিক সমাধান হচ্ছে না। পুনঃভর্তি শিক্ষার্থীদের হিসাব অনুমোদিত আসনের সঙ্গে সমন্বয় না করায় গত তিন শিক্ষাবর্ষে অনুমোদিত আসনের চেয়ে ১ হাজার ১৫ জন বেশি ভর্তি হয়েছেন, যা আবাসন সংকট আরও বাড়িয়েছে। শ্রেণিকক্ষের সংকটও তীব্র। কলা ভবনের ১৭টি বিভাগের অধিকাংশের স্থায়ী শ্রেণিকক্ষ মাত্র দুটি। উর্দু, পালি ও বুদ্ধিস্ট স্টাডিজের মতো বিভাগে পাঁচ ব্যাচের ক্লাস একই কক্ষে নিতে হচ্ছে। এতে ক্লাসের সময়সূচি বদলানো, বাতিল করা কিংবা শিক্ষার্থীদের বাইরে বসানোর মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়।

প্রায় ৪৩ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে আসন মাত্র ১ হাজার ৪০০টি। শব্দদূষণ, বহিরাগতদের প্রবেশ, সাইকেল চুরি, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা ও আধুনিক গবেষণা-সুবিধার ঘাটতিও প্রকট। ডাকসুর পাঠকক্ষ সম্পাদক উম্মে সালমা বলেন, গ্রন্থাগারের অবস্থানের কারণে সড়ক, অ্যাম্বুলেন্স ও বিভিন্ন কর্মসূচির শব্দ ভিতরে প্রবেশ করে। প্রায় ৩০০ এলইডি বাতি বসানো হলেও সাউন্ডপ্রুফ গ্লাস ও সাইকেল গ্যারেজের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হয়নি।

গবেষণায় বরাদ্দ কম, ব্যয়েও ঘাটতি : ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট ১ হাজার ৩৫ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। গবেষণায় বরাদ্দ ২১ কোটি ৫৭ লাখ, অর্থাৎ মোট বাজেটের মাত্র ২ দশমিক ০৮ শতাংশ। গত পাঁচ বছরে গবেষণায় প্রায় ৭০ কোটি ৬৭ লাখ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে অব্যবহৃত থেকেছে ১৩ কোটি ৩৬ লাখ টাকার বেশি।

গবেষণাকেন্দ্রগুলোর চিত্র আরও হতাশাজনক। পাঁচ বছরে ৩৮ কোটি ২৫ লাখ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ব্যয় হয়েছে মাত্র ১৫ কোটি ১২ লাখ টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪৩টি কেন্দ্রের ১৫টি কোনো অর্থ ব্যয় করেনি। আগের বছর ৫২টির মধ্যে ১৬টি এবং ২০২২-২৩ সালে ৪৭টির মধ্যে ২০টি কেন্দ্র বরাদ্দ পেয়েও অর্থ ব্যয় করেনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬১টি গবেষণাকেন্দ্র থাকলেও কোনো কোনো কেন্দ্রে নিয়মিত কার্যক্রম, স্থায়ী কার্যালয় বা পরিচালক নেই। গবেষণা সমন্বয় ও পরিবীক্ষণ সেলের পরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ শাহাদাত হোসেন নিষ্ক্রিয় কেন্দ্রগুলো বন্ধের সুপারিশের কথা জানিয়েছেন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে গবেষণা অনুদান পাওয়া ৭৫ জনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন মাত্র ৩৮ জন।

শিক্ষক মূল্যায়ন ও ফল প্রকাশে দীর্ঘসূত্রতা : নিয়ম অনুযায়ী সেমিস্টার পদ্ধতিতে ছয় সপ্তাহ এবং বার্ষিক পদ্ধতিতে আট সপ্তাহে ফল প্রকাশের কথা থাকলেও ২০২৩ সালে চতুর্থ বর্ষের ৭৫টি চূড়ান্ত পরীক্ষার মাত্র ছয়টির ফল সময়মতো প্রকাশ হয়। ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত ৬১টি চূড়ান্ত পরীক্ষার একটিরও ফল নির্ধারিত সময়ে প্রকাশ হয়নি। এতে চাকরি ও উচ্চশিক্ষায় আবেদনের সুযোগ হারানোর অভিযোগ করেছেন শিক্ষার্থীরা। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দপ্তরের মতে, উত্তরপত্র মূল্যায়ন ও নম্বর জমা দিতে শিক্ষকদের বিলম্বের কারণে ফল আটকে থাকে।

খাবার থেকে অগ্নিনিরাপত্তা-নানা ঝুঁকি : আবাসিক হলের খাবারের মান নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগের সঙ্গে সম্প্রতি খাবারে পোকামাকড়, ব্লেড, স্ক্রাবারের অংশ ও কেঁচো পাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। সার্জেন্ট জহুরুল হক, বিজয় একাত্তর, কবি জসীমউদ্দীন ও শেখ মুজিব হলের ক্যান্টিনে এসব অভিযোগ ওঠে।

শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বছরে ৩৩০ টাকা করে স্বাস্থ্যবিমার প্রিমিয়াম নেওয়া হয়। প্রায় ৩৭ হাজার শিক্ষার্থীর কাছ থেকে বছরে ১ কোটি ২২ লাখ টাকার বেশি সংগ্রহের কথা। কিন্তু বিমা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সংকটে পুরোনো ৩৮২টি ও নতুন ৩১২টি- মোট ৬৯৪টি চিকিৎসা দাবি নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ছিল। বিশ্ববিদ্যালয় নতুন বিমা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দাবি নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে।

২০০টির বেশি ভবনের প্রায় ৬০ শতাংশে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নেই বলে অভিযোগ আছে। অনেক আবাসিক হলে জরুরি বহির্গমন পথ বা বিকল্প সিঁড়িও নেই। পুরোনো ভবন, অতিরিক্ত বৈদ্যুতিক সংযোগ, গ্যাস সিলিন্ডার ও বৈদ্যুতিক হিটার বাড়াচ্ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি ।

নারী শিক্ষার্থীদের ঝুঁকি : গত তিন মাসে নারী শিক্ষার্থীদের হয়রানি, অনুসরণ, অশালীন আচরণ ও হামলার অন্তত ১৫টি অভিযোগ সামনে এসেছে। অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান সহযোগী অধ্যাপক রেজাউল করিম সোহাগ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, উন্মুক্ত ক্যাম্পাসে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হলেও নিরাপত্তায় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

প্রতিবন্ধীদের জন্য অপ্রতুল ব্যবস্থা : গত তিন বছরে প্রতিবন্ধী কোটায় ভর্তি হয়েছেন ১২০ জন। তাদের জন্য র‌্যাম্প, হ্যান্ডরেল, ব্রেইল নির্দেশনা ও সহায়ক প্রযুক্তির ঘাটতি রয়েছে। আবাসিক হল ও চলাচলের পথে নানা জিনিসপত্র পড়ে থাকায় হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীদের চলাচাল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। গত ৭ জুলাই প্রশাসন প্রবেশগম্যতা বাড়াতে ট্যাকটাইল সুবিধা, র‌্যাম্প, ব্রেইল ও অডিও নির্দেশনাসহ বিভিন্ন সুপারিশ অনুমোদন করেছে। এখন বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ।

পরিবহন সংকট : বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহনে বিআরটিসির ৬০টি বাস ব্যবহৃত হয়। বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, এসব বাসের একটিরও বৈধ ফিটনেস সনদ নেই। বাসগুলোর ভাঙা জানালা, নড়বড়ে আসন, পানি পড়া ও ভাঙা হাতলের অভিযোগ আছে শিক্ষার্থীদের। পরিবহন ব্যবস্থাপক কামরুল হাসান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, একটি ডিপোর ওপর নির্ভরশীলতার কারণে ভালো অবস্থার বাস বাছাইয়ের সুযোগ সীমিত।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম অবশ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বের শীর্ষ ২০০ একাডেমিক প্রতিষ্ঠানের কাতারে নেওয়ার লক্ষ্য জানিয়েছেন। ৩০ জুনের সিনেট সভায় তিনি আবাসন, শ্রেণিকক্ষ ও গবেষণায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘাটতির কথা স্বীকার করে জানান, বিশ্ববিদ্যালয়টিকে এগিয়ে নিতে ১২৫তম বর্ষকে কেন্দ্র করে ১১টি কৌশলগত স্তম্ভের ওপর ২০ বছর মেয়াদি ‘ঢাকা ইউনিভার্সিটি একাডেমিক প্ল্যান (২০২৬-৪৬)’ প্রণয়ন করা হয়েছে। গবেষণার জন্য ১ হাজার কোটি এবং শিক্ষার্থীদের কল্যাণে আরও ১ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠনের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। তবে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মতে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকটের কেন্দ্রে এখন নতুন পরিকল্পনার চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে বাস্তবায়নের প্রশ্ন।