Image description

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কমছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে সেচনির্ভর উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বরেন্দ্র এলাকায়।

বছরের পর বছর অপরিকল্পিত ও অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের পাশাপাশি বৃষ্টিপাতের ধরন পরিবর্তন, জলাধার ও খাল-বিল কমে যাওয়া এবং ভূ-উপরিস্থিত পানির ব্যবহার কমে যাওয়ায় পানির স্বাভাবিক পুনর্ভরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে একদিকে বাড়ছে সুপেয় পানির সংকট, অন্যদিকে সেচনির্ভর কৃষি উৎপাদনও পড়ছে ঝুঁকিতে।

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সাতটি জেলার ভূগর্ভস্থ পানির মজুদ পুনর্ভরণের হার উদ্বেগজনকভাবে কমে যাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। স্বাভাবিকভাবে বছরে ১০০ থেকে ৫১৫ মিলিমিটার পানি ভূগর্ভে জমা হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে তা কমে ১০০ থেকে ২১০ মিলিমিটারে এসে ঠেকেছে।

গবেষণায় ১৯৮৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখানো হয়েছে, এ সময়ে ওই অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর গড়ে ১৬ মিটার থেকে নেমে ৩৬ মিটারে পৌঁছেছে। শুষ্ক মৌসুমে নাচোল, তানোর, নিয়ামতপুর ও পোরশার কিছু এলাকায় পানির স্তর ৩৩ থেকে ৩৬ মিটার নিচে নেমে যায়।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে এখনই কার্যকর ও টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়তে পারে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার (ওয়ারপো) ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (ভূগর্ভস্থ পানি) মো. আরিফ আবেদীন কালের কণ্ঠকে বলেন, রাজশাহীর কোথাও কোথাও ৮০০ ফুট গভীরেও পানির স্তর পাওয়া যাচ্ছে না।

উচ্চ বরেন্দ্র, মধ্য বরেন্দ্র ও নিম্ন বরেন্দ্র সব এলাকায়ই পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। আগে অগ্রাধিকার দিতে হবে খাওয়ার পানিকে। এরপর প্রয়োজন সেচের পানি। কিন্তু অপরিকল্পিত সেচ ব্যবস্থাপনার কারণে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে।

বরেন্দ্র অঞ্চলে সংকট বেশি : সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে বরেন্দ্র অঞ্চলে।

রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, নাটোর ও জয়পুরহাট জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা দীর্ঘদিন ধরেই ভূগর্ভস্থ পানিনির্ভর কৃষির ওপর নির্ভরশীল। গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৮৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত এই অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির গড় স্তর ছিল মাটির প্রায় ২৬ ফুট নিচে। ক্রমাগত পানি উত্তোলনের ফলে ২০১০ সালে তা নেমে ৫০ ফুটে; পরে তা কোথাও কোথও ৬০ ফুটে পৌঁছায়। বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৩২ ঘনকিলোমিটার ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা হয়। এর প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশই সেচের কাজে ব্যবহৃত হয়। বাকি প্রায় ১০ শতাংশ ব্যবহার হয় গৃহস্থালি ও শিল্প-কারখানায়। ফলে কৃষিতে সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা পানির মজুদের ওপর বড় চাপ তৈরি করছে।

সংকটাপন্ন ঘোষণা : ভূগর্ভস্থ পানির সংকট মোকাবেলায় চলতি বছরের মে মাসে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ জেলার বিস্তীর্ণ এলাকাকে পানি সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করেছে সরকার। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাওয়া এবং সেচ ও সুপেয় পানির সংকট তীব্র হওয়ায় এসংক্রান্ত সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, খাওয়ার পানি ছাড়া অন্য কোনো কারণে এসব এলাকায় নতুন করে নলকূপ স্থাপন ও ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন বন্ধ থাকবে।

কৃষিতে সরাসরি আঘাত : বাংলাদেশের কৃষি বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমের বোরো ধান চাষ অনেকাংশে ভূগর্ভস্থ পানিনির্ভর। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে সেচ সুবিধাপ্রাপ্ত জমির প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল। আবার কোনো কোনো গবেষণায় বলা হচ্ছে, বোরো চাষের প্রায় ৯১ শতাংশ সেচের পানি আসে ভূগর্ভ থেকে। কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, বোরো মৌসুমে ধানের জন্য কৃষকরা গড়ে প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় ৩৪ শতাংশ বেশি পানি ব্যবহার করেন। অতিরিক্ত এই পানি ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে না। ফলে পানি ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ানো এখন কৃষির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

কেন নামছে পানির স্তর : বিশেষজ্ঞদের মতে, কম বৃষ্টিপাত, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, বোরো চাষে অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন, শিল্প ও নগরায়ণে পানির চাহিদা বৃদ্ধি এবং পুকুর-খাল ভরাট—সব মিলিয়েই পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। বরেন্দ্র অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে সেচের জন্য গভীর ও অগভীর নলকূপের ব্যবহার বেড়েছে। একই সময়ে প্রাকৃতিক জলাধার কমেছে। ফলে বর্ষায় যে পরিমাণ পানি ভূগর্ভে ঢোকার কথা, তার তুলনায় শুষ্ক মৌসুমে উত্তোলনের পরিমাণ অনেক বেশি হয়ে যাচ্ছে। এভাবে ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ ও উত্তোলনের মধ্যে ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) প্রধান প্রকৌশলী (ক্ষুদ্র সেচ) ড. ইঞ্জিনিয়ার খান ফয়সল আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, দেশের সব এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর এক রকম নয়।

পানিসাশ্রয়ী কৃষির বিকল্প নেই : বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূগর্ভস্থ পানির সংকট মোকাবেলায় শুধু নলকূপের গভীরতা বাড়ালে চলবে না। সেচে পানির অপচয় কমাতে হবে এবং ফসল উৎপাদনের ধরনেও পরিবর্তন আনতে হবে। পানিসাশ্রয়ী সেচ প্রযুক্তির সম্প্রসারণ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, কৃত্রিম উপায়ে ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ, পুকুর-খাল-বিল পুনঃখনন এবং ভূ-উপরিস্থিত পানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে খরাসহিষ্ণু ও কম পানিতে ফলনশীল ফসলের জাত সমপ্রসারণ এবং বোরো ধানের বিকল্প হিসেবে কম পানিনির্ভর ফসলের আবাদ বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

বিএডিসির প্রধান প্রকৌশলী (ক্ষুদ্র সেচ) মুহাম্মদ বদিউল আলম সরকার কালের কণ্ঠকে বলেন, উত্তরাঞ্চলের যে এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির সংকট সেখানে সেচকাজে গভীর নলকূপ বসানো হবে না। যে নলকূপগুলো নষ্ট হয়ে যায় শুধু সেগুলোই মেরামত করা হয়। তবে সেচের জন্য নতুন প্রযুক্তি নেওয়া হচ্ছে, যাতে কম পানি লাগে। আমরা ‘স্মার্ট ইরিগেশনের’ দিকে যাচ্ছি।