Image description

চাকরি হারিয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন পুলক চ্যাটার্জী, তার মধ্যে বেছে নেন আত্মহননের পথ। তার এমন মৃত্যু মফস্বল সাংবাদিকদের যাতনার দিকটি মেলে ধরছে বলে মনে করছেন সহকর্মীরা।

 

বরিশালের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, সমকালের সাবেক ব্যুরোপ্রধান পুলক চ্যাটার্জীর ঝুলন্ত মরদেহ গতকাল শুক্রবার রাতে উদ্ধার করা হয় সমকালের বরিশাল অফিস থেকে।

 

এসময় তার পকেটে পাওয়া যায় পাঁচটি সুইসাইড নোট, যেগুলোতে চাকরি হারানোর পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের কাছে পাওনা না পাওয়ার খেদের প্রকাশ ছিল।

 

পুলকের ছোট ভাই দীপক চ্যাটার্জী বলছিলেন, ‘দাদা সমকাল থেকে চাকরি হারানোর পর মানসিক চাপে ছিলেন, হতাশও ছিলেন। তিনি সমকালে তার প্রভিডেন্ড ফান্ডের টাকা আদায়ের জন্য অনেক চেষ্টা করেছেন। তবে সেটা আদায়ে ব্যর্থ হয়েছেন। তিন বছর চেষ্টা করেও সেই টাকা আদায় করতে পারেননি। এই নিয়ে মানসিকভাবে তার অবস্থা ভালো ছিল না। তবে এই কারণে যে তিনি আত্মহত্যা করবেন, সেটা আমরা স্বপ্নেও ভাবিনি।’

 

শনিবার সন্ধ্যায় পুলক চ্যাটার্জীর সৎকার হয় বরিশাল মহাশ্মশানে। তার আগে নগরীর উত্তর মল্লিক রোডের তার বাসভবনে রাখা হয় মরদেহ।

 

সকালে পুলক চ্যাটার্জীর মরদেহের ময়নাতদন্ত হয় বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখান থেকে মরদেহ নেওয়া হয় বরিশাল প্রেস ক্লাবে। সেখানে শেষ শ্রদ্ধার অনুষ্ঠানে কান্নায় ভেঙে পড়েন তার দীর্ঘদিনের সহকর্মীরা।

 

পুলক চ্যাটার্জীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে আলোচনা চলছে, তার ছাপ ছিল সহকর্মীদের স্মরণে।

 

বরিশাল রিপোর্টার্স ইউনিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক বাপ্পী মজুমদার বলছিলেন, ‘পুলক চ্যাটার্জীর মৃত্যুটা মফস্বল সাংবাদিকতার শেষ পরিণতিকে দেখিয়েছে। তরুণ বয়সে খাটিয়ে নিয়ে, বুড়ো বয়সে চাকরিচ্যুত করা। যে মানুষটা জীবন হুমকির মুখে রেখে শত শত ক্রাইম নিউজ করেছেন নিজের প্রতিষ্ঠানের জন্য, সেই মানুষটাকে মরতে হলো শেষ পর্যন্ত ওই প্রতিষ্ঠানের জন্যই।’

 

পুলক চ্যাটার্জী ২০২৩ সালে সমকাল থেকে চাকরি হারানোর পর আর্থিক সংকটে ছিলেন। একটি সুইসাইড নোটে তিনি সমকালের বর্তমান বরিশাল ব্যুরোপ্রধান সুমন চৌধুরীকে লিখে যান, ‘সমকালের কাছে পাওনা টাকা আদায় করে তোমার বউদির কাছে বুঝিয়ে দিও।’

 

পুলক চ্যাটার্জী আগে দৈনিক যুগান্তরে কাজ করতেন। সেখান থেকে সমকালে যোগ দিয়েছিলেন তিনি।

 

তার দীর্ঘ বছরের সহচর দৈনিক যুগান্তরের বরিশাল ব্যুরোপ্রধান আকতার ফারুক শাহিন বলছিলেন, ‘একই ভবনে যুগান্তর ও সমকালের অফিস। যুগান্তর তৃতীয় তলা ও সমকাল দ্বিতীয় তলায়। সমকাল থেকে অব্যাহতি পাওয়ার পরও দীর্ঘ বছরের অভ্যাস হিসেবে পুলকদা সমকাল অফিসে আসতেন জানতাম। পত্রিকা পড়ে সময় অতিবাহিত করে আবার চলে যেতেন।

 

‘তার মতো জ্ঞানী-গুণী মানুষ এমনভাবে আত্মহনন করবে, সেটা কখনো ভাবিনি। শুক্রবার সন্ধ্যায় সমকালের ব্যুরোপ্রধান সুমন যুগান্তর অফিসে দৌড়ে এসে পুলকদার আত্মহননের কথা জানায়। সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ে নেমে সেই চিত্র দেখে হতবিহ্বল হয়ে পড়ি। থানায় খবর দিই, পুলিশ এসে সমকাল অফিসের দরজা ভেঙে প্রিয় পুলকদার লাশ উদ্ধার করে।’

 

বরিশাল প্রেস ক্লাবের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এম মোফাজ্জেল হোসেন সহকর্মী পুলক চ্যাটার্জীর এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না। তিনি বলেন, ‘তিনি আত্মহত্যা করতে পারেন না। তাকে এই পথে আনতে বাধ্য করা হয়েছে। মফস্বল সাংবাদিকতা কতটা কঠিন, সেটি নিজের জীবন দিয়ে পুনরায় প্রমাণ করে গিয়েছেন।’

 

বরিশাল প্রেস ক্লাবের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য মইনুল ইসলাম সবুজ জানান, চাকরি চলে যাওয়ায় মনে চাপা কষ্ট থাকলেও তা কখনো বুঝতে দিতেন না পুলক চ্যাটার্জী।

 

‘পুলকদা মরে গিয়ে দেশের ১৪৩৬ পত্রিকা কর্তৃপক্ষের কাছে মেসেজ দিয়ে গিয়েছেন। মফস্বল সাংবাদিকরা কী অবস্থায় রয়েছে, তাদের জীবনের নিরাপত্তা, আর্থিক নিরাপত্তা পুলকদার প্রাণ বিসর্জনের মধ্য দিয়ে প্রস্ফুটিত হয়েছে।’

 

পুলক চ্যাটার্জীর মুখাগ্নি শেষে তার ভাই দীপক চ্যাটার্জী বলছিলেন, সমকাল তার রক্তের সঙ্গে মিশে ছিল। চাকরিচ্যুত হওয়ার বিষয়টি মেনে নিতে পারছিলেন না তিনি।

 

বরিশাল প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসেন জানান, সমকাল কর্তৃপক্ষ তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। পুলক চ্যাটার্জীর পাওনা টাকার বিষয়ে কথা হয়েছে।

 

পুলক চ্যাটার্জীর মৃত্যুর ঘটনায় একটি অপমৃত্যু মামলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সমকালের ব্যুরোপ্রধান সুমন চৌধুরী। জ্যেষ্ঠ সহকর্মীর মৃত্যুতে তিনিও শোকগ্রস্ত।

 

সমকাল বরিশাল অফিসের অফিস সহায়ক দীপক দাস জানিয়েছেন, শুক্রবার ১টার দিকে তিনি অফিস থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। এর মধ্যে ২টা ১৭ মিনিটে তাকে দুইবার কল করেছিলেন পুলক চ্যাটর্জী। তবে তিনি ধরতে পারেননি।

 

পুলক চ্যাটার্জী কর্মরত অবস্থায় দুপুর ২টার দিকেই অফিসে আসতেন বলে জানান দীপক। গতকাল দুপুরের পর দীপক আর অফিসে ফেরেননি। সন্ধ্যায় পুলক চ্যাটার্জীর মৃত্যুর খবর শুনে অফিসে আসেন।

 

স্ত্রী প্রিয়াংকা চ্যাটার্জী এবং পঞ্চম শ্রেণিতেপড়ুয়া একমাত্র মেয়েকে রেখে গেছেন পুলক চ্যাটার্জী। তাদের দেখাশোনার ভার ভাইকে দেওয়ার কথা সুইসাইড নোটে লিখে গেছেন তিনি।

 

পুলক চ্যাটার্জীর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন, বরিশাল সদর আসনের সংসদ সদস্য মজিবর রহমান সরওয়ার, বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন, বরিশাল জেলা পরিষদ প্রশাসক আকন কুদ্দুসুর রহমান, মহানগর বিএনপি, বরিশাল প্রেস ক্লাব, বরিশাল রিপোর্টার্স ইউনিটি, ন্যাশনাল ডেইলিজ ব্যুরো চিফ অ্যাসোসিয়েশন, বরিশাল টেলিভিশন মালটিমিডিয়া অ্যাসোসিয়েশন, সাংবাদিক ইউনিয়ন, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, শ্রীশ্রী শংকর মঠ পূজা উদযাপন কমিটিসহ সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও সাংবাদিক সংগঠনগুলো।