দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ স্বাস্থ্য সংকটের মুখোমুখি দেশ। যেখানে একইসঙ্গে হামের বৈশ্বিক রেকর্ড সংক্রমণ এবং ডেঙ্গুর তীব্র উল্লম্ফন দেশের ভঙ্গুর স্বাস্থ্যসেবা খাতকে পুরোপুরি বিপর্যস্ত করে তুলেছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ মাস থেকে শুরু হওয়া এই সংকটে ইতোমধ্যে হাম ও হাম-সদৃশ উপসর্গে এক হাজারেরও বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং আক্রান্তের সংখ্যা এক লাখ ৮৭ হাজার ছাড়িয়েছে, যা দেশ হিসেবে বিশ^রেকর্ড ও মারাত্মক হামের প্রাদুর্ভাব। একই সময়ে এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ৪৫ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। মৃতের সংখ্যা ১৩০ জনের বেশি।
ইতোমধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ হটস্পট। প্রায় ১ বছর ধরে দুটি রোগের প্রকোপ শুরু হয়েছে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর ইতোমধ্যে ছয় মাসের বেশি অতিবাহিত হয়েছে। কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় হাম ও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। অভিযোগ উঠেছেÑ কাজে সমন্বয়হীনতা ও সঠিক তদারকির অভাব। যার ফলে দেশের হাসপাতালগুলোতে শয্যা ও জরুরি চিকিৎসা-সামগ্রীর চরম সংকট দেখা দিয়েছে। অবশ্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শুরু থেকেই বিষয়টি নিয়ে চরমভাবে উদ্বিগ্ন। ইতোমধ্যে ডেঙ্গুর প্রকোপ মোকাবিলায় আগামী তিন মাসকে ঝুঁকিপূর্ণ সময় বিবেচনায় নিয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে শুধু মশকনিধন কার্যক্রমের ওপর নির্ভর না করে পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এদিকে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে আজ ডেঙ্গু প্রতিরোধে তিন মাসব্যাপী বিশেষ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতামূলক কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু মশকনিধন কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। এ ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। স্থানীয় প্রশাসন, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করে সমন্বিতভাবে মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশ দেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বা সরকারের একার পক্ষে বর্তমান ডেঙ্গু ও হামের প্রাদুর্ভাব রোধ করা সম্ভব নয়; তবে বিএনপি একটি বড় রাজনৈতিক দল। সামনে স্থানীয় সরকার ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন। সরকারি ও বিরোধীদল মিলিয়ে সংসদে সাড়ে তিনশ’ সংসদ সদস্য রয়েছেন। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে হাজার হাজার নেতাকর্মী অংশগ্রহণ করবে। এসব নেতারা রাজপথ এবং সংসদ না কাঁপিয়ে সবাই সারা দেশে ডেঙ্গু-হাম প্রতিরোধে সচেতনতায় গুরুত্ব দিলেও অনেকটা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হতো।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম ও ডেঙ্গু দুটি রোগ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। বিশেষ করে সমন্বয়হীনতা দায়ী। রোগ দুটির ধরন আলাদা হলেও উভয়ের ক্ষেত্রেই সময়মতো শনাক্তকরণ, কার্যকর নজরদারি এবং দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়া উচিত। শিশুদের ক্ষেত্রে হাম দ্রুত জটিল আকার ধারণ করতে পারে। অপুষ্টি, দেরিতে চিকিৎসা শুরু এবং অন্যান্য সংক্রমণ যুক্ত হলে মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়। কোনো এলাকায় হামের সংক্রমণ দেখা দিলে শুধু হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়াই যথেষ্ট নয়। আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা শিশুদের শনাক্ত করা, টিকাদানের অবস্থা যাচাই, প্রয়োজন অনুযায়ী টিকা দেয়ার ব্যবস্থা এবং সংক্রমণের বিস্তার সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করতে হয়। কিন্তু মাঠপর্যায়ে এসব কার্যক্রম দুর্বল। রাজধানীর মতো ঘনবসতিপূর্ণ নগরে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় আগাম প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থা প্রয়োজন। রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার পর অভিযান শুরু না করে সম্ভাব্য ঝুঁকির সময়ের আগেই প্রস্তুতি নেয়া উচিত। একই সময়ে ঢাকায় ডেঙ্গু নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। প্রতিবছর বর্ষাকালে এডিস মশার বিস্তার এবং ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়লেও মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে।
নগরবাসীর অভিযোগ, অনেক এলাকায় নিয়মিত মশকনিধন কার্যক্রম চোখে পড়ে না। কোথাও কোথাও ওষুধ ছিটানোর কার্যক্রম হলেও তা ধারাবাহিক নয়। বাড়ি, নির্মাণাধীন ভবন, ছাদ, পরিত্যক্ত জায়গা ও বিভিন্ন স্থাপনায় জমে থাকা পানিতে এডিস মশার লার্ভা থাকলেও সেগুলো অপসারণে যথেষ্ট নজরদারি নেই। এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত পরিদর্শন, নির্মাণাধীন স্থাপনায় নজরদারি, বাড়ির মালিক ও বাসিন্দাদের সচেতন করা এবং রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করে হটস্পট চিহ্নিত করার মতো পদক্ষেপ নিতে হয় বলছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম ও ডেঙ্গুর এই দ্বৈত সংকট বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর বড় চাপ তৈরি করেছে। একই সময়ে নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা চালু রাখা এবং প্রতিরোধযোগ্য সংক্রামক রোগ মোকাবিলা করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাম বিশ্বের সবচেয়ে সংক্রামক রোগগুলোর একটি। সাধারণত জ্বর ও শরীরে বিশেষ ধরনের ফুসকুড়ি দেখা দিলেও দুই ডোজ টিকা গ্রহণের মাধ্যমে এই রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক প্রফেসর ড. মাহমুদুর রহমান বলেন, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে টিকাদানে ঘাটতির কারণে বাংলাদেশ হাম নির্মূলের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি। বাংলাদেশে এর আগে কখনো হাম আক্রান্ত এত শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে তিনি জানেন না। একইভাবে এক বছরে এত বিপুলসংখ্যক রোগীও দেখা যায়নি। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, আক্রান্ত ও মৃতদের বড় একটি অংশ শিশু। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত টিকাদানের ঘাটতি পূরণ, টিকার আওতা বাড়ানো এবং জনসচেতনতা জোরদার করা জরুরি।
সূত্রমতে, রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে একদিকে পাওয়া যাচ্ছে হামে আক্রান্ত শিশু মৃত্যুর খবর। অন্যদিকে ডেঙ্গুর প্রকোপ জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি সৃষ্টি করছে। কিন্তু সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ, আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্তকরণ, চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশন এবং স্বাস্থ্য বিভাগের কার্যক্রম নিয়ে রয়েছে সাধারণ মানুষের অভিযোগ। নগরবাসী বলছেন, মাঠপর্যায়ে নজরদারি ও সমন্বয়ের ঘাটতি, রোগ শনাক্তে দেরি এবং প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমে দুর্বলতার কারণে পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হয়ে উঠছে।
স্বাস্থ্য খাতের অব্যবস্থাপনার অভিযোগের পাশাপাশি চিকিৎসাসেবা ব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে দীর্ঘদিন থেকেই। রাজধানীতে একই সময়ে হাম ও ডেঙ্গুর মতো দুই ধরনের জনস্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর উদ্যোগ এখনো চোখে পড়ার মতো নয়। হাম ও ডেঙ্গুর এই দ্বিমুখী সংকটে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। একদিকে সন্তানকে হাম থেকে রক্ষা করতে ছুটতে হচ্ছে, অন্যদিকে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের ডেঙ্গু থেকে বাঁচাতে মশার বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হচ্ছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য পরিস্থিতি আরো কঠিন। একটি শিশু অসুস্থ হলে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া, পরীক্ষা করানো, ওষুধ কেনা এবং কয়েক দিন কাজ বন্ধ রাখার আর্থিক চাপ পরিবারটির ওপর পড়ে। হামের বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে টিকাদান ব্যবস্থায় সাম্প্রতিক বছরগুলোর বিঘœ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটে এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ টিকাদান কর্মসূচি পিছিয়ে যায় বা বাতিল হয়। এর ফলে অনেক শিশু সময়মতো টিকা পায়নি।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চে প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর বাংলাদেশে এক লাখ ৮৭ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ২০ হাজার জনের হাম পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হয়েছে। এই প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে এক হাজার ১২ জনের মৃত্যুর ঘটনা যুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ১০০টি মৃত্যু নিশ্চিতভাবে হামজনিত বলে শনাক্ত করা হয়েছে। এছাড়া এক লাখ ৪৬ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এদিকে সংক্রামক রোগ হামের উপসর্গে গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে আরো তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে আরো এক হাজার ১১১ জন। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে গতকাল পর্যন্ত হাম উপসর্গে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক হাজার ১২ জনে। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে মারা গেছে ১০০ জন এবং হামের উপসর্গে ৯১২ জন।
গতকাল স্বাস্থ্য অধিদফতরের হাম-বিষয়ক হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।এছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরো দুজনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া এই সময়ে ডেঙ্গু নিয়ে নতুন করে ৭৯০ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এতে চলতি বছর এ পর্যন্ত মোট ডেঙ্গু রোগীর মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৪১ জনে। আর মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৯ হাজার ২২০ জনে। রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালগুলোতে দেখা গেছে, জ্বর, শ্বাসকষ্ট, সর্দি-কাশি ও শরীরে র্যাশ নিয়ে শিশুদের চিকিৎসা নেয়ার ঘটনা বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে রোগী হাসপাতালে আসার আগেই কয়েক দিন অসুস্থ থাকে। ফলে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা শুরু হতে দেরি হচ্ছে। একই সঙ্গে হাম প্রতিরোধে টিকাদান কর্মসূচির আওতা, বাদ পড়া শিশুদের শনাক্তকরণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নজরদারি কতটা কার্যকরভাবে হচ্ছে তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
এদিকে আক্রান্ত রোগীর চাপ, হাসপাতালের অতিরিক্ত ভিড় এবং চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকটে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা বড় ধরনের চাপে পড়েছে। গত এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু হলেও প্রাদুর্ভাব দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে সবচেয়ে বড় হাম প্রাদুর্ভাব চলছে বাংলাদেশে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে ব্যাঘাতের পর থেকেই পরিস্থিতির অবনতি শুরু হয়। ওই সময় স্বৈরাচার শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্দোলনের পর দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজ করছিল। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে টিকাদান কার্যক্রমে ঘাটতি এবং টিকার সরবরাহ সংকট তৈরি হয়। এতে বিশেষ করে নয় মাসের কম বয়সী শিশুরা ঝুঁকিতে পড়ে। এই বয়সের শিশুরা নিয়মিত হাম টিকা নেয়ার উপযুক্ত না হওয়ায় তাদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি। দুর্বল কর্মসূচি তদারকি, পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব এবং অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে টিকা সংগ্রহের নীতি পরিবর্তনের কারণে টিকার সরবরাহে বিঘœ ঘটে। ফলে বিপুলসংখ্যক শিশু হাম থেকে সুরক্ষাহীন হয়ে পড়ে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিইএইচও), ইউনিসেফসহ অন্যান্য স্বাস্থ্য সংস্থাও নিয়মিত টিকাদান সূচিতে বিঘেœর বিষয়টি তুলে ধরেছে। রোগের প্রাদুর্ভাবের প্রাথমিক পর্যায়ে আক্রান্তদের প্রায় ৮০ শতাংশই ছিল পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। গত এক দশকে হাম নির্মূলের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছিল। করোনা মহামারির সময় কিছুটা কমে যাওয়া ছাড়া বেশির ভাগ সময় দেশে হাম টিকার আওতা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ করা ৯৫ শতাংশ বা তার বেশি ছিল।
রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. নন্দ দুলাল সাহা বলেন, রোগীর সংখ্যা এত বেশি যে সবাইকে জায়গা দেয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। হাসপাতালে হাম রোগীদের জন্য ৬০টি শয্যা রয়েছে। কিন্তু রোগীর চাপ এত বেশি যে অনেককে মেঝেতেও চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। এক হাজার ৩৫০ রোগীর জন্য নির্মিত হাসপাতালটিতে বর্তমানে দুই হাজার ৩৫০ জনের বেশি রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন।এদিকে শিশুদের চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় পেডিয়াট্রিক স্যালাইনের সংকটও পরিস্থিতিকে আরো কঠিন করে তুলেছে। পরিবারগুলোর জন্য এই প্রাদুর্ভাবের অর্থ হলো দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা, বারবার হাসপাতালে ছুটে যাওয়া এবং চিকিৎসার বাড়তি খরচ। বাংলাদেশের জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচির আওতায় ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় এক কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত এক কোটি ৯৭ লাখের বেশি শিশুকে টিকা দেয়া হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু জরুরি কর্মসূচি যথেষ্ট নয়। নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম আরো শক্তিশালী করার পাশাপাশি বাদ পড়ে যাওয়া শিশুদের জন্য ক্যাচ-আপ টিকাদান কর্মসূচিও প্রয়োজন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, হামের সংক্রমণ মোকাবিলায় আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে দেশে আবারো হামের টিকাদান কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। ইতোমধ্যে অধিকাংশ টিকা ইউনিসেফের মাধ্যমে দেশে এসে পৌঁছেছে। অবশিষ্ট টিকাও ১৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে দেশে পৌঁছাবে। হামের টিকাদান ক্যাম্পেইন শেষ করার পরও যখন সংক্রমণ অব্যাহত থাকার বিষয়টি দেখা যায়, তখন সরকার মপ-আপ কার্যক্রম পরিচালনা করে। এ কার্যক্রমের আওতায় নতুন করে ১৪ লাখ শিশুকে হামের টিকা দেয়া হয়েছে। বিগত সরকার দেশে কোনো টিকা রেখে যায়নি। এমন পরিস্থিতিতে বর্তমান সরকার মাত্র ২১ দিনের মধ্যে এক কোটি ৮৫ লাখ শিশুর জন্য টিকা সংগ্রহ করে টিকাদান কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে।
তিনি বলেন, ঢাকার হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর চাপ কমাতে প্রান্তিক পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবা জোরদার করা হয়েছে। প্রতিটি হাসপাতালে আইসোলেশন বেড প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং মোবাইল হাসপাতালের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। উপজেলা পর্যায়েই রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করার পাশাপাশি টারশিয়ারি হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ কমাতে সোসাইটি অব মেডিসিনের মাধ্যমে উপজেলা পর্যায়ের চিকিৎসকদের সঙ্গে সমন্বয় ও প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে।