Image description

দীর্ঘদিন ধরে লোকসানের বোঝা টানতে থাকা দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা করতে চায় পাকিস্তান। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের প্রথম ভার্চুয়াল বৈঠকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলোর সেকেলে যন্ত্রপাতি এবং চিনি আহরণ কমে যাওয়াসহ নানা সংকট উত্তরণে কারিগরি দক্ষতা ও সার্বিক সহযোগিতা দেওয়ার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছে দেশটি। শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব বেনজীর রিয়াতির সভাপতিত্বে সভায় বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিদল অংশ নেয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। 

শিল্প মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশের ধুঁকতে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলোর সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা, জরুরি মেরামত ও আধুনিকায়নের লক্ষ্যে দুদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

জানা গেছে, প্রস্তাবিত এই দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার আওতায় পাকিস্তানের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ‘হেভি মেকানিক্যাল কমপ্লেক্স (এইচএমসি), ট্যাক্সিলা’ বাংলাদেশের নির্বাচিত চিনিকলগুলোর কারিগরি নিরীক্ষা (অডিট) পরিচালনা করবে। পাশাপাশি, এসব কারখানার জন্য সুনির্দিষ্ট ‘ব্যালেন্সিং, মর্ডানাইজেশন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন’ (বিএমআর) বা ভারসাম্য রক্ষা, আধুনিকীকরণ ও পুনর্বাসনবিষয়ক রূপরেখা তৈরি করবে প্রতিষ্ঠানটি।

প্রতিষ্ঠানটি অতীতে বাংলাদেশের নাটোর ও পাবনা চিনিকল স্থাপনেও কাজ করেছিল। অডিটের পর চিনিকলগুলোর জন্য সুনির্দিষ্ট পুনর্বাসন প্রস্তাবনা তৈরি করা হবে।

জানা গেছে, উভয় পক্ষ দেশের প্রচলিত চিনিকলগুলোকে বহুমুখী পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের বিষয়ে একমত হয়েছে। এর মূল লক্ষ্য হলো আয়ের উৎসে বৈচিত্র্য আনা এবং মিলগুলোর আর্থিক সক্ষমতা ও স্থায়িত্ব বাড়ানো। প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী আধুনিকায়নের পর এ ধরনের কারখানা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, চিটাগুড় থেকে বায়ো-ইথানল তৈরি এবং প্রেস-মাড ব্যবহার করে মানসম্মত জৈবসার উৎপাদন করা সম্ভব হবে।

সহযোগিতার পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে পাকিস্তানের একটি বিশেষ কারিগরি প্রতিনিধিদল সরেজমিন মূল্যায়ন ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন চিনিকল পরিদর্শন করবে। জানা গেছে, প্রতিনিধিদলের যাতায়াত ও কার্যক্রমের যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করতে সম্মতি জানিয়েছে পাকিস্তান ।

পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সুগার অ্যান্ড ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কারখানার কারিগরি বিবরণ পরিচালন-সংক্রান্ত তথ্য এবং প্রয়োজনীয় প্রাথমিক উপাত্ত পাকিস্তানি দলকে সরবরাহ করবে। পাশাপাশি মিলগুলো পরিদর্শন ও আধুনিকীকরণের সুনির্দিষ্ট প্রয়োজনীয়তা যাচাই করতে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানাবে।

জানা গেছে, সরেজমিন মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার পর পাকিস্তান চিনিকলগুলোর পুনর্বাসন ও আধুনিকীকরণের লক্ষ্যে বিস্তারিত সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদন এবং পূর্ণাঙ্গ বিনিয়োগ প্রস্তাবনা প্রস্তুত করবে। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, এই প্রস্তাবনাগুলো আগামী দিনে দুদেশের মধ্যকার ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ ও অর্থায়নবিষয়ক আলোচনার মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।

জানা গেছে, বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) আওতাধীন রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলো বর্তমানে পুরোনো ও সেকেলে যন্ত্রপাতি, উৎপাদন সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার না হওয়া এবং আখের রস থেকে চিনি আহরণের হার কমাসহ নানামুখী সংকটের মুখোমুখি। চিনি খাতের দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা ও স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে অবিলম্বে প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন এবং পণ্যের বহুমুখীকরণ জরুরি হয়ে পড়েছে।

বর্তমানে বিএসএফআইসির অধীনে ১৫টি চিনিকল থাকলেও এগুলোর সম্মিলিত বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা কম হওয়ায় অপরিশোধিত চিনি আমদানি করতে হয়।

বাণিজ্যিক বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগ অত্যন্ত সময়োপযোগী। বর্তমানে বিএসএফআইসির অধীনে ১৫টি চিনিকল থাকলেও এর মধ্যে ৯টি সচল রয়েছে। পুরোনো প্রযুক্তি ও কম চিনি আহরণের হারের কারণে এসব কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা কমে গেছে। ফলে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত চিনি আমদানি করতে হয়। ২০২০ সালে বড় ধরনের লোকসান এড়াতে পাবনা, শ্যামপুর, পঞ্চগড়, সেতাবগঞ্জ, রংপুর ও কুষ্টিয়া—এ ছয়টি চিনিকলে উৎপাদন স্থগিত করা হয়েছিল। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, পাকিস্তান সরকারের কারিগরি সহায়তা এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের বহুমুখী প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের চিনি খাত পুনরায় ঘুরে দাঁড়াবে এবং বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হয়ে উঠবে।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খান আমার দেশকে বলেন, পাকিস্তানের প্রস্তাবনাগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে।