Image description

একসময় ডেঙ্গুকে মূলত রাজধানী ও বড় শহরের রোগ হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু সেই চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে। দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে ডেঙ্গু। রাজধানীর পাশাপাশি চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, সাতক্ষীরাসহ বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা শহরের হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা। সাম্প্রতিক গবেষণাও বলছে, ডেঙ্গুর ভৌগোলিক বিস্তার এখন শহরের সীমানা ছাড়িয়ে গ্রাম ও শহরাঞ্চলেও স্পষ্ট।

সেপ্টেম্বরের শুরুতেই পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, একদিনে ১ হাজার ৫৭১ জন নতুন রোগী শনাক্ত এবং ৯ জনের মৃত্যুর তথ্য ছিল। চলতি বছরে তখন পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৪৫ হাজার ছাড়িয়েছে।

শুরুটা শহরে, বিস্তার এখন জেলাজুড়ে

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে ডেঙ্গুর বড় পরিবর্তনটি ঘটেছে ২০১৯ সালের পর। আগে ঢাকাকেন্দ্রিক সংক্রমণ বেশি থাকলেও পরবর্তী সময়ে দেশের অন্যান্য শহর ও গ্রামেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। ২০১৯-২০২৫ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করে করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে, এই সময়ে গ্রামীণ ও আধা-শহরাঞ্চলে ডেঙ্গুর সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ মানুষের চলাচল। রাজধানী বা বড় শহরে আক্রান্ত একজন মানুষ যখন বাস, ট্রেন কিংবা অন্য পরিবহনে নিজ এলাকায় ফেরেন, তখন স্থানীয় এডিস মশা ওই ব্যক্তিকে কামড়ানোর মাধ্যমে ভাইরাস গ্রহণ করতে পারে। পরে সেই মশা অন্য মানুষকে কামড়ালে স্থানীয়ভাবেই সংক্রমণের নতুন চক্র তৈরি হয়।

ফলে শুধু রোগী নিয়ন্ত্রণ করলেই ডেঙ্গু থামছে না। আক্রান্ত মানুষের সঙ্গে মশার উপস্থিতি এবং উপযুক্ত প্রজননস্থল—এই তিনটি একসঙ্গে থাকলেই নতুন এলাকায় সংক্রমণ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

বৃষ্টি, পানি জমা আর এডিসের নতুন আবাস

ডেঙ্গুর প্রধান বাহক এডিস মশা অল্প পরিমাণ জমে থাকা পরিষ্কার পানিতেও বংশবিস্তার করতে পারে। শহরের নির্মাণাধীন ভবন, ছাদ, পরিত্যক্ত পাত্র, প্লাস্টিকের বোতল, টায়ার, ডাবের খোসা, ফুলের টব কিংবা বিভিন্ন পাত্রে জমে থাকা পানি হয়ে উঠছে মশার প্রজননস্থল।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বলছে, নির্মাণস্থলের জমে থাকা পানি, খোলা ড্রেন, অপর্যাপ্ত পানি-স্যানিটেশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এর সঙ্গে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের পরিবর্তনও এডিস মশার বংশবিস্তার ও টিকে থাকার পরিবেশকে প্রভাবিত করছে।

২০২৬ সালের শুরুতেই বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছিলেন, আগাম বৃষ্টি এডিস মশার প্রজননস্থল তৈরির সুযোগ বাড়াচ্ছে। বৃষ্টির পানি বিভিন্ন পাত্রে জমে থাকলে সেগুলো দ্রুত অপসারণ না করা হলে বর্ষা আসার আগেই সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছিলেন কীটতত্ত্ববিদরা।

শুধু বৃষ্টি নয়, তাপমাত্রাও বড় কারণ

ডেঙ্গুর বিস্তারকে এখন আর শুধু বর্ষাকালের রোগ হিসেবে দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা। গবেষণায় তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও বৃষ্টিপাতের সঙ্গে ডেঙ্গুর সংক্রমণের শক্তিশালী সম্পর্ক পাওয়া গেছে। একই গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে ডেঙ্গুর মৌসুমও আগের তুলনায় দীর্ঘ হচ্ছে এবং বছরের শুরুর দিকেও সংক্রমণ বাড়ছে।

আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ডেঙ্গুর ভৌগোলিক বিস্তার এবং মৌসুমি চরিত্রে বড় পরিবর্তন এসেছে। ২০২৩ সালে দেশে ৩ লাখ ২১ হাজারের বেশি ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত এবং ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়—যা এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ভয়াবহ বছরগুলোর একটি। অর্থাৎ তাপমাত্রা বাড়া, বৃষ্টির ধরন বদলে যাওয়া এবং বর্ষার সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে এডিস মশার জীবনচক্রও বদলাচ্ছে। ফলে যে সময়টাকে আগে তুলনামূলক কম ঝুঁকির মনে করা হতো, সেখানেও এখন ডেঙ্গুর সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে।

অপরিকল্পিত নগরায়ণ বাড়াচ্ছে ঝুঁকি

দেশের জেলা ও উপজেলা শহরগুলো দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। নতুন আবাসিক এলাকা, ভবন নির্মাণ, রাস্তা, ড্রেন ও অন্যান্য অবকাঠামো তৈরি হলেও সব জায়গায় একই গতিতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে উঠছে না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বেশি জনঘনত্ব, মানুষের চলাচল এবং দুর্বল পানি, স্যানিটেশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা—সবগুলো একসঙ্গে ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়াতে পারে।

ঢাকার চিত্রই এর একটি বড় উদাহরণ। ২০২৬ সালের প্রাক-বর্ষা জরিপে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৩টিতে এডিস মশার ঘনত্ব গ্রহণযোগ্য মাত্রার ওপরে পাওয়া যায়। এর মধ্যে ২৭টি ওয়ার্ডকে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

শহরের ডেঙ্গু এখন গ্রামেও

ডেঙ্গু শহর থেকে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে মানুষের চলাচল বড় ভূমিকা রাখছে। রাজধানী ও বিভাগীয় শহরগুলোতে কাজ করা মানুষ প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াত করছেন। ফলে কোনও এলাকায় ভাইরাস নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে এডিস মশার উপস্থিতি থাকলে স্থানীয় সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

২০১৯ সালের পর গ্রামীণ ও আধা-শহরাঞ্চলে ডেঙ্গুর সংক্রমণ দ্রুত বাড়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। অর্থাৎ ডেঙ্গুর মানচিত্র এখন আর শুধু ঢাকা, চট্টগ্রাম কিংবা বড় নগরীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।

চট্টগ্রামের বৃষ্টিই দেখিয়েছে ঝুঁকির চিত্র

২০২৬ সালের বর্ষার শুরুতেই চট্টগ্রামে এর প্রভাব স্পষ্ট হয়। জুলাইয়ের প্রথম ১৩ দিনে জেলায় ১৬৪ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হন—আগের ছয় মাসের মধ্যে যা ছিল সর্বোচ্চ মাসিক প্রবণতা। দীর্ঘস্থায়ী বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার সঙ্গে এই বৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে বলে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ সতর্ক করেছিল। অর্থাৎ একই সঙ্গে ভারী বৃষ্টি, পানি জমে থাকা, অপর্যাপ্ত নিষ্কাশন এবং মানুষের ঘনবসতি থাকলে এডিস মশার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হচ্ছে।

ফগিং করলেই কি ডেঙ্গু থামবে?

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে অনেক সময় মশা নিধনে ফগিংকে প্রধান ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ভাষ্যমতে, শুধু ফগিং করে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। মশার প্রজননস্থল ধ্বংস না করলে নতুন মশা তৈরি হতে থাকবে।

সংকট এখন স্বাস্থ্যব্যবস্থাতেও

ডেঙ্গুর বিস্তার শুধু রোগীর সংখ্যা বাড়াচ্ছে না, চাপ তৈরি করছে হাসপাতালগুলোর ওপরও। সেপ্টেম্বরের শুরুতেই দেশে দৈনিক ভর্তি রোগীর সংখ্যা রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছায় এবং ঢাকার পাশাপাশি জেলা শহরের হাসপাতালেও শয্যা সংকট দেখা দিতে শুরু করে। একই সময়ে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরেকটি বড় সংক্রামক হাম রোগের চাপও সামলাতে হচ্ছে। ফলে ডেঙ্গুর বিস্তার অব্যাহত থাকলে হাসপাতাল, চিকিৎসক, নার্স ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা উপকরণের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।

সমাধান শুধু মশা মারায় নয়

বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থার বিশ্লেষণ মিলিয়ে ডেঙ্গুর বিস্তারের পেছনে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠছে—জলবায়ু ও আবহাওয়ার পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, পানি জমে থাকা, দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, মানুষের ব্যাপক চলাচল এবং বছরজুড়ে পর্যাপ্ত নজরদারির ঘাটতি।

ফলে ডেঙ্গু মোকাবিলায় শুধু রোগী শনাক্ত বা মশা নিধনের অভিযান যথেষ্ট নয়। কোন এলাকায় এডিসের ঘনত্ব বাড়ছে, কোথায় প্রজননস্থল তৈরি হচ্ছে, কোন সময়ে সংক্রমণ বাড়ছে এবং কোন জনগোষ্ঠী বেশি ঝুঁকিতে—এসব তথ্য নিয়মিত বিশ্লেষণ করে এলাকাভিত্তিক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক আলোচনায়ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার, সিটি করপোরেশন, উন্নয়ন সংস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

ডেঙ্গুর দাপট বাড়ছেই 

দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ ক্রমেই বাড়ছে। একদিনে চট্টগ্রাম, খুলনা ও বরিশালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চার বছরের শিশুসহ ছয় জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে এসব জেলার হাসপাতালগুলোতে নতুন করে শত শত ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে চট্টগ্রামে ৬৮, খুলনা বিভাগে ২৮৪ এবং ময়মনসিংহে ৪৫ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালেও নতুন করে ২০ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন।

চট্টগ্রামে গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চার বছরের এক শিশুসহ দুজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর জেলায় ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯ জনে। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্র জানায়, চট্টগ্রামের দুটি বেসরকারি হাসপাতালে দুজন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে। চট্টগ্রাম এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে চার বছর বয়সী রুজাইনা মজিদ। সে ঢাকার তেজগাঁও থানাধীন মণিপুরী পাড়ার বাসিন্দা। অপরজন রাশেদা বেগম (২৯)। তিনি চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার সকালে মারা যান। রাশেদা সন্দ্বীপ উপজেলার বাসিন্দা।

গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে নতুন করে ৬৮ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ২৯, বিআইটিআইডিতে ১১, ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ছয়, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে একজন এবং বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সাত জন ভর্তি হয়েছেন। এ ছাড়া বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ১৪ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত চলতি বছর জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ৬৮৯ জন। এর মধ্যে চলতি সেপ্টেম্বরের প্রথম ১০ দিনেই আক্রান্ত হয়েছেন ৬৫৩ জন এবং মারা গেছেন চার জন।

খুলনায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগজনক

খুলনা বিভাগেও ডেঙ্গুর পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগে ডেঙ্গুতে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ২৮৪ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দফতরের ১০ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খুলনা বিভাগে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৮ হাজার ১৯৯ জন। এ সময়ে মারা গেছেন ২৭ জন। চিকিৎসা শেষে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৭ হাজার ৩৪ জন। বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৯৩০ জন। এ পর্যন্ত ২০৮ জন রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র রেফার করা হয়েছে।

খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. শেখ মো. মোশাররফ হোসেন জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হওয়া ২৮৪ রোগীর মধ্যে সরকারি হাসপাতালে ২৬০ এবং বেসরকারি হাসপাতালে ২৪ জন চিকিৎসা নিয়েছেন।

জেলা ও হাসপাতালভিত্তিক তথ্যে দেখা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় খুলনায় ৯৫, খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৪৮, বাগেরহাটে ৬১, যশোরে ২৭, ঝিনাইদহে সাত, সাতক্ষীরায় ১৫, সাতক্ষীরা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চার, মাগুরায় চার, কুষ্টিয়ায় পাঁচ, মেহেরপুরে পাঁচ, নড়াইলে ১১ এবং চুয়াডাঙ্গায় দুজন নতুন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন।

বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি ৯৩০ রোগীর মধ্যে খুলনায় ৩৬০, খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ১৯১, বাগেরহাটে ১৩৭, সাতক্ষীরায় ২৯, সাতক্ষীরা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ১৭, যশোরে ৯২, ঝিনাইদহে ১৮, মাগুরায় ১৪, নড়াইলে ২৩, কুষ্টিয়ায় ১৫, চুয়াডাঙ্গায় সাত ও মেহেরপুরে সাতজন চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

রাজশাহীতে শিক্ষার্থীর মৃত্যু

রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জিত সরকার (২২) নামে এক ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে। বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে তিনি মারা যান।

রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শেখ শামীম আহমেদ বৃহস্পতিবার সকালে এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, জিত সরকার কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। ডেঙ্গু নিয়ে মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। তার বাড়ি নাটোরের বনপাড়ায়।

গত ২৪ ঘণ্টায় রামেক হাসপাতালে নতুন করে ২০ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। এ সময়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন ২৪ জন। বর্তমানে হাসপাতালে ৬৪ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

এর আগে মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে ইমরুল কায়েস হৃদয় (২৬) নামে আরও এক ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়। তার বাড়ি পাবনার বেড়া উপজেলায়। হাসপাতালে ভর্তির পরপরই তার মৃত্যু হয়।

সাতক্ষীরায় বাড়ছে আক্রান্ত

সাতক্ষীরায়ও দ্রুত বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা। গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় নতুন করে ২৩ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় ছয়জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র রেফার করা হয়েছে।

জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলতি বছরে সাতক্ষীরায় মোট ২৭৫ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৪৬ জন।

সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের সিভিল সার্জন কার্যালয়ের চিকিৎসক ডা. জয়ন্ত কুমার সরকার বলেন, জেলা সদর ও উপজেলা হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছেন। তিনি বলেন, ডেঙ্গুর বিস্তার ঠেকাতে বাড়িঘর ও আশপাশে পানি জমতে দেওয়া যাবে না। একই সঙ্গে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে হবে।

ময়মনসিংহে মৃত্যু ১৪

ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গুতে আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৪ জনে।

হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডের ফোকাল পার্সন অধ্যাপক ডা. এমদাদুল্লাহ খান জানান, ময়মনসিংহের নতুন বাজার এলাকার রিজভী (২০) রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় ডেঙ্গু ওয়ার্ডে ভর্তি হন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার রাতে তার মৃত্যু হয়। ডেঙ্গুর পাশাপাশি তিনি হৃদ্‌রোগেও ভুগছিলেন।

গত ২৪ ঘণ্টায় ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নতুন করে ৪৫ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে ১০১ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

বরিশালেও মৃত্যু

বরিশাল বিভাগে গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঝালকাঠির পোনাবালিয়া এলাকার কবির হোসাইন (৩৫) মারা যান।

এ নিয়ে বরিশাল বিভাগে ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ জনে। এর মধ্যে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. মো. রেফায়েতুল হায়দার জানান, ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া অধিকাংশ রোগী ঝালকাঠি ও পিরোজপুরের বাসিন্দা।

বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এখন পর্যন্ত বরিশাল বিভাগে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৭ হাজার ৮৮০ জন। এর মধ্যে পিরোজপুরে ২ হাজার ৮৬, বরগুনায় ১ হাজার ৮০, ঝালকাঠিতে ১ হাজার ৮২৪, বরিশালে ৮১৬, পটুয়াখালীতে ৭৬০ এবং ভোলায় ৪৪৬ জন আক্রান্ত হন।

বর্তমানে শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ১২৪ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন। বিভাগের ছয় জেলার সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন মোট ৪৯১ জন।

স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডেঙ্গুর সাধারণ উপসর্গের মধ্যে রয়েছে জ্বর, মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা ও চোখের পেছনে ব্যথা। এসব উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।