Image description

দেশের বিভিন্ন এলাকায় সার নিয়ে ভোগান্তিতে পড়েছেন কৃষক। কোথাও সরকারি দামের চেয়ে বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে, কোথাও ডিলারের দোকানে সার থাকলেও ‘নেই’ বলে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আবার কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও সার না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কৃষি বিভাগ ও ডিলারদের বেশির ভাগই বলছেন, সার সংকট নেই। তবে কৃষকদের অভিযোগ, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম এবং কোনো কোনো এলাকায় কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বেশি দামে সার বিক্রি করা হচ্ছে। ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

যশোর : কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, খোলা বাজারে ইউরিয়া ও টিএসপি সার কেজিপ্রতি ২৭ টাকা, ডিএপি ২১ টাকা এবং এমওপি ২০ টাকা নির্ধারণ করেছে সরকার। তবে খুচরা বাজারে এসব দামে সার মিলছে না বলে অভিযোগ কৃষকদের। সদর উপজেলার রাহেলাপুরের কৃষক শরিফউদ্দিন বলেন, খুচরা বাজারে ইউরিয়া কেজিপ্রতি ৩৫ টাকা পর্যন্ত কিনতে হয়েছে। হাশিমপুরের মামুনুর রশিদ, পল্পব হোসেন ও পাঁচবাড়িয়ার রেজাউল করিম বলেন, টাকা বেশি দিলে সার আছে, কম দিলে নেই। বস্তাপ্রতি ইউরিয়া ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।

তবে হাশিমপুর বাজারের সাব-ডিলার আব্দুল মতিন অভিযোগ নাকচ করে বলেন, সরকার নির্ধারিত দামেই সার বিক্রি করছেন। ডিলারের কাছ থেকে সার পরিবহণে ভ্যান-নসিমনে বস্তাপ্রতি ১ হাজার ৩৪৯ টাকা খরচ হয় এবং কৃষকের কাছে ১ হাজার ৩৫০ টাকায় বিক্রি করেন তিনি।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোরের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক মো. আবুল হাসান বলেন, জেলায় পর্যাপ্ত সার রয়েছে। কৃষক চাহিদামতো সার পাবেন। বেশি দামে বিক্রি বা সার না পাওয়ার অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জেলায় বরাদ্দ রয়েছে ইউরিয়া ৭ হাজার ৮২২ টন, টিএসপি ১ হাজার ৩৮২ টন, ডিএপি ৩ হাজার ৮১৯ টন ও এমওপি ২ হাজার ১৬৬ টন।

রাজশাহী : সেপ্টেম্বরে ইউরিয়া ৫ হাজার ১৮৬ টন, টিএসপি ১ হাজার ৪৫ টন, এমওপি ১ হাজার ৬২৯ টন ও ডিএপি ৩ হাজার ১৫ টন বরাদ্দ হয়েছে বলে জানান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ও জেলা সার-বীজ মনিটরিং কমিটির সদস্য সচিব মোস্তফা কামাল হোসেন।

পবার দর্শনপাড়ার সার ডিলার মেসার্স স্কাই এন্টারপ্রাইজের মালিক ফজলুল করিম জানান, তার বরাদ্দের মধ্যে ২০ টন ইউরিয়া, ৭ টন পটাশ ও ২৫ টন ডিএপি মজুত আছে। তার দাবি, এলাকায় সার সংকট নেই এবং কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ ভিত্তিহীন। পবার দামকুড়ার ডিলার রবিউল ইসলামও সার সংকট নেই বলে দাবি করেন।

তবে কৃষক আব্দুল আলিমের অভিযোগ, দোকানে সার থাকলেও ‘নেই’ বলে কৃষকদের হয়রানি করা হচ্ছে। বস্তাপ্রতি ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। গোদাগাড়ীর নিমতলার কৃষক আবুল কালাম বলেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়েও চাহিদামতো সার মিলছে না। রশিদ না দিয়ে বেশি দাম নেওয়া হচ্ছে। কৃষি বিভাগের দাবি, গত বছরের তুলনায় এবার সব ধরনের সারের বরাদ্দ বেশি।

মাগুরা : আগস্টের বরাদ্দের পরও মাগুরায় বিভিন্ন ধরনের সার মজুত ছিল। সেপ্টেম্বরে প্রথম দিন থেকেই ডিলাররা বরাদ্দের সার উত্তোলন করলেও কৃষকরা তা কিনতে পারছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুরের পর পৌরসভা ও সদর উপজেলার অধিকাংশ ডিলারের দোকান বন্ধ পাওয়া যায়। মঘির মহিষাডাঙ্গার কৃষক নাজমুল হাসান বলেন, ২ সেপ্টেম্বর ডিলার নতুন সার তুললেও মঙ্গলবার ফসফেট ও ডিএপি চাইলে ‘সার নেই’ বলে ফেরত দেওয়া হয়েছে। তিতারখাঁপাড়ার আব্দুল হাকিম ২০ কেজি ডিএপি চাইলে পেয়েছেন ১০ কেজি। আলামিন বলেন, চাহিদামতো সার মিলছে না।

ডিলার নিমাই পাল জানান, এ মাসে তিনি ১৮৫ বস্তা টিএসপি, ১৫০ বস্তা ডিএপি, ১৩৯ বস্তা এমওপি ও ২ হাজার বস্তা ইউরিয়া পেয়েছেন। অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে কেউ কেউ সার না পেয়ে ফিরে যেতে পারেন। রাঘবদাইড়ের ডিলার সোহরাব হোসেন বলেন, চাহিদা বেশি। দ্রুত উপবরাদ্দ না দিলে সংকট তৈরি হতে পারে।

ভূরুঙ্গামারী, রাজারহাট (কুড়িগ্রাম) : ভূরুঙ্গামারী উপজেলার নতুনহাটে বেশি দামে সার বিক্রির সময় বিসিআইসি ডিলার নিতাই চন্দ্র সাহা ও কীটনাশক ব্যবসায়ী আসাদুল আলমকে ১৫ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। দুই কৃষকের কাছ থেকে ১০০ টাকা করে বেশি নেওয়া হয়েছিল। টাকা ফেরত দিয়ে সরকার নির্ধারিত ১ হাজার ৩৪০ টাকায় সার বিক্রির নির্দেশ দেওয়া হয়।

রাজারহাটে নাজিমখান ইউনিয়নের এক ডিলারের সেপ্টেম্বরের ৪৪ টন ইউরিয়া ১০ দিনেই শেষ হয়েছে। উমর মজিদ ইউনিয়নের আরেক ডিলারকে বরাদ্দের অতিরিক্ত ১০ টন উপবরাদ্দ দেওয়ার পরও চাহিদা শেষ হয়নি। কৃষকরা দোকান থেকে দোকানে ঘুরছেন, দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়েও খালি হাতে ফেরার অভিযোগ রয়েছে।

কৃষক আবুল কালাম বলেন, সারাদিন লাইনে দাঁড়িয়েও সার না পেয়ে বাড়ি ফিরেছেন। নুরু মিয়ার অভিযোগ, প্রভাবশালীরা অন্যের আইডি কার্ড দিয়েও সার উত্তোলন করে নিচ্ছেন। তবে উপজেলা কৃষি কার্যালয়ের অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা হৈমন্তী রানী বলেন, উপজেলায় সার সংকট নেই; উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে চাহিদা অনুযায়ী সার দেওয়া হচ্ছে।

সিংড়া (নাটোর) : সিংড়ায় টিএসপি সার নিয়ে সংকট দেখা দিয়েছে। টিএসপি না পেলে অন্য সার নিতে চান না কৃষকরা। বৃহস্পতিবার পৌর শহরের আট ডিলারের গুদাম ঘুরে ইউরিয়া, ডিএপি ও এমওপি পর্যাপ্ত পাওয়া গেলেও অধিকাংশ গুদামে টিএসপি ছিল না। দুই ডিলারের কাছে ছিল ১৬০ বস্তা টিএসপি। কৃষি অফিস ডিএপির সঙ্গে টিএসপি সমন্বয় করে দেওয়ার পরামর্শ দিলেও কৃষকদের ধারণা, টিএসপি ছাড়া ফসল ফলানো সম্ভব নয়। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা খন্দকার ফরিদ উদ্দিন বলেন, টিএসপির চাহিদা বেশি; অন্য কোনো সারের সংকট নেই।

গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) : গোয়ালন্দে বৃহস্পতিবার মেসার্স মণ্ডল ট্রেডার্সের বিরুদ্ধে ১৩ বস্তা বিভিন্ন সার পাচারের সময় চালক ও ক্রেতাকে আটক করা হয়। পরে সার ও চালককে সন্ত্রাসী কায়দায় ছাড়িয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। ডিলার মাসুদ মণ্ডল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তার দোকান থেকে অন্তত ১৫ কিলোমিটার দূরের ফরিদপুরের আনন্দবাজারে ওই ঘটনা ঘটেছে এবং এটি তার লাইসেন্স বাতিলের ষড়যন্ত্র।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সৈয়দ রায়হানুল হায়দার জানান, তদন্তে দোকানের সারের হিসাবে গরমিল পাওয়া যায়নি। সার ছিনিয়ে নেওয়ার বিষয়টি পুলিশকে তদন্ত করতে বলা হয়েছে। এদিকে বৃহস্পতিবার ১০ দফা দাবিতে গোয়ালন্দ উপজেলা কৃষক সমিতি ইউএনওর কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে।

দিনাজপুর : প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের অভিযানের পর দিনাজপুরের ডিলাররাও সার সংকট নেই বলে দাবি করছেন। সদর উপজেলার পুলহাটের রূনা ট্রেডার্সে ইউরিয়া ৪৪.৮৫ টন, টিএসপি ২২.১৫ টন ও ডিএপি ৩৮.৩০ টন মজুত পাওয়া যায়। ম্যানেজার বাবুল হোসেন জানান, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে উত্তোলন করা সব সার বিক্রি হয়নি।

তবে কৃষক রেজাউল ইসলাম বলেন, চাহিদামতো সার না পেয়ে গত মাসে বস্তাপ্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি দিয়ে সার কিনে রেখেছেন। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আফজাল হোসেন বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জেলায় চার ধরনের সারের চাহিদা ২ লাখ ৫৮ হাজার ১১৫ টন এবং সেই পরিমাণ বরাদ্দ পাওয়া গেছে।

লালমনিরহাট ও কালীগঞ্জ : কৃষকদের অভিযোগ, ডিলারদের কাছে গেলে ‘সার নেই’ বলে ফেরানো হচ্ছে। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়েও চাহিদামতো সার মিলছে না। বাধ্য হয়ে খুচরা বাজার থেকে বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে। তবে বিএফএর জেলা সভাপতি আব্দুল হাকিম অভিযোগ নাকচ করে বলেন, সরকারি নিয়মে নিয়মিত সার উত্তোলন ও বিতরণ হচ্ছে। কালীগঞ্জের ডিলার বাদশা মিয়া জানান, তার বরাদ্দের ইউরিয়া ১ হাজার ২০০ বস্তা, টিএসপি ৭৫, এমওপি ৮৮ ও ডিএপি ৭৪ বস্তা সময়মতো উত্তোলন ও বিতরণ করা হয়েছে।

জেলা কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, চলতি মাসে ইউরিয়া ২ হাজার ১৪৫, টিএসপি ৫৪১.৯৫, ডিএপি ১ হাজার ১২৯.৬০ ও এমওপি ৮২৭.৪৫ টন উত্তোলন হয়েছে। বর্তমানে মজুত রয়েছে ইউরিয়া ৯৯৩, টিএসপি ৩০২, ডিএপি ৭৭৮ ও এমওপি ৯৭৬ টন। জেলা কৃষি বিভাগের উপপরিচালক সাইখুল আরিফিন বলেন, আমন মৌসুমে সারের কোনো ঘাটতি নেই।

নান্দাইল, ফুলপুর ও গৌরীপুর (ময়মনসিংহ) : নান্দাইলে পর্যাপ্ত সার মজুত থাকলেও কৃষকরা বস্তাপ্রতি ২০০ থেকে ২৫০ টাকা বেশি দিয়ে সার কিনছেন। জাহাঙ্গীরপুরের নাজিম উদ্দিন, রুবেল মিয়া ও লাল মিয়া জানান, সরকারি মূল্য ১ হাজার ৩৫০ টাকা হলেও খুচরা দোকানে ১ হাজার ৫৫০ টাকায় সার কিনতে হচ্ছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাঈমা সুলতানা বলেন, পর্যাপ্ত বরাদ্দ ও মজুত রয়েছে।

ফুলপুরে ইউরিয়া ৩৯০ টন উত্তোলন ও ৩৪১ টন মজুত রয়েছে। টিএসপি মজুত ৫৬.৬৫, ডিএপি ৮৬.৩৫ ও এমওপি ২৬০.৭০ টন। গৌরীপুরে মজুত রয়েছে ইউরিয়া ২৮১.৯০, টিএসপি ৩৭.৫, ডিএপি ৪৭.৮ ও এমওপি ৬১.৩০ টন। সেতু এন্টারপ্রাইজের গুদামেও হিসাব অনুযায়ী মজুত সঠিক পাওয়া গেছে।

মাদারগঞ্জ (জামালপুর) : মাদারগঞ্জে কৃত্রিম সংকট তৈরির উদ্দেশ্যে ডিলাররা বরাদ্দের পুরো সার উত্তোলন করছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে। কোনো কোনো ডিলার সার উত্তোলন করলেও দোকানে তুলছেন না। মেসার্স শামসুল হকের দোকানে ১০ টন সার আনা হলেও তা গুদামে তোলা হয়নি। ডিলারের জামাতা রবিউল ইসলাম জানান, সেপ্টেম্বরে ৮০ টন বরাদ্দের মধ্যে প্রথমে ৪০ ও পরে ১০ টন তোলা হয়েছে। কৃষি কর্মকর্তার কাগজপত্রে স্বাক্ষরের পর সার দোকানে তোলা হবে বলে জানান তিনি।

মোহনগঞ্জ (নেত্রকোনা) : উপজেলায় ৮ বিসিআইসি ও ১২ বিএডিসি ডিলারের কাছে মোট ১৬ হাজার ২৮৪ বস্তা সার মজুত রয়েছে। এর মধ্যে ইউরিয়া ৭ হাজার ৭৩৪, ডিএপি ৩ হাজার ২১, টিএসপি ৮৬৭ ও এমওপি ৪ হাজার ৬৬২ বস্তা। জয়পুরহাট : জেলায় ডিলারদের কাছে পর্যাপ্ত সার রয়েছে বলে কৃষি বিভাগ জানিয়েছে। সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রাফশিয়া জাহান জানান, জয়পুরহাট পৌরসভা ও সদর উপজেলার ৯ ইউনিয়নের ১২ ডিলারকে সেপ্টেম্বরে ৬৩৪ টন ইউরিয়া বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

নাচোল ও রাণীনগর (নওগাঁ) : নাচোল উপজেলায় সেপ্টেম্বরে ইউরিয়া ৮১৫ টনের বিপরীতে ২৯০ টন, ডিএপি ৮১৪ টনের বিপরীতে ৩১২ টন, টিএসপি ১৬০ টনের বিপরীতে ৩২ দশমিক ২০ টন এবং এমওপি ৪০৫ টনের বিপরীতে ১৬১ টন মজুত রয়েছে। কৃষি অফিস ও ডিলাররা পর্যাপ্ত মজুতের কথা বললেও দোকান খোলা ও সার বিতরণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে কৃষকদের অসন্তোষ রয়েছে। রাণীনগর উপজেলায় সারের সংকট দেখা দিয়েছে বলে কৃষকদের অভিযোগ। কৃষি বিভাগের স্লিপ বা টোকেন ছাড়া সার মিলছে না। কৃষকদের মধ্যে এ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোস্তাকিমা খাতুন বলেন, প্রকৃত কৃষকের হাতে সার পৌঁছাতেই স্লিপ দেওয়া হচ্ছে এবং উপজেলায় সারের কোনো সংকট নেই।